শিরোনাম

মুর্শিদাবাদে একদিন

প্রিন্ট সংস্করণ॥আল কাছির  |  ১৩:০৪, জুন ২০, ২০১৯

মুর্শিদাবাদ। পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি জেলা। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

প্রায় ৫,৩১৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই জনপদের জনসংখ্যা প্রায় ৭১ দশমিক ০২ লক্ষ, তাই এই জেলাটি ভারতের নবম (ভারতের ৬৪১টি জেলা মধ্যে) জনবহুল জেলা। জেলার সদর দপ্তর বহরমপুর।

১৭০৪ খ্রীষ্টাব্দে দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁন ঢাকা থেকে তার দেওয়ানী তুলে নিয়ে আসেন ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত এই মুর্শিদাবাদে। তখন মুর্শিদাবাদের নাম ছিল মকসুদাবাদ।

তারপর এই মুর্শিদ কুলি খাঁনের নাম অনুসারেই ‘মুর্শিদাবাদ’ নাম করণ করা হয়। এটি ছিল বাংলার (বর্তমানে বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ) এক সময়ের রাজধানী।

১৭১৭ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদ কুলি খাঁন সুবাদার হলে মুর্শিদাবাদ হয় বাংলার রাজধানী। ইংরেজ আমলে সিংহাসনে বসেন সিরাজ-উদ-দৌলা। ব্রিটিশরা বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পলাশীর যুদ্ধে হারিয়ে, বাংলার রাজধানী প্রতিষ্ঠা করে কলকাতায়।

প্রাচীন নথি থেকে ১৮০০ শতকে ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে মুর্শিদাবাদ বলে একটি কৃষি ক্ষেত্র এবং রেশম উৎপাদক জায়গার কথা জানা যায়। এর আগে ১৬০০ শতকে মোঘল সম্রাট আকবর এই অঞ্চলটিকে নিয়ে যথেষ্ট উৎসাহী ছিলেন।

রেশম ও হাতির দাঁতের শিল্প ছাড়াও এই অঞ্চল সোনা ও রুপার জড়ির কাজের জন্য বিখ্যাত ছিল। মুর্শিদাবাদের একদিকে মালদা জেলা ও ঝাড়খন্ড রাজ্য, অন্য দিকে আছে নদীয়া ও বীরভূম জেলা।

আর এক দিকে বাংলাদেশের রাজশাহীর সীমা ছুঁইয়ে আছে নবাবদের স্মৃতি বিজড়িত এই শহর। এই মুর্শিদাবাদেই রয়েছে বাংলার স্বাধীন নবাবদের কিছু নির্দশন। চলুন, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই নির্দশন গুলোর কিছু তথ্য :

হাজার দুয়ারী : আনুমানিক ১৮৩৭ সালে এই বিরাট প্রাসাদ তৈরি করেন নবাব নাজিম হুমায়ুন শাহ। এই প্রাসাদে আছে ১০০০টি দরজা। যেগুলির মধ্যে ৯০০টি আসল আর ১০০টি দরজার প্রতিরূপ। খুব কাছে থেকে না দেখলে বোঝার উপায় নেই কোনটি আসল আর কোনটি নকল। ইতালিয় ধারায় তৈরি ৪১ একর জোড়া এই প্রাসাদে ১১৪টি ঘর আছে।

এছাড়া আছে ৮টি সভা ঘর। গোটা প্রাসাদটিকে নবাবদের ব্যবহার করা নানা রকম জিনিস দিয়ে সাজানো রয়েছে। আছে অদ্ভুত সেই আয়না যার সামনে দাঁড়ানো মানুষটির প্রতিচ্ছবি কোনো ভাবেই দেখা যায় না, বাকি সব কিছু একই রকমভাবে দৃশ্যমান থাকে। আছে হাতির পিঠে নবাবের বসবার জন্য রুপার হাওদা আর তাতে সুদৃশ্য সোনার জড়ির কাজের নরম রেশমের চাঁদর।

আরও আছে নবাবদের ব্যবহার করা বিভিন্ন অস্ত্র। তার আকার এবং ওজন অবাক করার মত। এর থেকে সেই সময়ের যোদ্ধাদের শারীরিক ক্ষমতার আন্দাজ পাওয়া যায়। এখানে দেখা যাবে নবাবদের অস্ত্রাগারের।

যেখানে আছে ২৭০০ রকমের যুদ্ধের অস্ত্র। আছে নবাবদের ব্যবহার করা বাসন, যেগুলি নানা দেশ থেকে আমদানি করা। এছাড়াও রয়েছে বিরাট পাঠাগার। তাতে নানা ধরনের প্রাচীন বই-পত্র, পুঁথির সম্ভার। তবে পাঠাগারটি সাধারণের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না।

হাজার দুয়ারীতে দেখা মিলবে নবাবদের সভা ঘর। যেখানে বসে রাজ্য চালাতেন নবাব আলিবর্দি খাঁন এবং তার নাতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। এখানে দেখতে পাবেন নবাবদের সিংহাসন। বেগমদের পর্দা ঘেরা বসার জায়গা।

একটু চোখ খুলে রাখলে দেখতে পাবেন সভাঘরের অভূতপূর্ব নিরাপত্তা। আজকের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মতোই গোপন ঘুলঘুলি দিয়ে সে সময় নজর রাখত কিছু সদা-সতর্ক চোখ। নবাবদের নিরাপত্তা বলয় আজকের নেতা মন্ত্রীদের নিরাপত্তা বলয়ের থেকে কম কিছু ছিল না।

ইমামবাড়া : হাজার দুয়ারীর সিঁড়ি থেকে নেমে এলেই চোখে পড়বে ‘ইমামবাড়া’। নবাব নাজিম মনসুর আলি খাঁন এটি নির্মাণ করেন। আগুনে পুড়ে যাবার পর সিরাজ-উদ-দৌলা এটিকে পুণঃনির্মাণ করেন। এটি পশ্চিমবঙ্গের এবং সম্ভবত ভারতের সব থেকে বড় ইমামবাড়া।

মদিনা মসজিদ : হাজার দুয়ারী আর ইমামবাড়ার মাঝে আছে মদিনা মসজিদ। সুন্দর পাথরের কারুকার্য করা এই মসজিদ আসল মদিনা মসজিদের অনুকরণে তৈরি।

ওয়াসিফ মঞ্জিল : হাজার দুয়ারী থেকে বের হলে একটু দুরেই ওয়াসিফ মঞ্জিল। সম্পূর্ণ শ্বেত পাথরের এই প্রাসাদ বানিয়েছিলেন নবাব ওয়াসিফ আলি মির্জা। অপূর্ব সুন্দর পাথরের মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে।

কাঠগোলা বাগান : হাজার দুয়ারী থেকে ৪ কি.মি. উত্তরে এই কাঠগোলা বাগান। ১৭৮০ সালে প্রায় ২৫০বিঘা জায়গা নিয়ে এ কাঠগোলা বাগানটি প্রতিষ্ঠা করেন লক্ষীপৎ সিং দুগর।

অট্টালিকা, সংগ্রহশালা, গোপন সুরঙ্গপথ, আদিনাথ মন্দির, বাঁধানো পুকুর সব আরও অনেক কিছুর দেখা মিলবে কাঠগোলা বাগানে। বাগানের মধ্যে দোতালা অট্টালিকার সামনে বড় পুকুর, এক সময় এই পুকুুরে থাকত নানা ধরনের রঙ্গীন মাছ। নবাব সৈয়দ হাসান আলী মির্জা কাঠগোলা বাগানের নাচ মহলে অংশ গ্রহণ করতেন।

জৈন মন্দির ও প্রাসাদ ছাড়াও চিড়িয়াখানা, হেরেম ও শ্বেত পাথরে বাঁধানো ঘাট দেখতে পাওয়া যাবে এ স্থানটিতে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মহামূল্যবান আসবাব ও তৈজসপত্র। ১৮৭০ সালে এ প্রাসাদটি পুনঃনির্মাণ করা হয়।

ওই সময় কাঠগোলা বাগানে জলসা হতো। সে জলসা দেখতে অনেক লোকের সমাগত হতো এখানে। বর্তমানে কাঠগোলা বাগান একটি দর্শনীয় স্থান। নির্ধারিত মূল্যের টিকেট কেটে আপনিও ঘুরে দেখতে পারেন এ স্থানটি।

কাটরা মসজিদ : কাটরা মসজিদ মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশনের ৩ মিটার পূর্ব দিকে বাজারের মধ্যে অবস্থিত। মসজিদটির আয়তন প্রায় ৫১ বর্গমিটার। পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির বর্তমানে কেবলমাত্র দুটি গম্বুজ বিদ্যমান। মসজিদটি চতুর্দিক দ্বিতল কক্ষ সারি দ্বারা পরিবেষ্টিত। স্থানীয় ভাবে কাটরা বলে অভিহিত কক্ষগুলি মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহার হত। মসজিদটির নির্মাতা মুর্শিদ কুলি খাঁনকে সমাহিত করা হয়েছে এখানে।

মতিঝিল : মতিঝিলে হলো অশ্ব ক্ষুরাকৃতি একটি হ্রদ। এ হূদে মুক্তাচাষ করতেন নয়াজ শাহ মহম্মদ। উনি ছিলেন ঐতিহাসিক চরিত্র ঘসিটি বেগমের স্বামী। এখানেই সমাধিতে আছেন নয়াজ শাহ মহম্মদ, সিরাজ-উদ-দৌলার ভাই ইক্রাম-উদ-দৌলা, তার শিক্ষক এবং তার পরিচারিকা। বেশ কিছু লোক কথা আছে এই ঘসিটি বেগমকে ঘিরে। ঘসিটি বেগম সিরাজের খালা।

রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সিরাজের বিপরীতে। শোনা যায়, নবাবের অন্দর মহল এবং বর্হিমহলের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ঘসিটি বেগম। মতিঝিলের পাশে নয়াজশাহ মহম্মদের বানানো একটি ছোট মসজিদ আছে।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই মতিঝিলকে দর্শনীয় স্থানে পরিণত করেছে। প্রায় ৭০০ বিঘা জায়গা নিয়ে নির্মিত হয়েছে মতিঝিল পার্ক। মাত্র ২০ টাকা টিকেট দিয়েই দেখা যাবে পার্কটি। পার্কটিতে ১০ বা ২০ গজ দূরে দূরে চোখে পড়বে বাংলার নবাবদের প্রতিকৃতি।

আছে শিশুদের জন্য আলাদা জায়গা, ভিআইপি কটেজ, ওয়াচ টাওয়ার। তবে সবচেয়ে আর্কষণীয় হলো, পার্কটির একবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত ‘ষড়যন্ত্রের পটভূমি’ নামক স্থানটি।

বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করার জন্য ঘসেটি বেগম, রবার্ট ক্লাইভ, উইলিয়াম ওয়াটসন, মীর জাফর ও জগত শেঠ যে ষড়যন্ত্র করেছিল, তার প্রতিকৃতি তুলে ধরা হয়েছে এখানে। সন্ধ্যার পর এখানেই আলো আর শব্দের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় মুর্শিদাবাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করার করুণ ইতিহাস।

যেভাবে যাওয়া যাবে : শিয়ালদহ স্টেশন এবং কলকাতা স্টেশন থেকে নির্ধারিত সময়ে বেশ কয়েকটি ট্রেন ছেড়ে যায় কলকাতা থেকে বহরমপুরের উদ্দেশ্য। মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘন্টার পথ পাড়ি দিলেই চলে যাওয়া যাবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই জেলাতে। এছাড়াও ধর্মতলা ডিপো থেকে বহরমপুর পর্যন্ত বাস পাওয়া যায়। বহরমপুর থেকে টুকটুক (ব্যাটারী চালিত গাড়ি) বা ট্রেকার চড়ে সহজেই ঘুরে আসা যাবে ঐ জায়গাগুলো।

থাকার ব্যবস্থা : মুর্শিদাবাদ শহরে বহরপুর ও তার আশে পাশে ছোট বড় অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। বিভিন্ন মানের এই হোটেল গুলোতে আপনার চাহিদা মত থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থাও রযেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত