আজো স্বীকৃতি মেলেনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের

এস.এস শোহান, বাগেরহাট   |   ০৭:১৮, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

উদাসীনতা, অবহেলা ও অযত্নে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে বাগেরহাটের শরণখোলার প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের সমাধিস্থল। সংরক্ষণের অভাবে তার সমাধির আশপাশে বিভিন্ন লতাপতা জন্মেছে। পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা কবরের উপরেও ভেঙে পড়েছে কয়েকটি গাছ।

এভাবে চলতে থাকলে কোনো এক সময় হারিয়ে যাবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের শেষ স্মৃতিটুকু এমনটি দাবি করেছেন স্থানীয়রা। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা এই বীর শহীদের সমাধি সংরক্ষিত না হওয়া ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সহযোদ্ধারা।


এদিকে সশস্র বাহিনীর মর্যাদাপূর্ণ পদের চাকরি রেখে দেশ-মাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশের জন্য জীবনদান করা এই মুক্তিযোদ্ধাকে রাস্ট্রীয় খেতাব প্রদানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৪৪ সালে শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদী সংলগ্ন দক্ষিণ সাউথখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ার হোসেন।

আলেপ খান ও জুমিনা খাতুনের চার পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে আনোয়ার ছিলেন সবার ছোট। ১৯৬৬ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে করাচি আর্মিতে যোগদান করেন তিনি।

সর্বশেষ পাকিস্তানের খানেওয়ালা ক্যান্টনমেন্টে ক্যাপ্টেন পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসেন। মার্চে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। চাকরির মায়া ত্যাগ করে, জন্ম ভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে শরণখোলাবাসীকে সংগঠিত করে ঝাপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

সুন্দরবনে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন তিনি। বিভিন্ন জায়গা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে পাক-হানাদার ও রাজাকারদের সাথে লড়াই করেন। তার নেতৃত্বে একাধিক হামলায় অনেক পাকিস্তানি সেনা সদস্য নিহত হয়। রাজাকাররা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

এভাবে চলতে থাকে তার সাহসী কার্যক্রম। তার ভাই হেমায়েত উদ্দিন খানও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় তার সাথে। অপর দুই ভাই শাফায়েত খান ও সায়েদ খান পাকিস্তান আর্মীর সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা বন্দি ছিল পাকিস্তানে।

১৯৭১ সালের ১১ জুলাই তার সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি শরণখোলা থানা ঘেরাও করেন। পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ও স্থানীয় রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি ছুড়ে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি চালায়।

দুইপক্ষের গুলি বিনিময়ের সময় ক্যাপ্টেন আনোয়ার গুলি বিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলে মারা যান। শহীদ ক্যাপ্টেন আনোয়ারের মরদেহ তার সহযোদ্ধা শেখ সামসুর রহমান ও মনিরুজ্জামান বাবুল গোপনে নৌকায় করে বাড়িতে পৌঁছে দেন। রাত ১২ টায় বলেশ্বর নদীর তীরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় বিয়ে করলেও কোনো সন্তান ছিল না তার। যার ফলে মৃত্যুর পর তার স্ত্রীও চলে যান অন্যত্র। এর পরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। ক্যাপ্টেন আনোয়ারের ভাই হেমায়েত উদ্দিন খান বর্তমানে ভাতাপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের খোঁজ নেয় না কেউ।

এর মধ্যে বলেশ্বরের ভাঙনে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের কবর। ২০১৫ সালে স্থানীয় সংবাদকর্মী নজরুল ইসলাম আকনের দাবির প্রেক্ষিতে উপজেলার প্রশাসন ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের দেহাবশেষ তুলে শরণখোলা উপজেলা সদরের রায়েন্দা বাজারস্থ শহীদদের সমাধিস্থলের অদূরে রাস্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

কিন্তু তারপর থেকে ওই সমাধিকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের কবরটি রয়েছে খোলা জায়গায় চরম অবহেলায়। এমনকি তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিকে দায়মুক্ত করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।

ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের সহযোদ্ধা শেখ সামসুর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। তিনি অত্যন্ত সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। তার নেতৃত্বেই শরণখোলা থানা ঘেরাও করা হয়। ওই সময় সম্মুখযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। আমরা তার মরদেহ খুব গোপনে তার পরিবারের কাছে পৌছে দিয়েছিলাম।

মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জেল হোসেন পঞ্চায়েত ও হারুনুর রশীদ জানান, যুদ্ধের সময় পাশে থেকেই ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের বীরত্ব দেখেছি। তিনিই শরণখোলায় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সংগঠক এবং প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। আমরা রাস্ট্রীয়ভাবে তার সমাধিস্থল নির্মাণ করা এবং মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ অবদান রাখায় তাকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করার দাবি জানাই।

শরণখোলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার এম.এ খালেক খান বলেন, সুন্দরবন কেন্দ্রীক শরণখোলা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সংগঠক হলেন ক্যাপ্টেন আনোয়ার। তিনি সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তৎকালীন ৯ নং সেক্টরের সাব-সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে এ শহীদের নাম নিশানা মানুষ ভুলে যেতে বসেছে। তাকে ভুলে যাওয়া, তার কবরস্থান হারিয়ে যাওয়া জাতির জন্য লজ্জাজনক। তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা খেতাব দেয়া উচিৎ।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন জানান, শহীদ ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তিনি সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। তার প্রতি অবহেলা দেখানোর কোনো সুযোগ নাই। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা নিয়ে বিষয়টি জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি।

এমআর


আরও পড়ুন