শিরোনাম

ত্রিশালের আতিকের বড় হওয়ার স্বপ্ন!

প্রিন্ট সংস্করণ॥ মামুনুর রশিদ, ত্রিশাল   |  ০১:২৯, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৯

মাত্র দুই ফুট সাত ইঞ্চি। এই ছোট্ট মানুষটি পুরো ত্রিশালে তার উচ্চতার জন্য পরিচিত। আর ভালো আচরণের কারণে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার কাছে প্রিয়।

জন্ম তার ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামে। বাবা স্কুলশিক্ষক, মা গৃহিণী। বাবার নাম আবদুল খালেক, মা মমতাজ বেগম। তাদের ১০ ছেলেমেয়ের মধ্যে আতিক অষ্টম। দুটি যমজ সন্তানের একজন।

অন্য ভাইটি এবং বাকি সব ভাইবোন স্বাভাবিক মানুষের আকার, আয়তন পেলেও তিনিই কেবল আলাদা। জন্ম গতভাবেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি ঠিকভাবে বাড়ছে না বলে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান সবাই। আতিক তো হাতে-পায়ে শক্তি পাচ্ছে না! ফলে তাকে নিয়ে শুরু হলো জীবনযুদ্ধ।

প্রথমে নিয়ে যাওয়া হলো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা নানাভাবে পরীক্ষা করেন। এরপর ডাক্তাররা জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধিতায় ভুগছে শিশুটি। পুরো পরিবার হতাশায় ভেঙে পড়ে। আতিককে দিয়ে তো আর কিছুই হবে না। সারা জীবন তাকে পেলে-পুষে রাখতে হবে। সে না পারবে কোনো কাজ করতে, না পাবে একজন স্বাভাবিক মানুষের জীবন!

তবে আতিক এসব চিন্তা-দুশ্চিন্তার একেবারে বাইরে ছিলো। কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। তার মেধার পরিচয়ও পেলেন স্কুলশিক্ষক বাবা। পরে নিজের স্কুলে ভর্তি করে নিলেন। কাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাবার কোলে
ত্রিশালে আতিকের চড়ে লেখাপড়া করতে যেত সে। সারা দিন ক্লাস করত, পরে বাবার সঙ্গেই তার কোলে চড়ে ফিরে আসত।

একে তো সহকর্মীর সন্তান, তার ওপর লেখাপড়ায় খুব আগ্রহী। ফলে শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র হতে আতিকের সময় লাগলো না। তবে লোকের এই উদ্যম ও প্রচেষ্টা ভালো লাগেনি।

তারা এলাকার আড্ডায় এমনকি বাড়িতে এসে, পথে-ঘাটে দেখা হলে আবদুল খালেক মাস্টারকে উপদেশ দিত, প্রতিবন্ধী ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে কী করবেন? ও তো কোনো কাজ করতে পারবে না। তার চেয়ে বরং অন্য কিছুতে লাগিয়ে দিন, তাহলে অন্তত ওর জীবনটা বাঁচবে।

লেখাপড়া করেই তো মানুষ তার ভাগ্য বদল করতে পারে, হাজারো ছাত্রের বেলায় দেখেছেন তার বাবা। আর আতিকেরও পড়ালেখায় খুব আগ্রহ। তাই সব সময় অনুপ্রেরণা, ভালোবাসা ও সহযোগিতা দেখিয়ে গেছেন তিনি। তাই পড়ালেখায় বরাবরই ভালো করেছে আতিক। তারপরও চেনা পৃথিবীটা বদলাল না।

ফলে কোনো আত্মীয় বাড়িতেও যেতে ভালো লাগত না তার। কারণ সবাই যে গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকত। নানা কিছু জিজ্ঞাসা করত। ধীরে ধীরে লেখাপড়ায় মা-বাবার উৎসাহে ভালো করতে লাগলেন তিনি।

২০০৮ সালে স্থানীয় কাটাখালী ওমর আলী হাইস্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৪.৫০ জিপিএ নিয়ে এসএসসি পাস করলেন। দুই বছর পর ময়মনসিংহ আনন্দমোহন সরকারি কলেজ থেকে ৪ জিপিএ নিয়ে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি পাস করেন।

অন্য সব এইচএসসির ছাত্রছাত্রীর মতো তারও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খুব ইচ্ছা। প্রথমে একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলেন। তাতে কাজ হচ্ছে না দেখে বাড়িতে বসে নিজে নোট করে পড়তে লাগলেন। ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তুতি নিয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন।

২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘গ’ ইউনিটের মেধাতালিকায় ৩৬তম হলেন। ভর্তি হলেন বাণিজ্য অনুষদের অন্যতম সেরা বিভাগ ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে।

এলাকার গরিব ও সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়া, তাদের মানবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করা, নীতিনৈতিকতা শেখানোর জন্য নিজের এলাকায় তার উদ্যোগে ২০১৫ সালের নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাটাখালী আলোর শিখা প্রি-ক্যাডেট স্কুল। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণির এই স্কুলে এখন প্রায় দেড়শ ছাত্রছাত্রী পড়ে।

টাকার অভাবে যারা স্কুলে ভর্তি হতে পারে না, সেই ছেলেমেয়েরা তার স্কুলে বিনা বেতনে পড়তে পারে। এখন ২০ থেকে ২৫ জন ছাত্রছাত্রী বিনা বেতনে পড়ে, বাকিরা খুবই অল্প টাকায় শিক্ষার সুযোগ লাভ করে।

ইতোমধ্য আতিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে পরীক্ষায় পাস করেছেন। তিনি অপেক্ষা করেছেন মৌখিক পরীক্ষার জন্য। অন্যদিকে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন বিসিএসের জন্য।

এমআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত