শিরোনাম

ভালোবাসা আজও ধর্মের জালে প্রশ্নবিদ্ধ!

  |  ১০:৪৭, মার্চ ২৯, ২০১৯

ফেকাসে হয়ে পড়ছে মানসিকতা। মোবাইলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাড়ায় আগের মতো বই হাতে পড়তে মন চায় না অনিকেতের। শোয়ার ঘরে শুয়ে মোবাইলে ফেসবুক চালাতে চালতে ঘুম। কিন্তু হঠাৎ টুংটাং ম্যাসেঞ্জারের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে অনিকেতের। বড্ড অনিয়মের ভেতর না বুঝে ঘুমানোটাই তার এখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ম্যাসেঞ্জারে অনেকগুলো ম্যাসেজ এসে জমা হয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও দু’চোখের পাতাগুলো খুলে অনিকেত। তখন ম্যাসেঞ্জারে প্রত্যাশার ম্যাসেজ দেখেই পুরো শরীর জুড়ে একটা কম্পন দিয়ে উঠে। তার এতোগুলা ক্ষুদেবার্তার প্রত্যেকে উত্তর না দেয়ায় অনেকে রাগ করেছেন। কারণ অনিকেতই সবসময় আগ বাড়িয়ে প্রত্যাশা’কে এক রকম জ্বালাতনের মধ্যেই রাখে।

এসব ভাবনার মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে কল দেয় প্রত্যাশাকে আর প্রত্যাশা ইতিমধ্যেই রেগে লাল হয়ে আছে। প্রত্যাশার রাগ এমনিতে একটু বেশি। তার ভালোবাসাটা যেমন বেশি ছিলো, রাগটা বেশিই ছিলো। আর তার রাগ করলে অদ্ভুত একটা স্বভাব আছে, কোনো গালাগালি বা বাসন ভেঙ্গে তার জবাব দেয় না সে। সে একদম দমবন্ধ বাকরুদ্ধ অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলা ছাড়াই থাকে প্রত্যাশা। মিনিট পনের পর একটু কথা বলে, আর বলে সরি ও বলতে পারো নাহ!

-শুনো, আজ বারোটায় আমার ক্লাস শেষ। তোমার কফির দাওয়াত। আর শুনো আজ কিন্তু আমি পে করব। মনে থাকে যেন। সে কোনো বাড়াবাড়ি নয়।
প্রত্যাশা আর অনিকেতের তাদের মধ্যে প্রথম পরিচয়টা কীভাবে হয়েছিলো, মনে আছে?
অনিকেতকে প্রশ্ন করে প্রত্যাশা।
-দ্যাখো তুমি আমার নিত্য পরিচিত, জনম জনমের পরিচিত,
-এই যে সাহেব ভাব নিবেন না কিন্তু কফি নেন,আর আমাকে পাম দিবেন না বুঝলেন অনিকেত সাহেব।
আমি বেলুন নই যে ফুলে যাবো।
ঠিক যেন একদম বাচ্চা মেয়ের হাসির ফুলঝুরিতে ফেটে পড়ছিলো প্রত্যাশা কিন্তু আসলে অনিকেতই তার কাছে বাচ্চার মতো। তার সব কথাই শুনতে হয় অনিকেতকে। বাধ্যগত বললে খুব বেশি ভুল হবে না, এইটা ও এক ধরনের ভালোবাসা ছিলো।
-অনিকেত প্রত্যাশার ছোট্ট আবদার টুকুও ফেলে না কোনো সময়।
-শোনো প্রত্যাশা আমরা খুব কাছাকাছি এলাকায় বেড়ে উঠেছি। সো তোমার সাথে পরিচয় বলতে গেলে ফরমালি কিছু নেই,তবে তোমার চোখ একটা কথা বলে কি জানো, তোমার এই চোখ বলে শত সহস্র ছরের অলেখা পরিচিত ছিলো তোমার আমার। যেন সব শৃঙ্খলের বাইরে আমরা দু’জন। আর ঐ যে এ্যাডমিশনের সময় তুমি যখন তোমাদের গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছিলে, তখন দেখে মনে হচ্ছিলো বছরের পর বছর ধরে রাখা আবেগগুলো আর বাধাঁ মানেনি। এক প্রমত্ত উল্লাসে ফেটে পড়ে আমার হৃদয় আর তোমাকে বলা হয়ে উঠে স্বগোত্তোক্তি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। যেন এক জমাট বাধাঁ বরফ পাহাড়ের গলা শুরু হয়, তোমার আমার প্রেমের আনুষ্ঠানিকতা। অনিকেতের চোখগুলো ছলছল করছিলো। প্রত্যাশা তার হাত দুখানা বাড়িয়ে দিয়ে অনিকেতের হাত চেপে ধরে আর ভাঙ্গা গলায় বলতে থাকে, আমাদের দুজনার হাতজোড়া একটাই মনে করব। দ্যাখো আমার চোখ কি বলে, শুধুই কি ভালোবাসি বলে নাকি অগাধ বিশ্বাসের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

দিনচলা এ পথে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সম্পর্কের অকৃত্রিমতা। ভালোবাসার গল্পেরা জমাট বাধঁতে শুরু করে পাখির নীড়ের মতন।
সন্ধ্যা অবধি দুজনে মত করে চলে প্রত্যাশাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসে অনিকেত। ফিরতে না চাইলে ও ফিরতে হয় তাকে। ক্রমশ বাড়মান দূরত্ব যেনো সম্পর্কটাকে আরো গভীর থেকে গভীরতম করে তুলে। দিনের পর দিন যায় অনিকেতের আর প্রত্যাশার। প্রেমের বন্ধনের হৃদ্যতা ঘনিষ্ঠতর হয়। আর একজনের অনুভূতি যেনো অনুভূতি হয়ে উঠে।এভাবে কেটে যায় প্রায় বছর দেড়েক তাহাদের ভালোবাসায় কোনোরূপ ভাটা পড়েনি বরং দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।পার্কের বেঞ্চি থেকে শুরু করে নিত্যদিনের সবকিছুই তাহারা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠে। প্রেমিক যুগলের মধুময় সময়ের সন্ধিক্ষণে প্রত্যাশার মা একদিন সবকিছু বুঝে ফেলে, জেনে যায়।
কিন্তু অনিকেতকে ভালো ছেলে হিসেবে জানতেন, অনিকেতের ধর্ম হিসেবে সে মুসলিম, তার পুরো নাম মোঃ অনিকেত, আর প্রত্যাশা হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া হিন্দু, তার পুরো নাম প্রত্যাশা সেন। প্রত্যাশা আর অনিকেতের মাঝে ধর্ম বড় বাঁধা তৈরি করে।

এ ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়টি ধীরে ধীরে এক ফাটল তৈরি করতে থাকে নিজেদের মাঝে। মাস দুয়েক এ ফাটল থেকে মহাসমুদ্রের দূরত্ব তৈরি করে। আজ প্রত্যাশার মোবাইল থেকে অনেক ম্যাসেজ আসার পর আর তাকে রিপ্লাই করতে পারছিলো না, অনিকেত। শেষ বার্তাটায় প্রত্যাশা লিখেছে’ আমার ভালোবাসা ধর্মের কারণে মনবিকতার কাছে হার মেনেছে। সমাজবদ্ধ মানুষ হিসেবে আমিও সমাজকে পরোয়া না করে পারিনি। আমি আমার মায়ের কাছে কসম কেটেছি আমি আমার বিশ্বাস নয় ভালোবাসা কে বলি দিব’, ভালো থেকো অনিকেত, অনেক ভালো থেকো।

অনবরত চোখ দিয়ে টলটল করে পানি পড়ছিলো অনিকেতের আর মনে হচ্ছিলো নিশ্বাসটুকু যেনো এখনি বন্ধ হয়ে যাবে। আর চারদিক থেকে রুমের দেয়ালগুলো তাকে চেপে ধরছিলো খুব কঠিন ভাবে। টগবগে একজন যুবকের মনোবিস্ফরণের ছবিখানা কেউ অনুমান করতে পারবে বলে মনে হয় না। আর লিখার ভাষায়ই এ গল্পকে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব বলে মনে হয় না।ম্যাসেঞ্জারটি খুলে বহুবার চেষ্টা করেছিলো অনিকেত আর একবার যদি একটা বার্তা পাঠানো যেতো, হয়তো তার ভালোবাসা এ ধর্মের বাঁধায় অবনত হতো না।
অবনত হতো না আমাদের প্রথাগত সংস্কৃতির বেড়াজালে। তুলসী গাছওয়ালা সেই তিনতলা বাড়িটি আজ নতুনভাবে সেজেছে হয়তো। হয়তো বা না তাহাদের রীতি ও হয়তো বদলেছে হয়তো মানুষ এখন হয়ে জন্ম নেয় মানুষ হয়ে, ধর্ম হয়ে নয়।

আর ধুসর বাড়িটির মেইনগেটে অনেক জীর্নশীর্ন একটি পাগলের দেখা যায়, সেই পচিঁশ বছর আগের যুবক অনিকেত, এখন ও প্রত্যাশার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে। হয়তো তার প্রত্যাশাকে চেনার সাধ্যটুকু নাই কিন্তু স্বাদটুকু হয়তো রয়ে গেছে। হঠাৎ করেই জীর্নশীর্ণ অনিকেত আকাশের পানে চেয়ে ফ্যালফ্যাল করে হাসে হাসতে থাকে অট্টহাসি। আর বলতে থাকে আমার কোনো ধর্ম নাই, আমার কোনো ধর্ম নাই, ধর্ম নাই,,হা হা হা হা,, আমরা সবাই মানুষ,, আমরা মানুষ, মানুষই আসল ধর্ম।। ভালোবাসা আজ প্রশ্নের জালে প্রশ্নবিদ্ধ!!!

-লিখেছেন
সারোয়ার হোসাইন,
পরিসংখ্যান বিভাগ(মাস্টার্স), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত