নগর ভবনের বিপক্ষে অঞ্চল অফিসগুলো

প্রিন্ট সংস্করণ॥ফারুক আলম   |   ০৩:০৪, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্প ও সড়ক সংস্কার কাজে ধুলাদূষণরোধ গত ৫ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নিদের্শনা ছিলো— ঢাকায় ধুলাদূষণ রোধে সিটি কর্পোরেশনকে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

সেই নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৩ অক্টোবর ডিএসসিসির সচিব মো. মোস্তফা কামাল মজুমদার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালকদের নির্দেশ দেন।


কিন্তু সেই নির্দেশনা মান্য করেননি কোনো আঞ্চলিক কর্মকর্তা। বরং আগের মতোই সড়কের সংস্কার কাজ করছেন তারা। সচিবের নির্দেশনা অমান্য করায় গত ৪ নভেম্বর ফের ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম অঞ্চলের সকল নির্বাহী প্রকৌশলীদের একই নির্দেশ দেন। এতেও ধুলাদূষণ রোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আঞ্চলিক কর্মকর্তারা।

ডিএসসিসির কয়েকজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শর্তে জানান, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধুলাদূষণ রোধে নগর ভবন থেকে আঞ্চলিক অফিসে দুবার নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু বাস্তবায়নে জনবল ও কারিগরি অবকাঠামোর কথা বলা হয়নি। আঞ্চলিক অফিসগুলোতে জনবল ও কারিগরি অবকাঠামো পর্যাপ্ত না থাকায় নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

বায়ুদূষণ রোধে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণকে অবশ্যই আমলে নিতে হবে সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণায়, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে— দূষণ নিরোধ দূরে থাক, তা নিয়ন্ত্রণেরও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না।

শুধু বায়ুদূষণই নয়, ঢাকা এখন সবচেয়ে উত্তপ্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে। দূষণ ঠেকাতে যেসব আইন আছে, সেগুলো না মানার কারণে ঢাকার দূষণ দৃশ্যমান হচ্ছে।

জানা যায়, অবকাঠামো তৈরি, সমপ্রসারণ ও মেরামত করার সময় খনন করা মাটি ও অন্যান্য সামগ্রী রাস্তায় ফেলে না রেখে দ্রুত অপসারণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়ে থাকে।

বরাদ্দ অর্থ খরচ দেখানো হলেও এ অর্থের সঠিক ব্যবহার দৃষ্টিগোচর হয় না। মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ, ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের খোঁড়াখুঁড়িতে বর্তমানে ধুলাদূষণ প্রকট আকার ধারণ করেছে। ধুলাদূষণে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ধুলাজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ।

রাস্তার পাশে দোকানের খাবার ধুলায় বিষাক্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে রোগ-জীবাণু মিশ্রিত ধুলা ফুসফুসে প্রবেশ করে সর্দি, কাশি, ফুসফুস ক্যান্সার, ব্রংকাইটিস, শ্বাসজনিত কষ্টসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করছে।

মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীসহ বড় বড় শহরে ইউটিলিটি সার্ভিস প্রোভাইডিং ও উন্নয়ন কাজের সাইটে নিয়মিত পানি ছিটানো, মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া সিটি কর্পোরেশন/ পৌরসভা/ উপজেলাসমূহ রাস্তা নির্মাণ/ উন্নয়ন/ মেরামতের সময় ও উন্নয়ন কাজের জন্য রাস্তা কাটার অনুমতি দেয়ার সময় নির্মাণকাজ ও নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন, মজুদ ও সংরক্ষণে পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং এসব ক্ষেত্রে যাতে ধুলাদূষণ না হয় তার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের শর্ত আরোপ করা এবং মানা হচ্ছে কি না তা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুস সোবহান আমার সংবাদকে বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। ধুলাবালির নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। শীত মৌসুমে দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাজধানীর বাতাস এখন জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

কিছুদিন আগেও বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মধ্যে তুলনামূলক বিচারে দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর ঢাকা। কিন্তু প্রয়োজনীয় তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের উৎস নিয়ে চলতি বছরের মার্চে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংক। সেখানে দেখা যায়, দেশে বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি উৎস হচ্ছে- ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও নির্মাণকাজ। আট বছর ধরে এ তিন উৎস ক্রমেই বেড়েছে।

এসব বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছেন, ঢাকা সিটিতে বায়ুদূষণের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ার পেছনে ইটভাটা, গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং যথেচ্ছ নির্মাণকাজ। সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো ও বিভিন্ন কাজে সমন্বয় করা প্রয়োজন। ইউটিলিটি সার্ভিসের কাজের জন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানসমূহ নির্মাণ সামগ্রী মাটি ও বালির একটি অংশ রাস্তার পড়ে যাচ্ছে, যা পরে বায়ুদূষণের সৃষ্টির জন্য বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ, ড্রেন পরিষ্কার করে ময়লা ড্রেনের পাশেই দীর্ঘদিন রাখা ও সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য পরিবহনের সময় অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থাপনার ফলে একটি অংশ রাস্তার ফেলে দেয়া হচ্ছে। এসব বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনার ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচলের ফলে বায়ুদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান আমার সংবাদকে বলেন, ধুলাদূষণে রাজধানী ঢাকার নগরবাসী নাকাল হলেও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। মৌসুমে রাজধানীতে ঠিক পরিকল্পনা ব্যতীত কোনো সমন্বয় ছাড়াই গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ এবং ফ্লাইওভার, রাস্তাঘাট উন্নয়ন ইত্যাদি সেবামূলক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাস্তা-ঘাট খোঁড়াখুঁড়ির কাজ বেড়ে যায়। এতে ধুলাদূষণের প্রকোপও দেখা দেয়।

প্রসঙ্গত, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ধুলাদূষণ রোধে জাঁকজমকপূর্ণ রাস্তায় পানি ছিটানোর ৯টি গাড়ি উদ্বোধন করলেও সফলতা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ রাস্তায় পানি ছিটানোর এক ঘণ্টা পরই পানি শুকিয়ে ধুলাদূষণ হচ্ছে। এতে পথচারী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা অফিসে যাওয়ার সময়ই ধুলাদূষণের কবলে পড়ছেন।

এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের আয়তনের তুলনায় পানির গাড়ির সংখ্যা অপ্রতুল। এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হোননি।

এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর