শিরোনাম

মালিকদের সিদ্ধান্তে বিপাকে ব্যাংকগুলো

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী   |  ০১:৫২, আগস্ট ২০, ২০১৯

বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন- বিএবি আমানত ও ঋণের সুদহার ছয় ও নয় শতাংশ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রায় ১৪ মাস অতিক্রম করতে গেলেও তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বর্তমান বাজার অর্থনীতির যে অবস্থা, তাতে এটা বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব বা আদৌ সম্ভব কি-না তা নিয়ে খোদ ব্যাংকাররাও সন্দিহান।

গত বছর সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সঙ্গে এক বৈঠকে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস-বিএবি ‘নয়-ছয়’ সুদহারের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ মাসেও তা কার্যকর হয়নি। একদিকে ‘কমিটমেন্ট’ রক্ষা, অন্যদিকে আমানত সংগ্রহ— এই দুয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে ব্যাংকগুলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন দিক সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা না করেই, ব্যাংক মালিকরা ঝোঁকের বশে ‘নয়-ছয়’ সুদহারের ঘোষণা দেন। সেটি যে অবাস্তব সিদ্ধান্ত ছিল, তা এখন তারা নিজেরাও বুঝতে পারছেন। এতো কম সুদে আমানত সংগ্রহ করতে গিয়ে নাকানি চুবানি খাচ্ছে ব্যাংকগুলো।

অর্থাৎ, মালিকদের হঠকারি সিদ্ধান্তেই বিপাকে পড়েছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকাররা বলছেন, সরকার ও ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) উদ্যোগে সুদহার নির্ধারণ করার পরও বাজার অর্থনীতির কারণে তা ঠিক থাকছে না। আবার প্রভাবশালী ব্যাংকগুলো তাদের ইচ্ছামত সুদ নির্ধারণ করছে। ফলে আমানত নিয়ে টানাটানি হচ্ছে।

জানা গেছে, বিএবির সিদ্ধান্ত মানতে গিয়ে আমানতের সুদহার কমিয়েছে অনেক ব্যাংক। আড়াই থেকে তিন শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে কোন কোন ব্যাংক। অন্যদিকে, কেউ কেউ আবার এখনো বেশি সুদেই আমানত সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা গেছে অধিকাংশ ব্যাংকেরই আমানতের সুদ এখনো ৬ শতাংশের উপরে।

জানা গেছে, গত এক বছরে যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ হয়েছে, তার চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, গত মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানতের পরিমাণ ১০ লাখ ২৩ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মেয়াদি আমানত নয় লাখ ১৬ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। আর তলবি আমানত এক লাখ ৬ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা। গত এক বছরে আমানত বেড়েছে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

অন্যদিকে মার্চ শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। গত এক বছরে ঋণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ফলে ব্যাংকগুলোতে এখন নতুন করে আমানত দরকার। আর এই আমানত সংগ্রহ করার জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চাপ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ছয় শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যেসব নীতিনির্ধারণী কলাকৌশলের মাধ্যমে মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণ হতো, চাপ দিয়ে তা পরিবর্তন করে নিয়েছেন ব্যাংক পরিচালকরা। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ভূমিকা রাখত, তা ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। এছাড়া সরকারি সংস্থার তহবিলের অর্ধেক বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সুযোগ দেওয়ায় আমানত নিয়ে যে টানাটানি শুরু হয়েছিল, এখনো কোনো কোনো ব্যাংক সেটা করছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বিএবির সিদ্ধান্তের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ৯১ দিন, ১৮২ দিনসহ বিভিন্ন মেয়াদি নতুন নতুন আমানত প্রকল্প ঘোষণা করেছে অনেক ব্যাংক। যেসব আমানতের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, আগের মতো সুদ না পাওয়ায় তা তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকরা।

এমনকি সরকারি ব্যাংকও বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফেলছে। ফলে আমানত নিয়ে গোটা ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনায় বিপাকে পড়েছেন সুদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা। এত কম সুদে ব্যাংকগুলোও এখন আমানত পাচ্ছে না।

এদিকে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএবি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিকল্প নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, যাতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরাও (এমডি) আতঙ্কে রয়েছেন। বিএবি একদিকে সুদহার কমানোর কথা বলছে, অন্যদিকে বেশি মুনাফা করতে নিজ ব্যাংকের এমডিদের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাজার ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে সুদের হার নির্ধারণ করেছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করেই বিএবি সুদহার নির্ধারণ করে বসল। সুদহার নির্ধারণে ব্যাংক মালিকদের আইনত কোনো অধিকার নেই। সরকার এভাবে তাদের ক্ষমতায়ন করলে এর ফল ভয়ংকর হবে।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ- এবিবির চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোতে আমানতের চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ। আমানতের সুদ নিয়ে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, তাতে ব্যাংকে টাকা আসা কমে গেছে। যাদের আমানতের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সেটাও পুনরায় আমানতে না গিয়ে সঞ্চয়পত্রসহ অন্য খাতে চলে যাচ্ছে। আমানত না পেলে তো ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে না।

এদিকে, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে কঠোর অবস্থানে সরকার। এর অংশ হিসেবে ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়নকারী ব্যাংকের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিকপ্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব ব্যাংক ঋণের ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়ন করেছে, তারাই শুধু সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিবি) বরাদ্দ রাখা তহবিল পাবে। সরকারি তহবিলের এই অর্থ আমানত হিসেবে রাখার সুবিধা দিতে এ তালিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে, তারা এ সুবিধা পাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামালের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে তারা জানিয়েছেন, অনেক ব্যাংকই ‘নয়-ছয়’ সুদহার কার্যকর করেছে। যারা বাকি আছে, তারাও শিগগিরই এটা বাস্তবায়ন করবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত