মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনায় শেষ ইজতেমার প্রথম পর্ব

আমিন ধ্বনিতে মুখরিত তুরাগতীর

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক   |   ১২:২১, জানুয়ারি ১৩, ২০২০

তুরাগ তীরে আখেরি মুনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথমপর্ব। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ ও শান্তি কামনায় মুনাজাতে অংশ নেয় বিদেশি মেহমানসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মুসল্লি।

বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রধান মারকাজ কাকরাইলের মুরব্বি হাফেজ মাওলানা জোবায়ের আহমেদের অনুসারীদের অংশগ্রহণে প্রথমপর্বের আখেরি মুনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা জোবায়ের। মুনাজাতে গণভবন থেকে সপরিবারে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।


গতকাল রোববার ফজরের নামাজের পরই পাকিস্তানের মাওলানা ওবায়দুল খোরশেদের আম বয়ানের মধ্য দিয়ে প্রথমপর্বের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। আখেরি মুনাজাত উপলক্ষে ভোর থেকেই ঢাকা ও দূর-দূরান্তের জেলা থেকে মুসল্লিরা ইজতেমাস্থলে আসতে শুরু করেন।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুসল্লিদের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে ইজতেমা প্রাঙ্গণ। ইজতেমাস্থল ও আশপাশের মুসল্লিরা বিভিন্ন অফিস, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে হাত তুলে মুনাজাতে অংশ নেন।

প্রথমপর্বের শেষ দিনের শুরুতে বাদ ফজর ইজতেমা ময়দানে মুসল্লিদের উদ্দেশে হেদায়েতি বয়ান পেশ করেন পাকিস্তানের আরেক মাওলানা জিয়াউল হক। আখেরি মুনাজাতের আগে বিশেষ বয়ান করেন ভারতের আরেক মাওলানা ইবরাহিম দেওলা।

এবারের ইজতেমার আখেরি মুনাজাতে অংশ নিতে সকাল থেকে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে লাখ লাখ মানুষকে ইজতেমা ময়দানে স্রোতের মতো ছুটে আসতে দেখা যায়। সকালে দিক-নির্দেশনামূলক বয়ানের পর লাখ লাখ মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে বেলা ১১টা ৮ মিনিটে।

জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। কান্নায় বুক ভাসান তারা। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এ আখেরি মুনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও নিজ নিজ গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করার জন্য দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করেন মুসল্লিরা। ৩৮ মিনিটব্যাপী মুনাজাতে মাওলানা জোবায়ের আহমেদ প্রথম ১৮ মিনিট মূলত পবিত্র কুরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন। শেষ ২০ মিনিট দোয়া করেন বাংলা ভাষায়।

মুঠোফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সস্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরও লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। অনেকে বিমানবন্দর গোল চত্বর কিংবা উত্তরা থেকে আখেরি মুনাজাতে অংশ নেন।

এসময় রাজধানী ঢাকা ছিলো প্রায় ফাঁকা। আখেরি মুনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী, গাজীপুর, উত্তরাসহ চারপাশের এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, মার্কেট, বিপণিবিতান, অফিসসহ সবকিছু ছিলো বন্ধ। এবারের ইজতেমার প্রথমপর্বে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে ৯ মুসল্লি মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

ইজতেমা ময়দানে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মিডিয়া সেন্টারে দায়িত্বরত গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মো. মনজুর রহমান জানান, এবারের ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের মধ্যে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে শুক্রবার বিকাল থেকে শনিবার পর্যন্ত ইজতেমায় আগত ৯ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে শনিবার ফজরের নামাজের পর দুজনের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ইজতেমা ময়দানে।

নিহতরা হলেন— রাজশাহীর চারগাছ থানার বনকিশোর এলাকার আব্দুর রাজ্জাক (৬৭), কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ডিমলা এলাকার তমিজ উদ্দিন (৬৫), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থানার বড়তোল্লা এলাকার মো. শাহজাহান (৬০), বরিশালের গৌরনদী থানার খালিজপুর এলাকার আলী আজগর (৭০), নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার দক্ষিণ-কলাবাগান এলাকার মো. ইউসুফ আলী মেম্বার (৪৫), গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া এলাকার মো. ইয়াকুব আলী (৭৫), চট্টগ্রামের মোহাম্মদ আলী (৭০), সিরাজগঞ্জের খোকা মিয়া (৬০) এবং নওগাঁর শহিদুল ইসলাম (৫৫)।

এদিকে চারদিন বিরতি দিয়ে দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীদের অংশগ্রহণে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব আগামী ১৭ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে শুরু হবে। ১৯ জানুয়ারি আখেরি মুনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে এ বছরের বিশ্ব ইজতেমা।

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, খুব সকালেই চারদিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা স্থলে পৌঁছায়। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেলে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলিগলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমা স্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেয়।

ভোর থেকেই ফজরের নামাজ ও আখেরি মুনাজাতের জন্য পুরনো খবরের কাগজ, পাটি, সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন সিট বিছিয়ে বসে পড়েন। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বাসাবাড়ি, কলকারখানা, অফিস, দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদীতে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। ইজতেমা স্থলের চারপাশের তিন-চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিলো না।

উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকেই টঙ্গীর তুরাগ তীরে ইজতেমা মাঠে তাবলিগ জামাত বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করে আসছে। ইজতেমা মাঠের চাপ কমাতে এবং নিরাপত্তা ও উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ২০১১ সাল থেকে দুই ধাপে ইজতেমার আয়োজন হয়ে আসছে।

আখেরি মুনাজাতে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী
টঙ্গীর তুরাগতীরে আয়োজিত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মুনাজাতে শরিক হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে গতকাল সকালে মুনাজাতে শরিক হন।

এছাড়া ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা গণভবন থেকে মুনাজাতে শরিক হন।

এ উপলক্ষে বিশেষ মুনাজাতে দেশের জন্য অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি এবং কল্যাণ কামনার পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্য কামনা করা হয়।

কাকরাইল মসজিদের সিনিয়র ইসলামিক ব্যক্তিত্ব হাফিজ মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের বাংলা ও আরবি উভয় ভাষায় ৩৫ মিনিট মুনাজাত পরিচালনা করেন।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর