মঙ্গলবার ০৭ এপ্রিল ২০২০

২৩ চৈত্র ১৪২৬

ই-পেপার

বরগুনা প্রতিনিধি

মার্চ ২৬,২০২০, ১০:৩১

মার্চ ২৬,২০২০, ১০:৩১

থানা হাজতে আসামির রহস্যজনক মৃত্যু

বরগুনার আমতলী থানায় হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন এক আসামির রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। সানু হাওলাদার নামের ওই আসামিকে গত সোমবার রাতে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাবাদের নামের আটক রাখার তিনদিন থানা হাজতের রাখার পর বৃহস্পতিবার ভোরে থানা হাজতে তাঁর মৃত্যু হয়।

পুলিশের দাবি, সানু থানার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির কক্ষের ফ্যানের সাথে রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তবে আসামির স্বজনদের দাবি, গ্রেপ্তারের পর বিপুল অংকের টাকা দাবি করে পুলিশ। টাকা না দেয়ায় তাকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে পুলিশ।

এ ঘটনায় আমতলী থানার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

নিহতের পারিবার সূত্রে জানায়, উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের পশ্চিম কলাগাছিয়া গ্রামে গত বছর ৩ নভেম্বরে ইব্রাহিম নামের একজন কৃষককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা । ওই হত্যা মামলায় শানু হাওলাদারের সৎ ভাই মিজানুর রহমান হাওলাদার এজাহারভুক্ত আসামি।

নিহতের ছেলে সাকিব হাওলাদার জানান, ইব্রাহীম হত্যার ঘটনায় শানু হাওলদারকে গত সোমবার রাত সাড়ে এগারটার দিকে সহেন্দভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করে আমতলী থানা পুলিশ। পরে ওসি আবুল বাশার ও ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি তিন লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেন। কিন্ত ঘুষ না দেয়ায় শানু হাওলাদারকে থানা হাজতে রেখে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করে। এতে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় পুলিশ। এক পর্যায়ে নির্যাতন সইতে না পেয়ে আসামির ছেলে সাকিব হোসেন মঙ্গলবার ওসি আবুল বাশারকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দেন। কিন্তু তাতে তিনি খুশি হয়নি। নির্যাতনের চালিয়ে যায় পুলিশ।

সাকিব জানান, বুধবার আসামির পরিবারের লোকজন এসে আসামি শানু হাওলাদারের সাথে দেখা করতে চাইলে পুলিশ তাদের ধমকে তাড়িয়ে দেয়। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ছয়টার দিকে আসামি শানু ওয়াশ রুমে যাওয়ার কথা বললে পুলিশ তাকে ওয়াশ রুমে নিয়ে যায়। পরে এক ফাঁকে আসামি শানু হাওলাদার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির কক্ষে ফ্যানের সাথে রশি পেচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে নিহতের স্বজনদের জানান থানার ওসি ওসির আবুল বাশার।

এ খবর শোনার পর নিহতের স্বজনরা থানা ফটকের সামনে আহাজারি করে। আধা ঘন্টা পরে পুলিশ ফটক খুলে দেয়। এ সময় থানার ভিতরে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়।

খবর পেয়ে বরগুনা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন পিপিএম আমতলী থানা আসেন। ঘটনা তদন্তে জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. তোফায়েল আহম্মেদকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ঠ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বরগুনা সদর) মো. মহব্বত আলী ও সহকারী পুলিশ সুপার (আমতলী-তালতলী সার্কেল) সৈয়দ রবিউল ইসলাম।

ওইদিন বেলা সাড়ে ১০ টায় বরগুনা জেলার সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আসাদুজ্জামান ও আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ অধিকারী নিহত শানু হাওলাদারের সুরাতহাল করেন। এ ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার দায়ে তাৎক্ষনিক বরগুনা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন আমতলী থানার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। নিহত শানু হাওলাদারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বরগুনা মর্গে প্রেরণ করেছে পুলিশ।

নিহত শানু হাওলাদারের শ্যালক রাকিবুল ইসলাম বলেন, দুলাভাইকে ধরে আনার পর থেকে আমি থানায় প্রাঙ্গণে ছিলাম। পুলিশ তাকে টাকার জন্য বেধরক মারধর করেছে। তার ডাক চিৎকার শুনেছি। বহুবার চেষ্টা করেছি তার সাথে দেখা করতে কিন্তু পুলিশ দেয়া করতে দেয়নি। উল্টো আমাদের সাথে খারাপ আচরণ করেছে।

নিহত শানু হাওলাদারের স্ত্রী মোসা. ঝড়না বেগম বলেন, পাঁচজন পুলিশ যাইয়্যা সোমবার রাইতে মোর স্বামীরে বাড়ি গোনে ধইর‌্যা আনছে। আনার সময় মোর কাছে টাকা চাইছে। মুই টাকা দেতে রাজি অই নাই হেইয়্যার লইগ্যা মোর স্বামীকে পুলিশে পিডাইয়্যা মাইয়্যা হালাইছে। মুই এইয়্যার বিচার চাই। থানার ভিতরে ঝড়না বেগম এই বিলাপ করে বারবার মুর্ছা যাচ্ছিল।

গুলিশাখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এ্যাড. আলহাজ্ব মো. নুরুল ইসলাম বলেন, শানু হাওলাদারকে বাড়ি থেকে ধরে এনে নির্যাতন করেছে। আত্মহত্যার ঘটনা পুলিশের সাজানো। আমতলী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান বলেন, থানার ওসি মো. আবুল বাশার টাকা না পেয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার দাবি করছি।

বিষয়টি কি ঘটেছে জানতে চাইলে আমতলী থানার ওসি মো. আবুল বাশার বলেন, আসামী শানু হাওলাদার বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৬ টার দিকে ওয়াস রুমে যাওয়ার জন্য বলে। সে ওয়াস রুম থেকে ফিরে এসে এক ফাঁকে হাজত খানার ফ্যানের সাথে গলায় রশি পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু হাজত খানায় কোন ফ্যান নেই সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি পূর্বের কথা পাল্টে বলেন, ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জনের কক্ষে ফ্যানের সাথে রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। টাকা না দেয়ায় তাকে নির্যাতন করে হত্যা করেছেন এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান। জিজ্ঞাসাবাদের নামের তিন দিন থানা হাজতের রাখার বিধান আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর প্রসাদ অধিকারী বলেন, নিহত শানু হাওলাদারের শরীরে আঘাতের চিহৃ রয়েছে। তবে ময়না তদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সঠিক কারণ বলা যাবে না। এ ঘটনার তদন্তকারী প্রধান বরগুনা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশাসন ও অপরাধ মো. তোফায়েল আহম্মেদ বলেন, দায়িত্ব অবহেলার দায়ে ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি ও ডিউটি অফিসার এএসআই মো. আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বরগুনা জেলা পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন পিপিএম বলেন, এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ টাকা না পেয়ে নির্যাতন করে হত্যা করেছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি। তিনি আরো বলেন, অপরাধী যেই হোক নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আমারসংবাদ/এমআর