শিরোনাম

তার জন্য ‍পাগল ছিল বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীরা

আমার সংবাদ ডেস্ক   |  ০৯:০১, জুলাই ০৫, ২০১৯

নাম ছিল তার মাতা হারি। একজন ওলন্দাজ নর্তকী। জার্মানির গুপ্তচর হিসেবে মাতা হারি কাজ করেছেন। যদিও তার প্রকৃত নাম নাম মার্গারেট জেল। জন্ম নেদারল্যান্ডে, ১৮৭৬ সালে। যুদ্ধের সময় বিপইত্ত বেঁধে যায় জার্মান সামরিক কর্মকর্তা আরনল্ড ভন কাল্লের পাঠানো একটি টেলিগ্রামে। কারণ, ওই টেলিগ্রাম ফরাসি গোয়েন্দারা ধরে ফেলে।

তার রূপের ঝলকে যে কউ কাত হয়ে পড়তেন। আর তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, জেনারেল ও শিল্পপতিরা উন্মুখ হয়ে থাকতেন। একশ বছর আগেই গুলি করে হত্যা করা হয় মাতা হারির নামে ইউরোপের ওই নারীকে। আর এ নারীই ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত গুপ্তচর।

মাতা হারি জেলে নেদারল্যান্ডসের ফ্রায়সল্যান্ড প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম এডাম জেলে। মাতার নাম এন্টজে ভ্যান ডার মুলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর পিতা এডামের একটি টুপির দোকান ছিল।

পরবর্তীতে তিনি তেল শিল্পে বিশাল অংকের টাকা বিনিয়োগ করে যথেষ্ট সম্পদশালী হন। প্রচুর অর্থবিত্ত থাকায় মাতা হারি তার শৈশবে বেশ বিলাসী জীবনযাপন করেন। ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি খুব ব্যয়বহুল স্কুলে লেখাপড়া করেন।

এর কিছুদিন পরেই ১৮৮৯ সালে মার্গারিটার পিতা দেউলিয়া হয়ে যান, তার পিতামাতার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং ১৮৯১ সালে তার মাতা মারা যান। ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩ সালে তার বাবা সুসান্না ক্যাথারিনাকে বিয়ে করেন। তবে তাদের কোন সন্তান ছিল না।

এরপর মার্গারিটা তার পিতামহের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন। একইসঙ্গে একজন শিশু শিক্ষিকা হাবর জন্য পড়াশুনা শুরু করেন। উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ায় তার পিতামহ তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করে নেন। কিছুদিন পর সেখান থেকে পালিয়ে তিনি হেগ শহরে তার চাচার বাড়িতে চলে যান।

মার্গারিটার যখন ১৮ বছর বয়স, তখন ডাচ সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে একজন সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রুডলফ ম্যাকলেওডকে বিয়ে করেন।

বিয়ের পর ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ উপনিবেশে (বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া) বসবাস শুরু করেন। ১১ জুলাই ১৮৯৫ সালে আমাস্টারডামে তাদের বিয়ে হয়। ক্যাপ্টেন রুডলফকে বিয়ে করার সুবাদে তিনি তৎকালীন ডাচ সমাজের অভিজাত শ্রেণিতে প্রবেশ করার সুযোগ পান।

বিয়ের পর তারা পূর্ব জাভা দ্বীপের মালাঙে চলে যান। সেখানে তাদের দুই সন্তান, নরম্যান-জন ম্যাকলিওড (৩০ জানুয়ারি ১৮৯৭) এবং লুই জেনে ম্যাকলিওড (২ মে ১৮৯৮) জন্ম নেয়।

১৯০৩ সালে জেলে প্যারিসে আসেন, সেখানে একটি সার্কাসে তিনি লেডি ম্যাকলিওড নামে ঘোড়শওয়ার হিসেবে কাজ করেন।

১৯০৫ সালের মধ্যে তিনি বিদেশী নর্তকী হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। যৌনতা ও শরীর প্রদর্শনের মাধ্যমে মাতা হারি খুব দ্রুত দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

তিনি নিজেকে জাভার এক রাজকুমারী হিসাবে জাহির করতেন। নাচের মঞ্চে তার সাহসী খোলামেলা উপস্থাপনা ছিল দর্শক আকর্ষণ করার হাতিয়ার। মাতা হারির নৃত্য উপস্থাপনার সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় অংশটি ছিল নৃত্যরত অবস্থায় ক্রমে শরীরের সমস্ত বস্ত্র বিসর্জন দেয়া।

নাচের শেষে শুধুমাত্র একটি বক্ষবন্ধনি এবং হাতে ও মাথায় কিছু অলংকার অবশিষ্ট থাকত। বক্ষবন্ধনি ছাড়া তাকে খুব কমই দেখা যেত কারণ তিনি তার সংক্ষিপ্ত স্তনযুগল নিয়ে খুব সচেতন ছিলেন।

১৯১০ সালের মধ্যে অসংখ্য নৃত্যশিল্পী মাতা হারিকে অনুকরণ করা শুরু করে। সমালোচকরা বলতেন তার এই সাফল্য শুধুমাত্র দেহ প্রদর্শনের মাধ্যমে এসেছে। কোনরকম শৈল্পিকতার উপস্থিতি সেখানে নেই।

যদিও মাতা হারি সমগ্র ইউরোপ জুড়েই অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন তথাপি, কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন মাতা হারি প্রকৃত অর্থে নৃত্যে পারদর্শী ছিলেন না বলে মনে করত এবং তার সাথে কোন অনুষ্ঠান আয়োজন করতে উৎসাহী ছিল না। ১৯১২ সালের পর মাতা হারির ক্যারিয়ারের ভাঙন শুরু হয়।

১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১৭, মাতা হারিকে ইলিসি প্লাস নামে একটি হোটেল কক্ষ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৪ জুলাই গুপ্তচর বৃত্তির দায়ে তার বিচার শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল গোপন সংবাদ পাচারের মাধ্যমে ৫০,০০০ ফরাসি সৈন্যকে হত্যার ঘটনায় জার্মানিকে সহায়তা করা।

ধারনা করা হয় তার হোটেল কক্ষে অদৃশ্য কালি পাওয়া গিয়েছিল যা পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে সাহায্য করে। মাতা হারি দাবি করেছিলেন যে এই কালি ছিল তার মেক আপের সামগ্রী।

১৫ অক্টোবর ১৯১৭ সালে, ৪১ বছর বয়সে গুলি করে তার মৃত্যুদন্ড কার্য়কর করা হয়। ফায়ারিং স্কোয়াডে মাতা হারিকে বেঁধে রাখা হয়নি। এমনকি তিনি চোখ বাঁধতেও রাজি হননি। মৃত্যুর আগে তিনি ফায়ারিং স্কোয়াডের সৈন্যদের দিকে উড়ন্ত চুম্বন ‍ছুঁড়ে দেন। মাতা হারি নামে অর্থ “ভোরের চোখ”, এক ভোরেই তার মৃত্যু হয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর কেউ তার মরদেহ নিতে আসেনি। কাজেই মরদেহ দিয়ে দেয়া হয় প্যারিসের মেডিকেল স্কুলে। যেন ছাত্রদের কাটাছেঁড়ার প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা যায় হারির মরদেহ। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্যের একটি ছবিও আছে।

তবে অনেকেই বিশ্বাস করেন না যে, এ ছবি সে সময়ের। ইউরোপের রাজধানীগুলো বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ছিল মাতা হারির জন্য পাগল। মন্ত্রী থেকে শুরু করে শিল্পপতি, সেনাধ্যক্ষরা ছিলেন তার জন্য পাগল।

এমএআই

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত