বিজয়ের মাসে ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের জয়

প্রিন্ট সংস্করণ॥রায়হান আহমেদ তপাদার   |   ০৩:২০, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

সদ্য সমাপ্ত ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন চারজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত নারী। এই জয়ে বাংলাদেশের সবাই অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত। এই চারজন নারী আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছেন ভিন দেশে প্রতিযোগিতায় নিজ যোগ্যতায় আমরাও জয়ী হতে পারি।

২০১০ এর নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন রুশনারা, ২০১৫ এর নির্বাচনে আরো দুজন উৎসাহী হয়ে প্রার্থী হয়েছেন এবং নির্বাচিত হয়েছেন। তরুণ রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ। মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হওয়া টিউলিপ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্রেটার লন্ডন অথরিটি এবং সেইভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গেও কাজ করেছেন।


২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে প্রথম বাঙালি নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে আরেকজন নির্বাচিত হলেন। ভবিষ্যতে ব্রিটেনসহ অন্য দেশের রাজনীতিতে বাঙালির অংশ গ্রহণে এই চারজন প্রেরণা হয়ে থাকবেন।

২০১৯ অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে নিজ দল লেবার পার্টির ভড়াডুবি হলেও নতুন একজনসহ চার বঙ্গকন্যা ছিনিয়ে এনেছেন জয়ের মালা। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বর্তমান এমপি রোশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিক ও রূপা হকের সাথে এবার নতুন আরেকজন আফসানা বেগমও এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।

অনুষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে। এই নির্বাচনে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রোশনারা পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৫২ ভোট। টিউলিপ সিদ্দিক ২৮ হাজার ৮০, রূপা হক ২৮ হাজার ১শ ৩২ এবং এই প্রথমবারের মত নির্বাচিত এমপি আফসানা বেগম পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬শ ৬০ ভোট।

নির্বাচনে বড় ব্যবধানে বরিস জনসনের দল কনজারভেটিভ পার্টি জয় পেলেও আটকাতে পারেনি এই চার বঙ্গকন্যাকে। নির্বাচনে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের কনজারভেটিভ পার্টি এবং জেরেমি করবিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি। নির্বাচনে দুই দলের হয়ে যারা লড়ছেন, তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত।

অর্থাৎ এবারের ব্রিটিশ নির্বাচনে লড়ছেন বাঙালিরাও। এদের মধ্যে আলোচনায় ছিলেন পাঁচ বাঙালি নারী। তারা হলেন- টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক, রুশনারা আলী, রূপা হক, আফসানা বেগম ও ব্যারিস্টার মেরিনা মাসুমা আহমেদ। তারা পাঁচজনই লড়েছেন বাম ধারার রাজনীতিক দল লেবারের প্রার্থী হিসেবে।

এছাড়াও লেবার পার্টির হয়ে আবারডিন নর্থ আসনে নুরুল হক আলী ও সাউথওয়েস্ট হার্টফোর্টশায়ার আসনে আলী আখলাকুল, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস দল থেকে কার্ডিফ সেন্ট্রাল আসনে বাবলিন মল্লিক ও উইয়ার ফরেস্ট আসনে সাজু মিয়া এবং ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের পক্ষে হ্যারো ওয়েস্ট আসনে আনোয়ারা আলী লড়েছেন।

যদিও সবার সফলতা আসেনি, তবে লেগে থাকলে একদিন তাদেরও সফলতা আসবে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। এবারের নির্বাচনে লেবার দলের এমন ভরাডুবির কথা বিবেচনায় এনে ব্রিটেনের লেবার পার্টির নেতৃত্ব থাকবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির বর্তমান প্রধান জেরেমি করবিন।

চলতি ব্রিটেনের জাতীয় নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির বড় জয় এবং লেবার পার্টির ব্যর্থতার কারণে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তিনি লড়বেন না বলেও জানিয়েছেন। সম্পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই বিজয়ী হয়েছেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি। ৩৬৪ আসনে বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের দল।

অন্যদিকে লেবার পার্টি ২০৩ আসনে জয় পেয়েছেন। লেবার পার্টির জন্য সবচাইতে হতাশাজনক বিষয় হলো, গতবারের তুলনায় ৫৯ আসনে কম ভোট পাওয়া। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটকে সমর্থন জানিয়েছেন এমন এলাকাগুলো দ্য নর্থ, মিডল্যান্ডস ও ওয়েলসেও আসন হারিয়েছে দলটি। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমনসের সাড়ে ছয়শ আসনের মধ্যে ৬০০টির ফল ঘোষণা করা হয়েছে।

এতে টরি পার্টি নতুন করে ৪৩টি আসন পেয়েছে। যেখানে বিরোধী দল লেবার হারিয়েছে ৫৫টি আসন। বরিস জনসন বলেছেন, ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার জন্য তার সরকার নতুন করে শক্তিশালী ম্যান্ডেট পেয়েছে।

পশ্চিম লন্ডনের অক্সব্রিজ আসনে জয়লাভের পর গত শুক্রবার জনসন বলেন, এখনকার পর্যায়ে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, কনজারভেটিভ সরকার কেবল ব্রেক্সিট কার্যকর করাই নয় বরং দেশকে একতাবদ্ধ করা এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যও নতুন করে শক্তিশালী বার্তা পেয়েছে। এদিকে লেবার পার্টির ভরাডুবির জন্য ব্রেক্সিটকে দায়ী করেছেন করবিন।

তিনি বলেন, ব্রেক্সিট এই দেশের সাধারণ রাজনীতিকে বিঘ্নিত করেছে। পুরো দেশ এখন দ্বিধাবিভক্ত। নির্বাচনের এই রাতকে ‘প্রচণ্ড হতাশার’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসার প্রশ্নে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ব্রেক্সিট গণভোটের পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতে সৃষ্ট অস্থিরতায় ডেভিড ক্যামেরুন সরকার ও তেরেসা মে-এর সরকার পদত্যাগের পরে বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ব্রেক্সিট সংকটের চূড়ান্ত কোনো সমাধান দিতে না পারায় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যকে সামনে রেখে ব্রিটিশ জনগণের মতামত গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে গণভোটের পরিবর্তে মধ্যবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এবং ১২ ডিসেম্বর সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। গত ১২ ডিসেম্বরে ব্রিটিশ জনগণ ৬৫০-সদস্যের হাউস অব কমন্স বা পার্লামেন্ট নির্বাচনের জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে এবং সে নির্বাচনে একক সরকার গঠনের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে কমপক্ষে ৩২৬- আসনে বিজয়ী হতে হবে।

আর সেটাই দখল করে নিলেন বরিস জনসনের দল। নির্বাচনে বেশ কয়েকটা রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের তালিকায় ছিলো বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টি, প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিস পার্টি, ব্রেক্সিট পার্টি ইত্যাদি দল।

এ নির্বাচনের লক্ষণীয় দুটো দিক হলো, ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পরবর্তী মাত্র আড়াই বছর পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৭ সালে নির্বাচিত পার্লামেন্ট পূর্ণমেয়াদ পূরণ করতে পারেনি। আর দ্বিতীয় দিকটি হলো, ১৯২৩ সালের পরে এবারই ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

অর্থাৎ ১৯২৩ সালের পরে এবং ২০১৯ সালের আগে ব্রিটেনে আর কখনো ডিসেম্বর মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ব্রিটেনের নির্বাচনকে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে অভিহিত করেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এসব পর্যবেক্ষকদের মতে, ১৯৪৪ সাল পরবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিলো সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে, এ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ব্রেক্সিটের ভবিষ্যত নির্ভর করছে।

প্রায় চার বছর আগে ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা-না থাকার প্রশ্নে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি গণভোটের আয়োজন করেছিলো এবং কনজারভেটিভ পার্টি তখন ই.ইউ থেকে বের হয়ে আসার অঙ্গীকারও করেছিলো। কিন্তু সেই গণভোটের রায় ব্রেক্সিটের পক্ষে এলেও ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয় টোরী সরকার।

বরং ব্রেক্সিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ জাতির অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছে এবং পর্যবেক্ষকরা তাই বলছেন, এ নির্বাচনে ব্রেক্সিট সংকটের একটা সমাধানের পথ বের হয়ে আসতে পারে; বিজয়ীরা ব্রেক্সিটের ভাগ্য স্থির করে ব্রিটেনকে অস্তিত্ব সংকটের কবল থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই এ নির্বাচনের প্রধান ইস্যুই হলো ব্রেক্সিট।

এ কারণে, এ নির্বাচনকে ‘ব্রেক্সিট নির্বাচন’ হিসেবে অভিহিত করেন রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা। আশা জাগানোর মতো খবর হলো, ব্রিটিশ সমাজ ব্যবস্থায় বাংলাদেশিরা এখন বোঝা নয়। তারা ব্রিটেনের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার বাহক। না, এটি কোনও সস্তা বক্তব্য বা মন্তব্য নয়। ভিনদেশি গবেষকদের পরিসংখ্যানই এমন খবর দিচ্ছে।

এ খবরটির গুরুত্বের দিক হলো এর প্রেক্ষাপট। কারণ ব্রিটেনে অতীতের পঞ্চাশ বছরের তুলনায় গত দশ বছরে বাংলাদেশি অভিবাসীর হার নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। মাত্র এক প্রজন্ম আগেও ব্রিটেনে এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটির পরিসংখ্যানে বাংলাদেশিরা ছিলেন পিছিয়েপড়াদের তালিকায়। এখন সেটা অতীত। বাস্তবতা পাল্টে গেছে।

যুক্তরাজ্যে এককভাবে বাংলাদেশি জনবহুল অঞ্চলের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে টাওয়ার হ্যামলেটস। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার বিভাগে টাওয়ার হ্যামলেটস ছিল দেশটির সবচেয়ে কম কার্যকর এরিয়া। ২০০৯ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা নানা ক্ষেত্রে দেশটির জাতীয় গড় অগ্রগতির চেয়েও অনগ্রসর ছিলেন।

কিন্তু মাত্র নয় বছরের ব্যবধানে ইসলাম ফোবিয়ার মতো বহু বাধা, নেতিবাচকতা সীমাবদ্ধতাকে জয় করেছেন বাংলাদেশিরা। যুক্তরাজ্যের মূলধারার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছেন তারা। এবং দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রার নেপথ্যে আছে তাদের মেধা, অভিভাবকদের আগ্রহ, পারিবারিক মূল্যবোধ।

বিদেশ বিভুইয়ে অসংখ্য কৃতিমুখ আছে যাদের সাফল্য বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশি বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেইসব সফল মানুষদের কীর্তিগাঁথায় আমরাও গৌরবান্বিত হই। কেউ শিক্ষাক্ষেত্রে, কেউ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে, কেউ ক্রীড়ায় কেউ ব্যবসায় উদ্যোগে কেউবা আবার সাংস্কৃতিক অঙ্গণে নিজেদের কৃত্ত্বি দিয়ে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের নাম।

আবার বিশ্ব রাজনীতিতেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কিংবা বিদেশি বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য আসছে হরহামেশাই। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মূল ধারার রাজনীতিতে সবেমাত্র খুঁটি গাড়তে শুরু করেছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ইতোমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের পাশাপাশি মার্কিন ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রশাসনেও জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশিদের অনেকে।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে চারজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এমপি রয়েছেন। স্থানীয় সরকারে অর্ধ-শতাধিক বাংলাদেশি কাউন্সিলর। বাংলাদেশের বাইরে কেবল ব্রিটেনেই নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা দিন-দিন বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের মূলধারায় আমাদের প্রজন্মকে আরও এগিয়ে নেওয়াসহ প্রতিবন্ধকতাগুলো সমন্বিতভাবে দূর করার সময় এখনই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর