শিরোনাম

‘মাদক ব্যবসায় না জড়ানোয় জান্নাতিকে পুড়িয়ে হত্যা’

প্রিন্ট সংস্করণ॥নরসিংদী প্রতিনিধি  |  ০০:৩২, জুন ২০, ২০১৯

এক বছর আগে কিশোরী জান্নাতির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে শিপলুর। সেই প্রেম পরিণতি দিতে পালিয়ে বিয়েও করে তারা। কিন্তু বিয়ের পরে স্বামীর আসল রূপ ধরা পড়ে জান্নাতির কাছে। জানতে পারে, সে মাদক ব্যবসায়ে জড়িত।

শুধু স্বামী নয়, বরং তার পুরো পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ এ ব্যবসা করে আসছে। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন জান্নাতিকেও মাদক ব্যবসায় নামাতে চেয়েছিল। কিন্তু এতে সায় ছিল না তার। বরং বিরোধীতা করেছিল। আর সেটাই কাল হলো জান্নাতির।

তার গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল শ্বশুরবাড়ির লোকজন। নির্মম এ ঘটনার ৪০ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জান্নাতি। জান্নাতির খুনিদের স্বীকারোক্তিতে ওঠে এসেছে হত্যার এমন লোমহর্ষক বর্ণনা। জান্নাতি হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নাটোর জেলার নারায়ণপুর পুকুরপাড় এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার দুপুরে নরসিংদী জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানানো হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলো— নিহত জান্নাতির শাশুড়ি শান্তি বেগম ওরফে ফেন্সী রানী (৪৫), স্বামী সাব্বির আহামেদ শিপলু ওরফে শিবু (২৩) ননদ ফাল্গুনী বেগম (২০) ও শ্বশুর হুমায়ন মিয়া (৫০)। তারা সবাই নরসিংদী চরহাজিপুরের খাসেরচর গ্রামের বাসিন্দা।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন (বিপিএম) বলেন, পারিবারিক মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত করদেত না পারায় জান্নাতুল ফেরদৌসি ওরফে জান্নাতিকে পুড়িয়ে হত্যা করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। ঘটনার দিন রাতেই ছয়জনকে আটক করা হয়।

পরে তাদের দেয়া তথ্য মতে, পুলিশ ও ডিবি পুলিশের একটি চৌকস দল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, টঙ্গী, চাপাইনবাবগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে না পেয়ে নাটোর জেলায় অভিযান চালালে মঙ্গলবার রাতে এজাহারভূক্ত চার আসামি মাদক ব্যাবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তাদের আদালতে তুলে রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশ জানায়, নরসিংদী সদর উপজেলার হাজিপুর গ্রামের শরীফুল ইসলাম খানের দশম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ে জান্নাতি আক্তার (১৬) ও আর পার্শ্ববর্তী খাসেরচর গ্রামের হুমায়ুন মিয়ার ছেলে শিপলু মিয়ার মধ্যে প্রায় এক বছর আগে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে।

এর কিছুদিন পরই পরিবারের অমতে তারা পালিয়ে বিয়ে করেন। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই জান্নাতি পরিবারের মাদক ব্যবসায়ের বিষয়টি জানতে পারে। তাকেও পারিবারিক মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত করতে শাশুড়ি শান্তি বেগম ও স্বামী শিপলু চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু রাজি করাতে পারেনি জান্নাতিকে।

এ কারণে জান্নাতির ওপর চলে কঠোর নির্যাতন। দাবি করে যৌতুকের। দাবির টাকা না দেয়া এবং মাদক ব্যবসায় না জড়ানোয় চলতি বছরের ২১ এপ্রিল রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় শাশুড়ি ও স্বামী শিপলু জান্নাতির শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

তাদের সহযোগিতা করে ননদ ফাল্গুনী বেগম। দগ্ধ হয়ে ছটফট করলেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি তারা। পরে এলাকাবাসীর চাপে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করানো হয়।

দীর্ঘ ৪০ দিন মৃত্যু যন্ত্রণার পর গত ৩০ মে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে মারা যায় সে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা শরিফুল ইসলাম গত ১৫ জুন নরসিংদী সদর মডেল থানায় বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন।

ঘুমন্ত জান্নাতিকে পুড়িয়ে হত্যা, ৪ জন রিমান্ডে
মাদকব্যবসায় সম্পৃক্ত না হওয়ায় নরসিংদীর হাজিপুরে দশম শ্রেণির ছাত্রীকে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত চারজনকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকার বুধবার দুপুরে নরসিংদীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনা আক্তারের আদালতে হাজির করে তাদের ১০ দিন করে রিমান্ড চায় পুলিশ।

শুনানি শেষে নিহত জান্নাতির স্বামী সাব্বির আহমেদ শিপলু মিয়ার চারদিন ও অন্য তিনজনের দুইদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। রিমান্ডে নেয়া অন্যরা হলেন- জান্নাতির শ্বশুর হুমায়ুন মিয়া (৫০), শাশুড়ি শান্তি বেগম ওরফে ফেন্সী রানী) ও ননদ ফাল্গুনী বেগম (২০)।

তারা সবাই চর হাজিপুরের খাসেরচর গ্রামের বাসিন্দা। এর আগে মঙ্গলবার রাতে নাটোরের পুকুরপাড় এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বুধবার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন নরসিংদীর পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ।

মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, পারিবারিক মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত না হওয়ায় জান্নাতুল ফেরদৌসি ওরফে জান্নাতি আক্তারকে পুড়িয়ে হত্যা করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এ ঘটনায় ১৫ জুন নিহতের বাবা শরিফুল ইসলাম বাদি হয়ে সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।

এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই ছয়জনকে গ্রেপার করে পুলিশ। পরে তাদের দেয়া তথ্যমতে মঙ্গলবার রাতে পুলিশ ও ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে নাটোর থেকে নিহত জান্নাতির স্বামী শিপলু মিয়া, শ্বশুর হুমায়ুন মিয়া, শাশুড়ি শান্তি বেগম ও ননদ ফাল্গুনী বেগমকে গ্রেপ্তার করে।

গতকাল বুধবার তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইলে রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সদ্যপদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শফিউর আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন, সদর মডেল থানা পুলিশের ওসি সৈয়দুজ্জামান, ডিবি পুলিশের ওসি গোলাম মোস্তফা ও গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া এসআই নাইমুল ইসলাম মোস্তাক প্রমুখ।

জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে নরসিংদী সদর উপজেলার হাজিপুর গ্রামের শরীফুল ইসলাম খানের দশম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে জান্নাতি আক্তারের (১৬) সঙ্গে পার্শ্ববর্তী খাসেরচর গ্রামের শিপলু মিয়ার প্রেম হয়। কিছুদিন পরই পরিবারের অমতে তারা পালিয়ে বিয়ে করেন।

বিয়ের কিছুদিন পর জান্নাতি বুঝতে পারে পরিবারটির সবাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জান্নাতিকে পারিবারিক মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত করতে মাদক ব্যবসায়ী শাশুড়ি শান্তি বেগম ও স্বামী শিপলু চাপ দিতে থাকেন। কিন্তু এতে রাজি হননি জান্নাতি। পরে তাকে নানাভাবে নির্যাতন করা হয়।

চলতি বছরের ২১ এপ্রিল রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় শান্তি বেগম, ফাল্গুনী বেগম ও শিপলু মিলে জান্নাতির শরীরে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। দগ্ধ হয়ে ছটফট করলেও তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাননি তারা। পরে এলাকাবাসীর চাপে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে জান্নাতিকে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পর ২৫ এপ্রিল জান্নাতির দাদা মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম খান আদালতে মামলা করেন। আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) সাতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

এরই মধ্যে গত ৩০ মে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জান্নাতির মৃত্যু হয়। গত ১৫ জুন মেয়েকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় শান্তি বেগম, শিপলু, ফাল্গুনী বেগম ও হুমায়ুন মিয়াকে আসামি করে সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন জান্নাতির বাবা শরীফুল ইসলাম।

এরপরই আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে পুলিশ। পাশাপাশি দীর্ঘ ৫১ দিন তদন্ত শেষে জান্নাতি হত্যায় জড়িত স্বামী শিপলু, শাশুড়ি শান্তি বেগম, শ্বশুর হুমায়ুন ও ননদ ফাল্গুনী উল্লেখ করে রোববার আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেয় পিবিআই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত