শিরোনাম

আগুনের গালিচা

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী  |  ১৮:৫৬, জুন ০৬, ২০১৯

রথের দুই পাশে দুই হস্তি আর সামনে পেছনে শ'তেক সৈন্যসামন্ত নিয়ে রাজা তারাশঙ্কর বেরুলেন হরিণ শীকারে। দিন ভর এ বন ও বন চষে তপোবনে এসে থামলেন। কিন্তু কোথাও কোনো শীকারের দেখা পেলেন না।

রাজাকে মনোক্ষুণ্ণ দেখে মিত্র মাধব্য রাজার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, মহারাজ! হরিণীর দেখাই যখন পেলেন না, তখন আর শকুন্তলার আশায় সন্ধ্যা করে লাভ কী? তারচে বরং চলুন মহলেই ফিরে যাই। আহা! কতদিন ধোঁয়া ওঠা সালুনে গরম গরম লুচি ডুবিয়ে খাওয়া হয় না।

তোমার এই পেটুকপনা আর গেল না মাধব্য। খাওয়া ছাড়া কি আর কিছুই বোঝ না?

রাজা তারাশঙ্কর মাধব্যকে কথা ক'টি বলে যেই সামনে তাকালেন, ওমনি ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো এক মনোলোভা হরিণী। বেরিয়েই দিল ছুট। রাজাও তার তীর বাগিয়ে ছুটতে থাকলেন হরিণীর পেছনে পেছনে। পাহাড়পর্বত, জলাজঙ্গল পেড়িয়ে ছুটছেন তো ছুটছেনই। কিন্তু হরিণীকে আর বাগে আনতে পারছেন না। হঠাৎ পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে রাজার রথ গেল উল্টে। 'মাধব্য' বলে ককিয়ে উঠলেন রাজা।

কী হয়েছে তারাশঙ্কর?

মিত্র মাধব্য, কোমরের হাড় বোধহয় টুটে গেল।

মাধব্য! কে মাধব্য?

মিত্রবর! আমার এ দুঃসময়েও তুমি মজা লুটছ? এ যে বড়ই অধর্ম।

ও বুঝেছি। আবার সেই রাজা দুষ্মন্তের স্বপ্ন দেখেছিস। অকর্ম কোথাকার! তা এই নিয়ে কবার হলো ক দিকিনি?

তারাশঙ্কর তরিৎ চোখ মেলে তাকায়। কিন্তু একি! কোথায় তপোবন আর কোথায় সোনার রথ? এ যে তার বাবা রঘুনাথের খুঁপড়ি। তবে কি সে যা দেখেছে তা কেবলই ব্যার্থ স্বপ্নের পুনরাবৃত্তি?

তারাশঙ্কর ঝিম মেরে বসে থাকে। পাশ থেকে বাবা রঘুনাথ বলেন, ঠাকুর মশাইয়ের কথাটা যদি শুনতি তাহলে মাঙ্গলিক দোষটাও কেটে যেত আর ক্ষত্রিয় কোলের মানও রক্ষা হত। স্বপ্নের পেছনও আর দৌড়ানো লাগতো না।

তাই বলে গরুর সাথে বিয়ে?

এমন করে বলছিস, যেন তুই-ই এই প্রথম। আরে এটা তো শীবেরই কলম।

তুই আর না করিস না তারাশঙ্কর। আসছে শনিবারেই পুরোহিত মশাইকে আসতে বলি। গোপালের কালো গাইটা তো আগে থেকেই ঠিক করা আছে। তুই শুধু মুখ বুজে মালাটা পরিয়ে দিবি। সাত পাক শেষ হলেই ভগবানের কৃপায় মাঙ্গলিক দোষ কেটে যাবে।

আপনার যা ইচ্ছে তাই করুন। আমি চললাম।

তারাশঙ্কর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়।

এই ত্রী প্রহরে কোথায় যাচ্ছিস?

নরকে।

রাম রাম। এমন কথা মুখে আনাও পাপ।

দুই. না, এটা তো কাঞ্চি পিসির গলা নয়। তাহলে কার? কে এমন সুরের আবেশে মনঃপ্রাণ মোহিত করে দিচ্ছে? তবে কি সৌরজা? সৌরজার নাম নিতেই এক মুঠো শীতলতা ছুঁয়ে যায় তারাশঙ্করের হৃদমন্দিরে। মায়া ভরা এক মুখচ্ছবি ভেসে উঠে চোখের তারায়। আহা! এ যেন ঠিক জলে ফোটা পদ্ম।

ভাগ্যগুণেই তারাশঙ্কর আজ এই পদ্মের মালিক। অথচ অনিন্দ্য ব্রাহ্মণ বলেছিল তারাশঙ্করের ভাগ্যরেখায় কোনো সুলক্ষণ নেই। আর রঘুনাথও তাই ভেবে নিয়েছিলেন। সে জন্যই তো মাঙ্গলিক দোষ কাটাতে সেদিন গরুর সাথে তারাশঙ্করের বিয়ের অয়োজন করেছিলেন।

কিন্তু ভাগ্যগুণে বেঁচে যায় তারাশঙ্কর। গরুর গলায় আর তাকে মালা পরাতে হয়নি সেদিন। তার আগের রাতেই গরু স্বর্গে পাড়ি জমায়। এতে তারাশঙ্কর তো বাঁচলো। কিন্তু ক্ষত্রিয় কোলে যে কলঙ্ক লাগল, রঘুনাথ বাবু তা মুছবেন কী দিয়ে? তাছাড়া পুরোহিত মশাইও যে বললেন, 'একে তো মাঙ্গলিক দোষ, তার পরে লগ্নভ্রষ্ট। না না না। তারাশঙ্করের সর্বনাশের আর বুঝি বাকি রইল না।'

আতঙ্কিত রঘুনাথ বাবু পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করেন, কোনো উপায়ই কি নেই?

পুরোহিত জানালেন, 'উপায় অবশ্য একটা আছে। তিন প্রহরের মধ্যে যদি কোনো ষোলো বছরের বালিকার সাতে মালাবদল করানো যায়, তবে হয়তোবা শীবের কৃপায় শেষ রক্ষা হতে পারে। পুরোহিতের কথা শুনে রঘুনাথ বাবু তৎক্ষণাৎ পত্র পাঠালেন সুতানুটি গ্রামে। পত্রে রঘুনাথ বাবুর বিপদের কথা জানতে পের বাল্যবন্ধু হরিদাস তার একমাত্র মেয়ে সৌরজাকে নিয়ে রওয়ানা দেন গোবিন্দপুরে।

সৌরজাকে বধূ সাজানো শেষ না হতেই পুরোহিত মশাই তাড়া দেন, 'কই, কনেকে নিয়ে আসুন। লগ্ন যে বয়ে গেল।'

দু'জন লোক আসনে উপবিষ্ট সৌরজাকে নিয়ে আসেন। পুরোহিত বর কনেকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দু'জন দু'জনের দিকে শুভদৃষ্টি দাও। তারা শঙ্কর সৌরজার চোখে চোখ রাখতে গিয়ে দেখে, সৌরজা তার দুই হাতে ধরা পান পাতায় মুখ ঢেকে আছে। মৃদু মলয়ে তখন সৌরজার উন্মুক্ত দীঘল কালো কেশ কোমর ছাড়িয়ে উড়ছে। সৌরজা একটু একটু করে দু'হাত সরায়, আর একটু একটু করে উন্মোচিত হতে থাকে মেঘে ঢাকা ফাল্গুনী চাঁদ। তন্মিত তারা শঙ্করের দ্বিধা হয়, এ কি মর্তের কোনো নারী? নাকি স্বর্গের কোনো দেবী?

তারা শঙ্কর ধূতি ঠিক করে রুম থেকে বেরোয়। তার পর সোজা পুজোর ঘরে গিয়ে ঢুকে। ততোক্ষণে সৌরজার গীতা পাঠ শেষ। সৌরজা গীতায় গিলাফ লাগিয়ে রাধাকৃষ্ণের বেদীতে ভক্তি দেয়। ভক্তি শেষে বর প্রার্থনা করে, প্রভু! তোমার কৃপায় নাথকে জড়িয়ে রেখ।

কোনো অমঙ্গল যেন ওনাকে ছুঁতে না পারে। রক্ষে কর প্রভু। রক্ষে কর। তারপর থালা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ধাক্কা লাগে তারাশঙ্করের বুকের সাথে। লজ্জায় লাল হয়ে উঠে তার দাগহীন গাল। তারাশঙ্কর অালগোছে সৌরজার থুতনিতে হাত রেখে বলে, এবার তবে এই পূজারী অর্ঘ্য গ্রহণ করো দেবী। এই বলেই তারাশঙ্কর সৌরজার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ায়। আনকোড়া শিহরণে কাঁপ উঠে সৌরজার রক্তকণিকায়।

তিন. চৈত্রের শেষ দু'দিনের টানা বর্ষণে পাটের চারাগুলো গাঢ় সবুজ হয়ে উঠে। মৃদু মলয়ে লকলকে কচি পাতারা হরিদাসের কপোল ছুঁয়ে যায়। হরিদাসের প্রথম বাবা হওয়ার মতো সুখানুভূতি হয়। সেই সুখানুভূতিতেই গলায় সুর উঠে-

'অভয়া দয়া কর আমারে গো।

বিপাকে ডাকি তোমারে গো।। দানবদমনি শমনশমনি

ভবানী ভবংসারে গো

সঙ্কট তারিণি লজজা নিবারণি

তোমা বিনা কব কারে গো।।

নমস্কার কর্তা।

নিতাই চণ্ডালের নমস্কার শুনে হরিদাস গোজে রাখা মাথা সোজা করে তাকান।

আরে নিতাই যে! তা কোত্থেকে এলে?

আর কোত্থেকে! চিতা সাজিয়ে এলুম গো কর্তা।

বড় পূণ্যের কাজ করলি।

পূণ্য না ছাই। কন দেখিনি কর্তা, ভগবানের এইডে ক্যামুন বিচার?

 ক্যানরে? কী হয়েছে?

কি আর হবি কর্তা। জন্মাইছিই তো ভগবানের অভিশাপ লয়ে। নইলে কি আর শূদ্র হইতাম! শালা কুকুর শৃগাল হয়েই যদি বাঁচবো, তাইলে পরে মানুষের ঘরেজ জন্মাইলাম ক্যান? এর চেয়ে কুকুর শৃগাল হয়ে জন্মিলেই তো বেশ হইতো।

নিতাই চণ্ডালের জন্ম সুতানুটি গ্রামে হলেও গ্রামের ভেতর তার ঠাই হয়নি। জাতে শূদ্র আর পেশায় চাড়াল হওয়ার অপরাধে নিতাইয়ের বনবাস গ্রামের শেষ সীমানায়। হুগলির তীরে। খুব একটা প্রয়োজন না হলে নিতাই গাঁয়ের পথ মাড়ায় না। নিতাই চণ্ডালের আক্ষেপে চল্লিশ বছর বয়সী হরিদাস একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন,

হ রে নিতাই, শূদ্ররা তো আর মানুষ না। নয়লে পরে শূদ্রদের ছায়া মাড়াইতেও ব্রাহ্মণদের এত্ত ঘেন্না ক্যান?

একমাত্র আপনাকেই ব্যতিক্রম দেখলুম কর্তা। জাতে বৈশ্য হয়েও আপনি আমার মতো চাড়াল পো'র লগে মন খুলে কথা কন। মেলামেশা করেন। মাঝি মধ্যে মনে হয় আপনি মানুষ নন কর্তা।

তাহলে কি অসুর?

রাম রাম। অসুর হতি যাবেন ক্যান?আপনি তো অবতার।

এ কি অধর্মের বকা বকছিস রে নিতাই। বৈশ্যকে অবতার বানিয়ে দিলি?ঠাকুর শুনলে যে আস্ত রাখবে না তোকে।

সত্য কওয়া যদি অধর্ম হয় তাইলে ধর্ম কি মিথ্যার মায়াজাল?

বেশ কথা শিখেছিস রে নিতাই। তা সবার লগে আবার এসব কয়ে বেড়াস না।

সবাই কি আর চাড়ালের লগে কথা কয় গো কর্তা। এই রে ম্যালা বেলা হয়ে গেল।এক্ষুণি একবার নগেন বাবুর বাড়িত যাওয়া লাগবি।

হঠাৎ নগেন বাবুর বাড়িত ক্যান রে নিতাই? বৌঠান বুঝি তোরে ম্যালা খাতির করেন?

কর্তা বাবুর রসিকতা আর গেল না। বৌঠান কি আর সেই অবস্থায় আছেন?

ক্যান? কী হয়েছে?

শুইনলাম নগেন বাবু যায় যায় অবস্থা। নগেন বাবু মারা গেলি বৌঠানের কি উপায় হবি ভাবি দেখিছেন?

কি আর হবে! স্বামীর সাথে সতী হয়ে স্বর্গে যাবেন।

সতী হবেন কথাডা যত সহজে বললেন, সতী হওয়াডা কি অতই সহজ গো কর্তা! আইচ্ছা কর্তা জ্বলন্ত চিতায় সতীদের চিৎকার শুনিছেন? অবশ্য না শোনারই কথা। সতীদের চিৎকার তো ঢাকা পড়ি যায় উল্লাসী ঢাকের বাদ্য বাজনায়। তয় আমি শুনিছি। শুধুইকি শুনিছি? চোখের সামনেই তো জ্যান্ত মেয়েমানুষকে ছাই হয়তে দেখিছি। এই ধরো বিমলা মাসি, আশালতা দেবী, মালঞ্চা দিদি। এই কয়দিন আগেই তো যশোদারে..

নিতাই চণ্ডাল সামনে আগাতে পারে না। একটা ভারি কষ্ট তার গলা চেপে ধরে। চোখ ভরা জল ছলছল করে। একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, আহা! দেবীর লাহান মুখ ছিল যশোদার। কন দেহি কী পাপ ছিল তার? কলি থিকি ফোটার আগেই গনেশ কাকা মেয়েডারে বিয়া দিলেন। দিলেন তো দিলেন, এমন এক মানুষের লগে দিলেন, যার দুই ঠ্যাঙই চিতাই ঢুইকে আছিল।

আসলে হয়েছিল কি, গরীব ব্রাহ্মণ বলে যশোদার তেমন ভালো সম্বন্ধ আসতো না। এদিক যশোদার বয়সও চৌদ্দ পাড়িয়ে গিয়েছিল। তাই কাকা বাবু ওমন ঘাটের মরার লগেই যশোদার মালা বদল করিয়ে দিলেন। তার পর বিয়ের দুইমাস না যেতেই অঘটনটা ঘটল। যশোদার সোয়ামি মারা গেল। বুড়ো নিজেও মরল, লগে দেবীর লাহান মাইয়াডারেও আগুনে পোড়ায়ে মারল।

জ্বলন্ত চিতা থিকি যশোদা সেদিন চিল্লায়ে কয়েছিল,' আমারে ছাইড়ে দেও নিতাইদা। শীবের নাম লয়ে কচ্ছি, এই পোড়ামুখী দূরন দেশে চইল্যা যাবে। কোনোদিন তোমাগো মুখ দেখাবে না।'

চুপ কর ডাকাত।

হরিদাস নিতাইকে থামতে বললেও নিজের কান্না কিন্তু থামাতে পারেননি। ধূতির কোনে তিনি চোখ মুছেন। নিতাই চাড়ালও ধরা গলায় বলে,

শুনিছি দিল্লির সম্রাট হূমায়ুন নাকি সতীদাহ বন্ধ করতে কসুর করছেন?

হ রে নিতাই। কিন্তু ব্রাহ্মণরা তো ওনার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে।

মুসলমানদের সাথে ব্রাহ্মণরা কুলাবে? তুমি দেইখে নিয়ো কর্তা মুসলমানরা ঠিকই এই অভিশাপ মুছে দেবে। আচ্ছা কর্তা,

মুসলমানদের মইধ্যে না কি জাতপাতের বালাই নাই। সবাই না কি এক পাতে বইসে ভাত খায়। এক পাটিতে দাঁড়ায়ে আল্লাহ রে ভক্তি করে। আল্লাহর কাছে সব মানুষই না কি সমান। আমাগের ব্রহ্মার লাহান আল্লাহ না কি কাউরে মুখ থিকি আর কাউরে পা থিকি সৃষ্টি করেননি। সবাইকেই তিনি মাটি দিয়ে গড়িছেন। মুসলমানদের ধর্ম বড়ই চমৎকার ধর্ম, তাই নে কর্তা?

মুখে কুলুপ দে হতচ্ছড়া। ঠাকুর জানতে পারলে আস্ত রাখবে না তোকে।

ছাড়েন তো ঠাকুরের কথা। ওই যে কোন ঝাড়ের বাঁশ তা আমার ম্যালা জানা আছে।

চার. সদ্য ভূমিষ্ঠ নাতির ফুটফুটে মুখ দেখে উচ্ছ্বসিত রঘুনাথ। নাতিকে কোলে নিয়ে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেন, ভগবান তোমায় ক্ষত্রিয়কুলের রক্ষাকর্তা করুক।

ঘর ভরা আত্মিয়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারাশঙ্কর সৌরজাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,

দেবী! এই পুরোহিতের সাধ্যি কই যে তব দানের যথার্থ অর্ঘ্য নিবেদন করবে। তবুও কিছু তো নিবেদন করতে হয়। কিন্তু কি দিয়ে করি? হুম, প্রত্যেক প্রাণীর কাছে তার জীবনই তো সবচেয়ে দামি। এই পুরোহিত তার সেই জীবনটাই তোমার বেদীতে অর্পণ করছে। এতে যদি দেবী প্রসন্ন হয়। তবে এ জীবন স্বার্থক।

সৌরজাও কম যায় না। মৃদু হেসে বলে,

দেবী অর্ঘ্য গ্রহণ করিতে পারে এক শর্তে।

শর্ত কেন বলছেন? বলুন আদেশ।

সবার সামনে চুমু খেতে হবে।

আহা! এতো পুরোহিতেরই পরম বাসনা।

তারাশঙ্কর সৌরজার গালের কাছে মুখ নিয়ে যেতে চায়লে সৌরজা ক্ষানিক সরে গিয়ে বলে,

ভারি নির্লজ্জ তো আপনি!

প্রেমিকদের নির্লজ্জ হতে হয়।

মানুষ তো প্রেমে পড়লে কবি হয়।

নির্লজ্জের আরেক নামই তো কবি।

তাই!

হুম।

পুরোহিত কি তবে মন্দির ছাড়ল?

হৃদয়ের চেয়ে বড় মন্দির নেই।

আর কবিতা?

কবিতা! সে তো তুমিই। চন্দনে ধূসর তনু বিভূতিভূষণ /ললাটে সিন্দুর বিন্দু ব্যক্ত সুনয়ন।

বুঝেছি, বাকপটুতা বেশ ভালোই রপ্ত করেছেন। এবার বলেন দেখি, ছেলের কী নাম রাখবেন?

সে কি! তুমি ঠিক করনি?

করেছি বৈ কি? কিন্তু সে নাম কি আপনাদের পছন্দ হবে।

দশ মাস তো তুমিই পেটে রেখেছ। না কি আমি?

কিন্তু বাবা?

সে আমি বুঝব। এবার বল কি নাম ঠিক করলে?

রামচরণ।

তবে তাই হোক।

পাঁচ. ছয় বছর পর।

হঠাৎ করেই যেন ব্যামোটা তারাশঙ্করকে পেয়ে বসল। তান্ত্রিক-বৈদ্য কতকিছুই দেখানো হল। কিন্তু কিছুতেই অলুক্ষণে ব্যামোটা সারছে না। বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে। শুধু কাঁশি হলেও সারা যেত। কিন্তু কাঁশির সাথে যে রক্তও ভাঙছে। সৌরজা ভেঁজা কাপড়ে তারাশঙ্করের গা মুছে তেল লাগিয়ে দিচ্ছে। তারাশঙ্করের পলকহীন চোখ সৌরজাতেই নিবদ্ধ।

এভাবে তাকিয়ে আছেন যে!

তোমাকে মন ভরে দেখছি।

ওমা! আমাকে নতুন করে দেখার কী আছে?

কতোটুকুইবা দেখতে পারলাম? তাছাড়া ও পাড় থেকে দেখতে পারব কি না কে জানে!

মাথা খান আমার। আর কক্ষনো অমন কথা মুখে আনবেন না।

তারাশঙ্কর হাসতে গিয়ে কেঁদে দেয়। চোখভরা জল নেমে আসে গাল বেয়ে।

রাখতে পারবে না গো দেবী। রাখতে পারবে না। যে যাওয়ার সে যাবেই।

রাখতে না পারি, সাথে তো যেতে পারব।

না। এটা পাপ। ঘোর পাপ।

কেন? মাদ্রী কি পাণ্ডুর দোসর হননি? সহমরণে যাননি?

না, যাননি। এটা স্বার্থবাজ ব্রাহ্মণদের মিথ্যাচার। মহাভারতের কোত্থাও এ কথা নেই। যা আছে তা হচ্ছে মাদ্রীর ভুল বুঝাবুঝি

ভুল বুঝাবুঝি!

হুম, সেটাই। মাদ্রী ভেবেছিল তার কারণেই পান্ডুর মৃত্যু হয়েছে। কেন না মাদ্রীর সাথে সহবাস করার কারণেই পাণ্ডুকে মৃত্যুর অভিশাপ দেয়া হয়েছিল। অথচ মাদ্রী ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ। পান্ডুর মৃত্যুটা মাদ্রী সামলে নিতে পারেননি। শোকে তার প্রাণপাখি বেরিয়ে যায়। পাণ্ডুর সাথে মাদ্রীর প্রাণহীন লাশকেই দাহ করা হয়েছিল। জীবন্ত মাদ্রীকে নয়।

আমার গা ছুঁয়ে কথা দাও সৌরজা। তুমি কখনো এমনটি করবে না। তোমার কিছু হলে আমাদের রামচরণের কী হবে?

চুপ করেন তো। এসব শুনতে ভালোলাগছে না।

শুনতে খারাপ লাগলেও যে কষ্ট করে শুনতে হবে। আমাদের রামচরণের জন্য হলেও শুনতে হবে। আমি জানি আমার মরার পর ব্রাহ্মণরা তোমাকেও আমার চিতায় তুলে দেবে। সে জন্যেই আমি দিল্লি খবর পাঠিয়েছি। জানি না সম্রাটের লোকেরা সময়মত আসতে পারবে কি না।যদি তারা না আসতে পারে, তবে তুমিই চলে যেয়ো।

 আপন প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন বলেই যবনদের হাতে আমায় তুলে দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু এটা ভেবে দেখেননি মুসলমানের হাতে পড়লে আপনার দেবী আর দেবী থাকতে পারবে কি না।

ভুল বললে দেবী। মুসলমানরা নারীকে মায়ের চোখে দেখে। পরস্ত্রীর দিকে দৃষ্টি দেয়া তাদের ধর্মে পাপ বলে সাব্যস্ত। আর দিল্লির সম্রাট হূমায়ুন তো অবতার তুল্য। সতীদাহ বন্ধের জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ছয়. ঠক ঠক ঠক...

কে?

আজ্ঞে কর্তা আমি। নিতাই চণ্ডাল।

নিতাই চণ্ডালের গলা শুনে হরিদাসের বুক ছ্যাত করে উঠে। ভাবনারা জাপটে ধরে, এই মাঝ রাতে নিতা চণ্ডাল! তবে কি সৌরজা...

দরজাটা একটু খুলেন কর্তা।

নিতাই চণ্ডালের ধরা গলায় হরিদাস সম্বিত ফিরে পায়। দরজা খুলতেই নিতাই চণ্ডাল হরিদাসকে জানাই, 'সর্বনাশ হয়ে গেছে কর্তা।

গোবিন্দপুর থেকে খবর এসেছে, জামাই বাবু আর নেই।

খবরটা শুনে হরিদাস টলতে শুরু করলে নিতাই চণ্ডাল তাকে জড়িয়ে ধরে।

ভেঙে পড়লে হবি না কর্তা। যা করার তারাতারি করতি হবি। এক্ষুণি গোবিন্দপুরে রওয়ানা দিতে হবি।

হরিদাস গায়ে জামা জড়িয়ে তখনই নিতাই চণ্ডালের সাথে গোবিন্দপুরে রওয়ানা দেন। গোবিন্দপুর পৌঁছতে পৌঁছতে সূর্য পূর্বাকাশ রাঙিয়ে হলুদ বরণ ধারণ করে। রঘুনাথ বাবুর বাড়িতে পা দিতেই বুকটা কেঁপে উঠে হরিদাসের। 'সৌরজা মা' বলে এক চিৎকারেই মূর্ছা যান তিনি। দীর্ঘক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে দেখেন, সৌরজাকে গোসল করাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হরিদাস দৌড়ে গিয়ে রঘুনাথ বাবুর পায়ে পড়েন।

দোহায় লাগে বিয়াই মশাই। আমার সৌরজাকে চিতাই তুলবেন না। নাতিটার মুখের দিকে তাকিয়ে হলেও মেয়েটাকে ছেড়ে দিন।

রঘুনাথ বাবু পা ছাড়িয়ে নিয়ে বলেন,

অধৈর্য হয়ো না হরিদাস। এ তো শীবেরই কলম।

মিথ্যে কথা। ধর্মের নামে অর্ম করবেন না বেয়াই মশাই। ধর্মের কোথাও এমন কথা বলা হয়নি যে, পতির মৃত্যুর পর পত্নীকেও তার সাথে জ্যান্ত পোড়াতে হবে। যদি তাই হতো তবে কুরু বংশের রাজা শান্তনুর মৃত্যুর পর তার পত্নী সত্যবতী চিতায় বসেননি কেন? কেন শান্তনুর পুত্র বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর তার দুই পত্নী বিধবা হয়েই থাকেন। ভগবান রামচন্দ্রের পিতা দশরতের মৃত্যুর পরও তো তার তিন পত্নী সহমরণে যাননি। এ যদি শাস্ত্রেরই নিয়ম হয় তবে তারা কেন ভষ্ম হলেন না। সতীদাহ নামের এই বর্বরতা স্বার্থবাজ ব্রাহ্মণদের বানানো প্রথা।

হরিদাসের মুখে মহাভারত শুনে রঘুনাথ থ হয়ে গেলেও অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে অনিন্দ্য ব্রাহ্মণ।

শাস্ত্রের তুই কি বুঝিস রে হতচ্ছড়া। জন্মেছিস তো বৈশ্য হয়ে। আর কলঙ্ক রটাচ্ছিস ব্রাহ্মণদের নামে।

ধর্ম কি শুধু ব্রাহ্মণদের জন্যেই ঠাকুর? বৈশ্যরাও ধর্ম জানে। ধর্মেই তো বলা আছে, ' উদীষর্ব নার্ষ্যভি জীবলোকং গতাসুমেতমুপশেষ এহি। হস্তগ্রাভাস্য দিধিষোস্তবেদং পুর্তর্জনিত্বমাভি সংবভূব।'

হে নারী! মৃত পতির শোকে অচল হয়ে লাভ কী? বাস্তব জীবনে ফিরে এসো। পূণরায় তোমার পাণি গ্রহণকারী পতির সাথে তোমার আত্মার পত্নীত্ব তৈরি কর।

হরিদাসের শাস্ত্রজ্ঞান দেখে অনিন্দ্য আরও ক্ষ্যাপা হয়ে উঠে। সমবেত লোকদের উদ্দেশ্য করে বলে, বেঁধে রাখ এই দুর্বৃত্তটাকে। স্বার্থের জন্যে ধর্মের দিকে আঙুল তুলতে বুক কাপল না নরাধম। নরকেও ঠাই হবে না তোর।

অনিন্দ্যের কথা মতো হরিদাসকে আটকে রাখা হয়। এদিকে রামচরণকেও তার মায়ের কাছে যেতে দেয়া হচ্ছে না। 'আমাকে মায়ের কাছে যেতে দাও' বলে ছেলেটি সেই মাঝরাত থেকে কেঁদে কেঁদে গলা ভেঙেছে। তাতেও রঘুনাথের মনে এতটুকু মায়ার উদ্রেক হল না। সৌরজার মিনতিও রঘুনাথ কানে তুলেনি। বরং উল্টো হুমকি দিয়ে বলে, 'তোর পাপের জন্যেই আমার তারাশঙ্করের অকাল প্রয়াণ হয়েছে। তোর ছেলে জন্য তোর যেমন জ্বলে, তেমনি তারাশঙ্করের জন্যও আমার জ্বলে। ছেলের ভালো চায়লে সতী হ।'

কুসংস্কার যে মানুষকে এতটাই নীচু করে দেয় রঘুনাথ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

দুপুর গড়াতেই তারাশঙ্কর আর সৌরজাকে নিয়ে রঘুনাথ হুগলির তীরবর্তী চণ্ডি মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। চিতায় পৌঁছেই সৌরজাকে ধুতুরা খাওয়ায়। সৌরজার চেতনা লোপ হয়ে এলে অনিন্দ্য বয়জো চণ্ডালকে বলে,

'এবার সতীকে তারাশঙ্করের চিতায় বসিয়ে দে।'

চণ্ডাল সৌরজাকে চিতায় বসিয়ে অর্ধেক শরীর ঢেকে দেয় চন্দনের খড়িতে। তারপর একযোগে বেজে উঠে ঢাকঢোল। ধীরেধীরে সৌরজার চারপাশে সৃষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলী ঘন হতে থাকে। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় সৌরজার আপাদমস্তক। বয়জোসহ আরো কয়েকজন মিলে কাঁচা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বেহুশ সৌরজাকে চেপে ধরে। এরপর অনিন্দ্য ইশারা করলে রঘুনাথ হাতের জ্বলন্ত খড়িটি চিতায় ছুঁয়ে দেয়। মূহুর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠে আগুনের গালিচা।

এসএস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত