শিরোনাম

একজোড়া ক্রাচ বদলে দিতে পারে আনিসের জীবন

তাড়াইল(কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি  |  ১৬:৫৯, আগস্ট ২৭, ২০১৯

দুহাতে দুটি বাঁশের লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে চলে আনিস। পা দুটো এদিক ওদিক বাঁকানো। সহপাঠীরা এগিয়ে যায় বহুদূর। পেছনে নিজের গতিতে হেঁটে চলে আনিস। গন্তব্য সরকারি মুক্তিযোদ্ধা কলেজ।

কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের ৩ নং ধলা ইউনিয়নের সেকান্দরনগর গ্রামের চরপাড়ায় আনিসের বাড়ি।

দশ বছর আগে গত হয়েছেন আনিসের দিনমজুর বাবা গোলাপ আলী। মা ঝর্না আক্তার বাড়ি বাড়ি ঘুরে করেন ঝিয়ের কাজ। বড় দুবোনের মধ্যে একজনকে বাবা নিজেই বিয়ে দিয়েছেন। বাবা মারা যাওয়ার পর এলাকাবাসীর সাহায্য সহযোগিতায় আরেক বোনের বিয়ে দেন মা ঝর্না আক্তার। স্বামী সংসার নিয়ে কোনো রকম দিন কাটে দুবোনের।

আনিসের হাতেখঁড়ি বাড়ির পাশেই সেকান্দরনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর টাকার অভাবে লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন মা ঝর্না আক্তার। কিন্তু আনিসের অদম্য ইচ্ছার কারণে দমাতে পারেনি তাকে।

বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে তাড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী আনিস দু'হাতে তুলে নেয় বাঁশের দুটি লাঠি। বাড়ি থেকে রিকশা বা অটোতে বিদ্যালয়ে যাওয়া আনিসের কাছে বিলাসিতা। সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে হেঁটে হেঁটে বিদ্যালয়ে আসা। ছুটির পর একইভাবে বাড়ি ফেরা। এটাই তার নিত্য দিনের সঙ্গি ছিল।

টিফিনের সময় মাঝে মধ্যে পাঁচ টাকার ঝালমুড়ি অথবা বেশির ভাগই বিদ্যালয়ের টিউবওয়ের পানিই তার দুপুরের খাবার ছিল। সরকারি বই পেলেও খাতা কলম কেনার পয়সা জুটতো না কখনই। সহপাঠীদের দেয়া খাতা কলমেই ভরসা ছিলো আনিসের।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ আনিসের পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ দেখে ফ্রিতে কোচিং করায়। এ বছর ২০১৯ সালে এসএসসিতে বাণিজ্য শাখা থেকে জিপিএ ৩.১৭ পেয়ে পাশ করে আনিস। ভর্তি হয় উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সরকারি কলেজে এইচএসসিতে বাণিজ্য শাখায়। এবার বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব ৩ কিলোমিটার।

প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) কলেজ থেকে হেঁটে হেঁটে ফিরছিলেন আনিস। সাথে মা ঝর্না আক্তার। রাস্তায় কথা হলে ঝর্না আক্তার জানান, ছেলের সাথে প্রায়ই কলেজে আসেন তিনি। একা একা ছাড়তে ভয় করে। বইখাতা কিনে দিতে পারবো না বলে লেখাপড়া বাদ দিতে বলেছিলাম। কিন্তু ছেলে কিছুতেই রাজি হয় না।

ভবিষ্যতে একজন নীতিবান শিক্ষক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আনিস জানায়, কলেজের শিক্ষকরা আমাকে খুব স্নেহ করেন। টাকার জন্য বই কিনতে না পারলেও এরই মধ্যে কলেজের মোতাহার স্যার একটি মার্কেটিং বই এবং ম্যাডাম কাবেরি পাল চৌধুরী একটি অর্থনীতির বই দিয়েছেন। বাকি বইগুলি কবে কিভাবে কিনে দেবেন তা ভেবে দুশ্চিন্তায় ভেঙ্গে পড়েন মা ঝর্না আক্তার।

নিজের জমি ছিল না আনিসের বাবা গোলাপ আলীর। আনিস তাঁর মাকে নিয়ে থাকে চাচার বাড়ির একটি ছোট্ট ঘরে। মা ঝর্না আক্তার বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাজ করে দু'জনের অন্ন জোগান।

এ মুহুর্তে তোমার কি প্রয়োজন প্রশ্ন করলে আনিস জানায়, একজোড়া ক্রাচ হলে চলাফেরায় স্বচ্ছন্দবোধ করতাম আর বাকি বই খাতা হলে আমার আর কিছু চাই না।

এভাবে হেঁটে হেঁটে কলেজে যাও তোমার কষ্ট হয় না? জানতে চাইলে আনিস জানায়- কষ্ট হয় ঠিকই কিন্তু পড়াশুনাত করতে পারছি এটা ভালো লাগে।

অবসর সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে আনিস জানায়, বিকালে মাঠে সহপাঠীদের খেলা দেখি। আমি তো খেলতে পারি না। তাতে আমার খুব কষ্ট হয়।

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত