সান্ধ্যকোর্স বন্ধ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ   |   ১০:৩৯, জানুয়ারি ১৪, ২০২০

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও বাণিজ্যিক সান্ধ্যকালীন বিভিন্ন প্রোগ্রাম বা কোর্স চালু রয়েছে। এসব কোর্স নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা হয়ে আসছে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এসব কোর্সের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও (ইউজিসি) এসব কোর্স বন্ধের সুপারিশ করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব কোর্স বন্ধ করবে কিনা তা নিয়ে সামগ্রিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত আসেনি।


ফলে বাণিজ্যিক এসব কোর্স এখনই বন্ধ হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বাণিজ্যিক এসব কোর্স পড়িয়ে শিক্ষকরা কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ আয় করে। তাই হঠাৎ করেই একবারে এসব কোর্স বন্ধ করার সম্ভাবনা কম।

এদিকে, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বক্তব্যের পর সান্ধ্যকোর্স বন্ধের ঘোষণা দেয়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ‘উইকেন্ড কোর্স’ নামে এসব কোর্স চালাবে বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে এ কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।

২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথম সান্ধ্যকোর্স শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেই এ কোর্স নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য দেন আচার্য। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়টিই সান্ধ্যকোর্স বন্ধ্যের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সান্ধ্যকোর্সে অনেক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এখান থেকে কোর্স করে পেশাজীবনেও ভালো করছে তারা। অনেক চাকরিজীবী ঢাবি থেকে একটি কোর্স করার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন। আমাদের শিক্ষার মান ভালো বলেই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেশি থাকে। এ অবস্থায় সান্ধ্যকোর্স বন্ধ করে দেয়াটা কতটুকু যৌক্তিক হবে তা ভেবে দেখা দরকার।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করছি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বা বেসরকারি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই সান্ধ্যকোর্সের অনুমোদন নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান তাই তারা নিজ দায়িত্বে এসব কোর্স চালু করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে দেশে ২০টির মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন নামে সান্ধ্যকোর্স চালু রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষকদের আয়েরও বড় উৎস এসব কোর্স। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে ইভিনিং মাস্টার্স, ডিপ্লোমা, স্পেশালাইজড মাস্টার্সসহ বিভিন্ন নামের সান্ধ্যকোর্স চালু রয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও চালু রয়েছে সান্ধ্যকোর্স। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯টি অনুষদের অধীন বিভাগ রয়েছে ৫৯টি আর ইনস্টিটিউট রয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে ১৪টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউটে সান্ধ্যকোর্স চালু রয়েছে। সান্ধ্যকোর্স বন্ধের দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়মিত শিক্ষার্থীরা।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এ কোর্স বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কাউন্সিলে এ সংক্রান্ত একটা কমিটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের সর্বশেষ একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে এ সংক্রান্ত একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা তদন্ত সাপেক্ষে একটি রিপোর্ট দেবে। এরপর সান্ধ্যকোর্স বন্ধ করা না করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউটে সান্ধ্যকোর্স চালু রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রথম সান্ধ্যকোর্স চালু করে। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য বিভাগও বাণিজ্যিক এ কোর্স চালু করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়টিও সান্ধ্যকোর্স বন্ধের বিষয়ে লিখিত কোনো ঘোষণা দেয়নি বলে জানা গেছে। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪টি বিভাগে চালু রয়েছে সান্ধ্যকোর্স। এ বিশ্ববিদ্যালয়টিও সান্ধ্যকোর্স বন্ধের ঘোষণা দেয়নি।

তবে ইউজিসির নির্দেশনার পর কোর্সটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. হারুন-উর-রশিদ আসকারী।

তিনি আমার সংবাদকে বলেন, ইউজিসির নির্দেশনার পর সান্ধ্যকোর্স বন্ধের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তবে একজন একাডেমিশিয়ান হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমি এ কোর্স বন্ধের পক্ষে। আমি উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর এসব কোর্স বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু শিক্ষক সমিতির অনুরোধে ফের তা চালু করেছিলাম। ইউজিসির নির্দেশনার পর এটি বন্ধ করা আমাদের জন্য সহজ হবে। আগামী একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিংয়ে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর ঘটা করেই সান্ধ্যকালীন কোর্সে নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তি না করার ঘোষণা দেয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সান্ধ্যকোর্স বন্ধের ঘোষণা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘উইকেন্ড কোর্স’ চালু করেছে।

সম্প্রতি এ কোর্সে ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। বাণিজ্য অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে বলে ওই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আবেদন করা যাবে। আর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ৩১ জানুয়ারি।

এছাড়া, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সান্ধ্যকোর্স বন্ধের ঘোষণা দেয়নি বলে জানা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে ইউজিসির সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজ বেগম আমার সংবাদকে বলেন, শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত না করে আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করেই এ ধরনের কোর্স চালানো হচ্ছে। এসব কোর্সে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্লাসও নেয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সহজে সনদ পাওয়া যায়। আমরা এই জন্য প্রতিবেদনে কোর্সগুলো বন্ধের সুপারিশ করেছি।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ


আরও পড়ুন

সর্বশেষ সংবাদ

সব খবর