শিরোনাম

চলন্তিকা বস্তির অগ্নিকাণ্ড নিয়ে নানামুখী অভিযোগ

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০০:১৪, আগস্ট ১৮, ২০১৯

রাজধানীর রূপনগর বস্তির অগ্নিকাণ্ড নিয়ে নানামুখি অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন, বিশাল আয়তনের বস্তির জায়গা দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনায় আগুন দেওয়া হয়েছে। আবার বস্তি ঘর বিক্রয়ের বিরোধে আগুন দেওয়া হয়েছে।

আবার ঈদের ছুটিতে বস্তির বাসিন্দারা না থাকায় মাদকাসক্তদের ফেলে দেওয়া সিগারেটের আগুন প্লাস্টিক পাইপের গ্যাস লাইন থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তদন্ত সাপেক্ষে কারণ জানা যাবে।

ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের সদরদপ্তরের ডিউটি অফিসার নাজমা আক্তার জানান, রূপনগরের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ডিডি আবুল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিট করা হয়েছে। কমিটির অন্যরা হলেন— এডি হালিম ও মিরপুর জোনের ডিএডি নিয়াজ আহমদ।

বস্তির বাসিন্দারা বলেন, বস্তিতে ৫০ হাজারের অধিক স্বল্প আয়ের মানুষ বসবাস করতেন। ঈদের ছুটিতে অধিকাংশ বাস্তিবাসী গ্রামে ছিল। এজন্য অগ্নিকাণ্ডে মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে রাতের মধ্যে শত শত বস্তিবাসীকে গ্রাম থেকে এসে তাদের সহায়-সম্পদের খোঁজ করতে দেখা গেছে।

কিন্তু তাদের ঘরের সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সম্বল হারানো মানুষগুলোকে কোনো কিছু পাওয়ার আশায় পোড়া ধ্বংসস্তূপ নাড়তে দেখা গেছে। বস্তির ঘরগুলো পুড়ে গেছে। উপরে শুধু পোড়া টিন দেখা গেছে।

গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটের দিকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের ২৪টি ইউনিট প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কবির (৩৫), হাবিব (১৯), রফিক ও শরিফসহ ৪ জন আহত হন। এদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, চলন্তিকা বস্তিটি নজু মিয়ার বস্তি হিসেবে দীর্ঘদিনের পরিচিত। নজু মিয়া ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে।

এখানে ৫০ থেকে ৬০ হাজার দিনমজুর দরিদ্র ব্যক্তি বসবাস করতেন। প্রায় দশ একরের বিশাল আয়তনের জায়গাটি স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তির চোখে পড়েছে। তিনি নানাভাবে বস্তিটি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন।

তারই অংশ হিসেবে ঈদে বস্তিবাসীরা গ্রামে যাওয়ার সুযোগে পরিল্পিতভাবে আগুন দিতে পারে বলে তিনি সন্দেহ করছেন। ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে এর আগেও মিরপুর পল্লবী এলাকার ডুইপ প্লট বস্তি, শিয়ালবাড়ির বস্তি ও বিহারী ক্যাম্প এলাকার বস্তিতে পরিকল্পিতভাবে অগ্নিসংযোগসহ জায়গা দখলের অভিযোগ রয়েছে।

বস্তির অপর এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বস্তিতে শেখ ফরিদ নামের কথিত এক দাঁতের ডাক্তারের বেশ কয়েকটি ঘর রয়েছে। তার একটি ঘর রহিমা নামের এক মহিলার কাছে কিছুদিন আগে বিক্রি করেন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় বস্তির উত্তর পাশের তার সেই ঘরে ডা. ফরিদ, তার স্ত্রী এবং ঘরের ক্রেতা রহিমার সঙ্গে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সে রহিমার ঘরে আগুন দেয়। এসময় সেখানে প্লাস্টিকের পাইপের গ্যাসের লাইন থাকায় মুহূর্তের মধ্যই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এসময় তিনি দৌড়ে পালিয়ে যান। তিনি এখনো পলাতক রয়েছেন। তার বাড়ি ভোলা জেলায় বলে জানিয়েছেন তিনি।

ঘটনাস্থলে দেখা গেছে, বস্তির প্রায় সবগুলো ঘরই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বাঁশের মাচার ওপর বিশেষ ব্যবস্থায় ২ থেকে ৩ তলা টিনের ঘরগুলোতে শুধু পোড়া টিন বাঁকা হয়ে পড়ে রয়েছে। আর পোড়া প্লাস্টিকের পাইপগুলো রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও প্লাস্টিকের পাইপে গ্যাস সরবরাহের কথা জানিয়েছেন।

রফিক নামে বস্তিবাসী জানান, রূপনগরের বস্তিতে তার সাতটি ঘর ছিল। এর দুটিতে প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে রান্না ঘরে ব্যবহার করা হতো।

এরকম বস্তির সকল রান্না ঘরেই প্লাস্টিক পাইপের মাধ্যমে রান্না ঘরে গ্যাস সংযোগ ছিল। বস্তির উত্তর দিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরা এলাকায় ছড়িয়ে গেছে। আর আগুন লাগার খবর পেয়ে সবাই বস্তির ছেড়ে বের হয়েছে।

বাসিন্দা খায়রুল বলেন, রূপনগর চলন্তিকা বস্তির পাশেই তাদের বাসা। আগুন ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে দ্রুত বাড়ি ছেড়ে সবাই বাইরে চলে যান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগুন নেভানো সম্ভব হওয়ায় তারা রক্ষা পেয়েছেন।

আগুনের খবর পেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্থানীয় সাংসদ ইলিয়াস মোল্যা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান ঘটনাস্থলে যান।

তারা বস্তির ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের সহায়তার আশ্বাস দেন। মেয়র গতকাল শনিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা মহানগরে বস্তিবাসীদের বসবাসের জন্য বাউনিয়া বাঁধে স্থায়ীভাবে আবাসন নির্মাণ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার সব বস্তিবাসীকে স্থানান্তর করা হবে।

বস্তিতে আগুন লাগা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অস্থায়ীভাবে থাকা-খাওয়াসহ সার্বিক সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাদের জন্য পার্শ্ববর্তী পাঁচটি স্কুল অস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। পুড়ে যাওয়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেন মেয়র।

এসময় স্থানীয় সাংসদ ইলিয়াস মোল্যা জানান, বস্তিতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার লোক বসবাস করতো। এদের সবাই ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিল। কিন্তু ফিরে এসে কেউ কিছু পায়নি। এখানে যা ছিল সব পুড়ে গেছে।

অপরদিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেছেন, মিরপুরের চলন্তিকা বস্তিতে শুক্রবার রাতে লাগা আগুনে বস্তিতে থাকা তিন হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে আনুমানিক ৬০০ ঘর ছিল।

আমরা কিছু ঘর এবং পরিবার সেভ করতে সক্ষম হয়েছি। তবে আগুনে বস্তির তিন হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বস্তিতে অনেক দাহ্য বস্তু ছিল। গ্যাসের সংযোগগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, শুক্রবার রাত ৭টা ২২ মিনিটে আগুন লাগে মিরপুরের চলন্তিকা ঝিল বস্তিতে। ফায়ার সার্ভিসের ২৪টি ইউনিটের ১২৫ জন কর্মী রাত ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত