শিরোনাম

থাইল্যান্ড প্রবাসীর ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ

আমার সংবাদ ডেস্ক  |  ১২:৫৪, অক্টোবর ১০, ২০১৯

থাইল্যান্ডে থাকতেন বাংলাদেশি প্রবাসী আকবর হোসেন। সেখানে অবস্থানরত অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে অংশীদারে করতে চেয়েছিলেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। শুরুও করেছিলেন ৪৫ লাখ টাকা দিয়ে। কিন্তু প্রয়োজনে সেই পাওনা টাকা ফেরত চাইলে বাংলাদেশে এসে তাকে পড়তে হয় নির্যাতন ও হুমকির মুখে।

আকবর হোসেনের বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাটে। টাকা উদ্ধারের জন্য মামলা করলেও প্রতিনিয়তই সংঘবদ্ধ একটি চক্র আকবর হোসেনকে হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। মামলার পরে পাওনা টাকা তো দেয়নি, উল্টো তার পাসপোর্ট, ভিসা ও থাইল্যান্ডের ওয়ার্ক পারমিট কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্রটি। সেই সঙ্গে তাকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টাও করা হয়েছে। পুলিশের সহায়তায় ইয়াবা মামলা থেকে সেই যাত্রায় রক্ষা পান আকবর হোসেন।

১১ মাস আগে রাজধানীর অদূরে সাভারের বিরুলিয়ায় ঘটে এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী থাইল্যান্ড প্রবাসী আকবর হোসেন সাভার থানায় বাদী হয়ে প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেন। মামলা নম্বর নভেম্বর-৩২। আবার ইয়াবা দিয়ে আকবরকে ফাঁসানোর চেষ্টায় সাভার থানা পুলিশও মাদক আইনে বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করেছিল (মামলা নম্বর ৩৩)। তবে মামলা হওয়ার পর আকবরকে প্রতারক চক্রের সদস্যরা একের পর এক হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে।

কখনো প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তাকে হুমকি দিচ্ছে চক্রটি। আবার কখনও কখনও জিম্মি করা পাসপোর্ট আইডি নাম্বার পরিবর্তন করে তাকে ফাঁসানোর হুমকিও দিচ্ছে তারা।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৮ নভেম্বর পাওনা টাকা আনতে গিয়ে মারধরের শিকার হওয়ায় ভোলার লালমোহনের নূর নবী’র ছেলে তানভীর রায়হান (৩৩), মুন্সীগঞ্জের আব্দুল হাতিম বেপারীর ছেলে একরামুল হক(৫০), চট্টগ্রামের পাচিয়া থানার বানিপুর গ্রামের কাঞ্চন মিয়ার ছেলে সেলিম (৩৮) এবং কুড়িগ্রামের নূর ইসলামের ছেলে আসাদের (২৪) বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্রতারণার মামলা করেন ভুক্তভোগী আকবর হোসেন।

অন্যদিকে পুলিশ বাদী হয়ে দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৮ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে ইয়াবাসহ আসাদ নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। আসাদ পুলিশকে জানায়, আকবর হোসেনকে পাওনা টাকা না দিয়ে উল্টো ইয়াবা দিয়ে তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্য তানভীর রায়হান ও একরামুল হক নামের তার দুজন বস নির্দেশ দিয়েছিলেন তাকে। তাদের নির্দেশে সে স্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করেছিল এবং আকবরকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনায় আটককৃত আসাদকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। আটকের সময় আসাদ বলেছিল তার বসদের নির্দেশে ব্যাগের ভেতর ইয়াবা দিয়ে আকবর হোসেনকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল। যা মামলার এজাহারে উল্লেখ আছে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তাই যেহেতু বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, এ বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

ভুক্তভোগী থাইল্যান্ড প্রবাসী আকবর হোসেন বলেন, ‘যদি মামলা তুলে নিই এবং টাকা পাবো না এমন শর্ত কাগজে লিখে তাদেরকে দিই তাহলে তারা আমার পাসপোর্ট, ভিসা এবং ওয়ার্ক পারমিট এর কাগজপত্র ফিরিয়ে দেবে। আর যদি তা না করি তাহলে তারা আমার পাসপোর্টের আইডি নাম্বার চেঞ্জ করে আমাকে অবৈধভাবে থাইল্যান্ড গিয়েছি বলে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।’ এরই মধ্যে চক্রটি পাসপোর্ট আইডি চেঞ্জ করে ফাঁসানোর চেষ্টাও করেছিল বলে জানান তিনি।
তবে পাসপোর্ট জালিয়াতির বিষয়টি দ্রুত জানতে পেরে থাইল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করায় রক্ষা পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসকে আমার পাসপোর্ট আইডি জালিয়াতির বিষয় অভিযোগ করি। দূতাবাস আমার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে সত্যতা নিশ্চিত হয়ে বিষয়টি লিখিতভাবে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অধিদপ্তর কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল। যে কারণে তারা সফল হতে পারেনি। তারপরও প্রতারক চক্রের সদস্যরা আমাকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।’

জানতে চাইলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সেলিনা বানু (পাসপোর্ট ভিসা ও ইমিগ্রেশন) বলেন, ‘দূতাবাস থেকে লিখিতভাবে চিঠি পাওয়ার পর প্রতারণার উদ্দেশ্যে নতুন পাসপোর্ট এর আবেদন কপিটি বাতিল করা হয়েছিল। তবে প্রতারণাকারী কারা সেটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।’

যেভাবে প্রতারণার শিকার থাইল্যান্ড প্রবাসী আকবর হোসেন
আকবর হোসেনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাটে। ২০০৬ সালে তিনি টেইলার্সের কর্মী (ওয়ার্ক পারমিট) হিসেবে থাইল্যান্ডের পাড়ি জমান। ২০০৯ সাল পর্যন্ত এই পেশায় যুক্ত থাকেন তিনি। এরপর অন্যের দোকানে কাজ ছেড়ে দিয়ে নিজের উপার্জিত অর্থ ও বাড়ির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে সেখানে নিজেই একটা টেইলার্সের দোকান খোলেন।

তার দোকানের পাশেই ছিল জামান রেস্টুরেন্ট নামে বাংলাদেশি একটি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। সেখানে বাংলাদেশ থেকে ঘুরতে যাওয়া দর্শনার্থীরা থাকতেন। আর এই সুযোগেই ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশ থেকে ঘুরতে যাওয়া ইকরামুল হক ও তানভীর নামে দুই ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় আকবর হোসেনের। ওই পরিচয়ের সূত্র ধরে নিজেদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে।

এক পর্যায়ে ওই দুই ব্যক্তি আকবর হোসেনকে প্রস্তাব দেয় তারা সেখানে একটা হোটেল রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করতে চায়। আর তারা জানায় এই ব্যবসায় আরও একজন পার্টনার হলে তাদের জন্য সুবিধা। আর এ জন্য আকবর হোসেনকে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ী অংশীদার হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। আর এতে আকবর হোসেন রাজি হয়। শুরু হয় হোটেল ব্যবসা। ২০১৭ সালের মার্চ থেকে 'ফ্যান্টাসিয়া গেস্ট হাউস ও খাবার হোটেল' নামে তিনজনে মিলে যৌথভাবে একটি ব্যবসা শুরু করে তারা। ব্যবসার শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানের ভাড়া ও মেরামত এবং আসবাবপত্র ক্রয়সহ যাবতীয় খরচের জন্য আকবর হোসেনের কাছ থেকে টাকা নিত তারা। এভাবে আকবর হোসেন তাদের ৪৫ লাখ টাকা দেন। এই পাওনা টাকা নিতে গিয়েই ঘটে বিপত্তি।

ভুক্তভোগী আকবর হোসেন বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে যখনই পাওনা টাকা চাইতাম। তখনই নানা বাহানা করত। বলত ১০ দিন পর, ১৫ দিন পর আবার কখনও কখনও বলতো এক মাস পর দিব। এভাবে কেটে যায় প্রায় দশ মাস। কিন্তু তারা আমার টাকাগুলো মেরে দিয়ে বাংলাদেশে চলে যায়। যে কারণে তাদের ইমো এবং হোয়াটসঅ্যাপে টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইতাম। এভাবে প্রতিনিয়ত জোরাজুরি করার এক পর্যায়ে তারা আমাকে নভেম্বরের ৮ তারিখে বাংলাদেশ প্রমাণপত্রসহ টাকা নিয়ে যেতে বলে।’

‘আমিও ৭ নভেম্বর স্বাভাবিকভাবে পাওনা টাকার সকল কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ যাই। সেখানে এয়ারপোর্ট থেকে তাদের লোকজন আমাকে উত্তরার একটি হোটেলে রাখে রাতের বেলা। পরের দিন সকালে একটি মাইক্রো করে টাকা দেওয়ার কথা বলে সাভারের আকরাইন এলাকার সোনো হোয়াইট কটন লিমিটেড নামে একটি গার্মেন্টস কারখানার চারতলায় নিয়ে যায়। গার্মেন্টসটি টাকা আত্মসাতকারী একরামুল হকের।

সেখানে গিয়ে দেখতে পাই, একরামুল হক তার প্রতিষ্ঠানের সিইও তানভীর এবং সেলিমসহ বেশ কয়েকজন লোক বসে আছে। কুশল বিনিময় শেষে তারা আমার কাছ থেকে টাকার কাগজপত্র চেয়েছিল। আমিও কাগজপত্র বের করে টাকার হিসাব দিচ্ছিলাম। এ সময় তারা অকথ্য ভাষায় আমাকে গালিগালাজ শুরু করে এবং আমার সঙ্গে থাকা কাগজপত্র সহ আমার পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট জব্দ করে। এসময় সেখানে থাকা তার লোকজন আমাকে মারধর করে। পরে রাত দশটার দিকে গার্মেন্টস এর কর্মী আসাদকে দিয়ে আমাকে নিচে পাঠিয়ে দেয়।

এ সময় কর্মী আসাদ আমাকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল। যদিও পুলিশ তাদের দেওয়া খবরে ঘটনাস্থলে এসে তাদেরকেই ইয়াবাসহ ধরেছিল। পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনার বিস্তারিত জেনে তারা একটি মামলা করেন এবং আমিও একটি মামলা করি।'

আকবর অভিযোগ করে বলেন, ‘মামলার দেওয়ার পর থেকে তারা আমাকে পাসপোর্ট জালিয়াতির মাধ্যমে থাইল্যান্ডে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। আমি বিষয়টি লিখিতভাবে দূতাবাসকে জানালে দূতাবাস প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু এখনও তারা থেমে নেই। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। এখনও নতুন পাসপোর্ট জালিয়াতির হুমকি দিচ্ছে।’

প্রতারণা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে একরামুল হক বলেন, ‘সে ছিল আমাদের কর্মচারী। কখনোই ব্যবসায়ীক পার্টনার ছিল না। সে কিসের টাকা পাবে? উল্টো আমরা ৮২ লাখ থাই বাত (থাইল্যান্ডের মুদ্রা) পাই তার কাছ থেকে। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। আপনি প্রয়োজনে আমার সিইও তানভীরকে ফোন দিন’ এই বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তবে একরামুলের সঙ্গে কথা বলার ৫ ঘণ্টা পর তার প্রতিষ্ঠানের সিইও তানভীর রায়হান নিজেই থাইল্যান্ড থেকে এ প্রতিবেদককে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আকবর হোসেন আমাদের কাছ থেকে কোনো টাকা পাবেন না। আমাদের সাভারে কোনো গার্মেন্টসও নেই। তার সঙ্গে সাভার আমাদের কোন দেখাও হয়নি।

এগুলো সব নাটক। বরঞ্চ আমরা তার কাছ থেকে টাকা পাই। সে আমাদের হোটেলে কর্মচারী হিসেবে কাজ করার সময় ৮২ লাখ থাই বাথ চুরি করেছিল। এর সমস্ত ডকুমেন্ট আমাদের কাছে আছে। আমরা তার বিরুদ্ধে থাইল্যান্ড এ তিনটি মামলা দিয়েছি। দূতাবাসকে অবহিত করেছি। তবে এসব মামলার প্রমাণাদি চাইলে তিনি পাঠাতে রাজি হননি।’

প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে তাকে হুমকি দিচ্ছেন। আপনি কি প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রী আমার অবশ্যই আত্মীয়। সে হিসেবে প্রধানমন্ত্রী আমার আত্মীয় এ পরিচয় দিতেই পারি, তাতে তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা। এই বলে তিনি ফোন কল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।’

তবে ভুক্তভোগী আকবর হোসেনের অভিযোগ, একরামুল হক ও তানভীর রায়হান দুইজন ব্যক্তির প্রভাব খাটিয়ে থাইল্যান্ডে প্রতারণা করছে। ওই দুজন ব্যক্তির মধ্যে ফাহিম হোসেন নামে একজন প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এপিএস এবং মো. লিয়াকত নামের আরেক ব্যক্তি চট্টগ্রামে র‌্যাবের মেজর বলে তারা আকবর হোসেনের সঙ্গে প্রভাব কাটায়। বিনিময় ফাহিম এবং লিয়াকতকে তারা বিনা খরচে মাঝে মাঝে থাইল্যান্ড ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়। তবে ফাহিম এবং লিয়াকতের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী আকবর হোসেনের অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে থাইল্যান্ড দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম কল্যাণ) এ কে এম মনিরুজ্জামানের মন্তব্য জানতে চাইলে, তিনি অভিযোগের বিষয়টি শুনে কোনো মন্তব্য না করেই মোবাইল ফোনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার তাকে কল করা ও এসএমএস পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এসএ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত