আইসিজিতে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলা শুনানি পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশ

প্রিন্ট সংস্করণ   |   ০১:৪৪, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজি) হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক আদালত, যেটা জাতিসংঘ কর্তৃক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে নেদারল্যান্ড’র হেগ এ প্রতিষ্ঠিত হয়।

শান্তি ও মুক্তি তথা নির্বান লাভের বাণী প্রচারক ‘মহান সাধক গৌতম বুদ্ধ’ যাকে বৌদ্ধরা ‘ভগবান’ জ্ঞানে ভক্তি ও অর্চনা করে, সেই বার্মিজরা (বর্তমানে মিয়ানমার) প্রায়শঃই সে দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালাত।


সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছদ্মবেশী তথাকথিত গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মুসলিম বিদ্বেষী অং সান সু চি’র অনুমতি ও নির্দেশক্রমে ক্ষমতাসীন সরকার সর্বশেষ ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত ঘেঁষা রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা নামক মুসলমানদের ওপর তাদের অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি করে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়।

তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াসহ অগণিত রোহিঙ্গা শিশু ও নারীদের নির্বিচারে খুন, ধর্ষণসহ ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে। এ গণহত্যার শিকারে পতিত হওয়া বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী জীবন বাঁচানোর তাগিদে পঙ্গপালের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের কুতুপালং ও উখিয়া এলাকায় ঢুকতে থাকে।

মিয়ানমার যেমন তাদের পালাবার সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি আমাদের বর্ডার গার্ড কর্তৃপক্ষও আমাদের মানবতাবাদী মনোভাবসম্পন্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে ছিন্নমূল দুর্গত এসব অসহায় রোহিঙ্গাদের কেবল আশ্রয়দানই নয়, তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাকরণ ও নিরাপত্তাজনিত যাবতীয় ব্যবস্থা করার নির্দেশও প্রদান করেন।

কেবল মুসলমান বলেই নয়, সম্পূর্ণ মানবতার খাতিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটা করেছেন এই বিবেচনা মাথায় রেখে যে, যখন পাকিস্তানি হানাদাররা এদেশের ওপর একই ধরণের নির্যাতনমূলক গণহত্যা শুরু করেছিল, তখন ঐ সময়কার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীও এমনই উদারচিত্তে তার হিন্দু রাষ্ট্রে বাংলাদেশের দুর্গত ছিন্নমূল এক কোটি শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান করেছিলেন।

৯ মাসের যুদ্ধ শেষে এই সব শরণার্থী নিজ দেশে ফিরে এসেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের যে মিয়ানমার সরকার তাদের দেশে ফেরৎ নিতে এতো টালবাহানা করে আমাদের ঘনঅধ্যুষিত ছোট্ট দেশটাকে এমন চাপে ফেলবে, এটা হয়তো মাদার অব হিউম্যানিটি খেতাবপ্রাপ্ত আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চিন্তাও করেন নি।

আজ তিনটি বছর শেষ হতে চলেছে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে শত অনুরোধ-উপরোধ সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক কোনো উদ্যোগই নিচ্ছেনা।

এমতাবস্থায় আফ্রিকা মহাদেশের ক্ষুদ্র একটি দেশ স্ব-প্রণোদিত হয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বর্বরতম এমন অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে একটি মামলা দায়ের করে।

১০ ডিসেম্বর থেকে এই মামলার শুনানি শুরু হয়ে চলবে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে মিয়ানমারের পক্ষে সাফাই গাইতে মিয়ানমারের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে শান্তিবাদী নামের কলঙ্ক অং সান সু চি উপস্থিত থাকতে এরই মধ্যে হেগ পৌঁছেছেন। এদিকে এই মামলার শুনানিতে পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশের ২০ জন প্রতিনিধিও সেখানে পৌঁছেছেন।

এখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে আমরাও গভীর আগ্রহ ও উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করছি জাতিসংঘের আদালতটি এ সমস্যা সমাধানে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সেটা জানার জন্যে। এটা এমনই একটা সমস্যা, যেটা কেবল যে বাংলাদেশের জন্যেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে তা-ই নয়, এটা নিগৃহীত-নির্যাতিত একটা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংকটসহ দৃষ্টি আকর্ষণকারী একটা মানবিক বিপর্যয়, যা বিশ্ববাসীর নিকট অস্বস্তিকর একটা মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনাযোগ্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বর্তমান বিশ্বটা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রাগ্রসরমান প্রযুক্তির বদৌলতে গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। তাই এ সময়ে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে ও প্রান্তের মানুষরা যে কোনো দেশের যে কোনো ঘটন-অঘটন প্রত্যক্ষ করতে পারে।

বিশেষ করে যেকোথাও মানবতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত কোনো দুষ্কর্ম সংঘটিত হতে জানলে, শুনলে বা দেখতে পেলে তজ্জন্যে উদ্বিগ্ন হওয়াসহ তার আশু সমাধানে তৎপর হয়ে ওঠে ও তজ্জন্যে জনসমর্থন আদায়ে সচেষ্ট হয়। এরই প্রেক্ষিতে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের গাম্বিয়া রাষ্ট্রটি এর সুষ্ঠু মানবিক সমাধানের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এই আদালতটির শরণাপন্ন হয়।

এতে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের আন্তরিক ও মানবিক সমর্থনও পাওয়া গেছে। বর্তমান সময়ে এটা একটা আন্তর্জাতিক মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচিত। আশা করা যায় আন্তর্জাতিক আদালতটি এর সুষ্ঠু সমাধানজনিত একটা ইতিবাচক রায় প্রদানপূর্বক দুর্গত মানবতার প্রতি সন্মান প্রদর্শনে গৌরবজনক অবদান রাখার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর