শিরোনাম

মাদ্রাসা অধ্যক্ষের সফলতার গল্প

প্রিন্ট সংস্করণ॥ অনিক আহমেদ, গবি প্রতিনিধি  |  ০১:২৩, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯

মো. মনসুর রহমান। পেশায় শিক্ষক; নাটোর সদর উপজেলার বাকশোর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। আর দশজন মানুষের মতোই তিনি একজন মানুষ, তবে একজন সফল মানুষ। কারণ, তিনি নিজ প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছেন একটি ডেইরি ফার্ম যার নাম- জমজম ডেইরি ফার্ম। পুরো নাটোর এবং আশেপাশের জেলাগুলোতেও এই ফার্ম সমানভাবে পরিচিত।

প্রায় ১২ বছর আগের কথা। দুধ উৎপাদনের উদ্দেশে মাত্র দুটি হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান জাতের গরু নিয়ে খামার শুরু করেছিলেন নাটোর সদর উপজেলার দীঘাপতিয়ার মো. মনসুর রহমান। শুরুর পথটা অতটা সহজ ছিলো না। পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে শুরুতে তিনি ছিলেন অসফল। যার কারণে ফার্ম শুরুর বছর দুয়েকের মাঝেই মারা যায় তার তিন-চারটি গাভী। কিন্তু থেমে থাকেনি তার পথচলা, বরং দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে পর্যাপ্ত সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করে এগোতে থাকেন। মেধার সঠিক ব্যবহার আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আস্তে আস্তে সফলতার মুখ দেখেন তিনি।

বর্তমানে তার খামারে মোট ৪৪টি গরু রয়েছে যার মধ্যে ২৪টি দুধ দেয়া গাভী। প্রতিদিন মনসুর মিয়ার খামার থেকে গড়ে ২৫০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। দুধ বিক্রি করে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার টাকা পাচ্ছেন। দুধ দোহনের জন্য তিনি মিল্কিং মেশিন ব্যবহার করেন, যার ফলে কম সময়ে সহজে বেশি পরিমাণ দুধ উৎপাদন নিশ্চিত হয় এবং এতে গরুর কষ্টও কম হয়। দুধ দোহনের মেশিনটি সুইজারল্যান্ড থেকে আনা, যা তিনি ৮৬ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। পর্যাপ্ত খাবারের যোগান দিতে খামারের পাশেই সাত-আট বিঘা জমিতে চাষ করেছেন থাইল্যান্ডের পাকচং ঘাস।

এছাড়া তিনি বিভিন্ন দানাদার খাদ্য যেমন— গমের ভূষি, খেসারি ভাঙ্গা, খৈলসহ প্রয়োজনীয় সকল খাদ্য দিয়ে থাকেন। তবে তিনি গরুকে কাঁচাঘাসই বেশি খাওয়ান। কারণ হিসেবে মনসুর রহমান জানান, ‘প্রচুর পরিমাণে কাচা ঘাস খাওয়ানোর ফলে দুধ উৎপাদন অনেক বেশি হয়, রোগব্যাধি কম হয় এবং বীজ কনসিভ করার হার বাড়ে।’ এ কারণে তিনি তার খামারে খড় খাওয়ান না বললেই চলে। প্রতিদিন গড়ে একটি গাভীকে ছয়-সাত কেজি খাবার দিয়ে থাকেন। খামারের গরুগুলোর রোগব্যাধি খুব কম, যা তার লাভবান হওয়ার অন্যতম একটি কারণ।মনসুর রহমানের খামারের বেশ কিছু লক্ষ্যণীয় বিষয় রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো তার খামারের গরু মাত্র ১০ মাস বয়স হলেই বীজ কনসিভ করে। স্থানীয় পশু ডাক্তাররা এটাকে বিরল একটি ঘটনা বলে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশে হাতেগুনা মাত্র দুই-একটি খামারে এমন ঘটনা ঘটে। তাছাড়া, প্রথমবার বাচ্চা প্রসবের পরই গাভীগুলো ২০ কেজির উপরে দুধ দিয়ে থাকে এবং বাচ্চা প্রসবের দুই মাস পরই বীজ দিলে একবারেই কনসিভ করে।

তাছাড়া খামারের গরুগুলো বয়স অনুযায়ী অনেক বেশি স্বাস্থ্যবান। যমযম ডেইরি ফার্মে প্রবেশ পথেই রয়েছে জীবাণুনাশক যা বাইরের জীবাণুকে ভেতরে প্রবেশে বাধা দেয়। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির যোগান দিতে প্রতিটি গরুর ম্যাঞ্জারে (খাবার যেখানে দেয়া হয়) পানির ট্যাপের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটা ম্যাঞ্জারের নিচে আরেকটা ট্যাপ রয়েছে যেটা দিয়ে অপ্রয়োজনীয় পানি এবং তরল দ্রব্য নিষ্কাশন করা হয়। বাংলাদেশের ডেইরি ফার্মগুলোতে এ ধরনের ব্যবস্থা সাধারণত দেখা যায় না। নিচে কার্পেটের ব্যবস্থা করা আছে যার মাধ্যমে বর্জ্য পর্দাথসমূহকে সহজেই পানি দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করা হয়। খামারের গোবর দিয়ে নির্মাণ করেছেন বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। এ প্ল্যান্টের মাধ্যমে বাড়ির রান্নাবান্না করা হয়। পাশাপাশি গোবর সার জমিতে ব্যবহার করে তিনি অধিক পরিমাণ ফসল উৎপাদন করছেন।

দুধ বিক্রির বিষয়ে অভিযোগ করে মনসুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমরা দুধের নায্যমূল্য পাচ্ছি না। আগে মিল্কভিটা ছিলো যার মাধ্যমে আমরা সঠিক মূল্য পেতাম। কিন্তু এখন মিল্কভিটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ঘোষরা সিন্ডিকেট তৈরি করে, যার ফলে অনেক কম দামে দুধ বিক্রি করতে হয়। অনেক সময় দানাদার খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়। এ জন্য সাম্প্রতিককালে আমরা শহরে দুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করেছি। আশা করছি, এর মাধ্যমে আমরা দুধের নায্যমূল্য পাবো।’ যমযম ডেইরি ফার্মের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এটি যথাসম্ভব আধুনিক প্রযুক্তির আওতাভুক্ত। দুধ দোহনের জন্য রয়েছে যেমন মেশিন তেমনি ঘাস কাটার জন্যও ৩৭ হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করা হয়েছে গ্রাস চপিং মেশিন। এ ছাড়াও রয়েছে আরো অত্যাধুনিক আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। খামারের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে শীঘ্রই সিসিটিভির ব্যবস্থা করা হবে। খামারের দেখাশোনার পাঁচজন শ্রমিক নিয়োজিত আছেন।

মনসুর রহমান তার ছেলেকে রাজধানী ঢাকার সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি বিষয়ে পড়াশোনা করাচ্ছেন। তার ইচ্ছা, প্রতিযোগিতামূলক এই যুগে চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে যেন তার ছেলেকে ঘুরতে না হয়। এলাকায় থেকে এই ফার্মের মাধ্যমে যেন সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, এমনটাই আশা তার। প্রাণীজ আমিষ দুধের অভাব পূরণ এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাকরণে যমযম ডেইরি ফার্ম মনসুর রহমানের এই ফার্ম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হয়েও ডেইরি ফার্ম করে তিনি যে সফলতা দেখিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসেন যমযম ডেইরি ফার্ম পরিদর্শনের জন্য। নতুন খামার করতে আগ্রহীদের যাবতীয় পরামর্শও দিয়ে থাকেন মনসুর রহমান।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত