শিরোনাম

ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও বাড়ছে মৃত্যু

প্রিন্ট সংস্করণ॥মাহমুদুল হাসান  |  ০২:৪৮, আগস্ট ২০, ২০১৯

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। সরকারি হিসেবে শতকরা ৮৪ ভাগ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে বাকি ১৬ ভাগ রোগীর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেনি তারা।

যাদের ভাগ্যে মৃত্যু নয়তো এখনো দুর্বিষহ যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু নিয়ে একটা লুকোচুরি হয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে ৪০ জন মারা গেছে।

কিন্তু বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যাটা অন্তত প্রায় দেড়শতাধিক। গতকাল সোমবার ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল এবং ফরিদপুরে অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীর চেয়ে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।

তবে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার তুলনায় বেড়েছে। শতকরা হিসাবে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা তিন শতাংশ বেড়েছে এবং ঢাকার বাইরে ১২ শতাংশ কমেছে।

এছাড়া সার্বিকভাবে গত রোববারের তুলনায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেছে। কিন্তু এই তথ্য বিশ্লেষণ করে খুশি হওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টিপাতের কারণে আরও অন্তত এক মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকবে সারা দেশে। এর মধ্যে মৃত্যুর সারি লম্বা হচ্ছে।

তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এডিস মশার বংশ বিস্তার যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে এজন্য ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

অন্যদিকে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ গতকাল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৬৪ জেলার সিভিল সার্জন ও ইউএইচএফপিওদের ডেঙ্গুর প্রতিকার, প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনাবিষয়ক নানা নির্দেশনা দিয়েছেন।

এদিকে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বলতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তদের সংখ্যা কমেছে। এই সংখ্যা আর বাড়বে না।

আক্রান্তদের সংখ্যার সূচকে নিম্নগতি পর্যবেক্ষণ করেছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ও জনসচেতনতার কারণে এ সংখ্যা কমেছে। আশা করছি, এই নিম্নগতি অব্যাহত থাকবে।

আছে নতুন উদ্ভাবনের খবর
রোগীরা কোন ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তা বের করার পদ্ধতি আবিষ্কারের দাবি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক আলিমুল ইসলাম।

তিনি বলেছেন, তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র দুই ঘণ্টায় ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সিরোটাইপ ডেন ‘ওয়ান’, ডেন ‘টু’, ডেন ‘থ্রি’ এবং ডেন ‘ফোর’ এবং চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও সিরোটাইপ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যাবে।

এই প্রযুক্তি বিলম্বে উদ্ভাবন ও ঘোষণার কারণ হিসেবে তিনি দেশের বাইরে থাকাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, দেশের বাইরে থাকায় এই উদ্ভাবনকে সামনে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।

আক্রান্ত কমলেও বাড়ছে মৃত্যু
ডেঙ্গুতে এখন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করলেও মৃত্যুর মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিদিন ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বরিশাল ও খুলনায় ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শুধু ময়মনসিংহেই মারা গেছেন দুজন। আর ঢাকা, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশালে মারা গেছেন আরও চারজন। এ সময়ে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ১৬১৫ জন।

গতকাল সোমবার ভোরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে ফাতেমা আক্তার (৪৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তার স্বামীর নাম আব্দুর রহিম, সে নারায়নগঞ্জ জেলার বন্দর থানা এলাকায় বসবাস করতেন।

এ নিয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো সাতজনে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আনোয়ার হোসেন (৪৬) ও রাসেল (৩৫) নামে দুইজন মারা গেছেন। আনোয়ার মারা যান গত রোববার মধ্যরাতে।

তিনি ওইদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে ভর্তি হন। তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলায়। প্রায় একই সময় ওই হাসপাতালে মারা যান রাসেল। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়ায়।

এদিকে একইদিন সকালে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে মিজানুর রহমান (৪০) নামে এক সবজি বিক্রতো ডেঙ্গুতে মারা গেছে। তার বাড়ি খুলনার রূপসা উপজেলার খাজাডাঙ্গা গ্রামে। খুমেক হাসপাতালের আ?বা?সিক ফি?জি?শিয়ান (আরপি) ডা. শৈলেন্দ্রনাথ বিশ্বাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ নিয়ে গত এক মাসে ডেঙ্গুতে খুলনায় পাঁচজনের মৃত্যু হলো।

ফরিদপুরে মসজিদের খাদেম দেলোয়ার হোসেন (৩৫) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি ফরিদপুর সদর উপজেলার গোরডাঙ্গীর চর এলাকায় শেখ সফিউদ্দিনের ছেলে। তিনি জেলা শহরের পূর্ব খাবাসপুর লঞ্চঘাট মসজিদের খাদেম ছিলেন।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সুপার কামদা প্রসাদ সাহা জানান, দোলোয়ার ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে গত ১৩ আগস্ট ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

অবস্থার অবনতি হলে গতকাল রাত ১০টার দিকে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। গতকাল সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এছাড়াও পটুয়াখালীর সুমাইয়া আক্তার (১৮) নামের এক তরুণী বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে (শেবাচিম) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বিকালে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। তিনি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার মো. ফজলুর রহমানের মেয়ে।

তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, পটুয়াখালী থেকে উন্নত চি?কিৎসার জন্য ব?রিশাল শের-ই-বাংলা মে?ডি?কেল কলেজ হাসপাতালে আসা ডেঙ্গু রোগী সুমাইয়া আক্তার সোমবার বিকাল ৪টার দিকে চি?কিৎসাধীন অবস্থায় মারা? গেছে।

দেশে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, গতকাল সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৬১৫ জন।

গত রোববার ছিলো এক হাজার ৭০৫। ২৪ ঘণ্টায় ১০০-রও কম রোগী ভর্তি হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। ঢাকায় ভর্তি আছে ৭৫৭ জন। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২২ জন।

মিটফোর্ড হাসপাতালে ৮১, সরকারি শিশু হাসপাতালে ২৪, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৪, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৩, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৫৪ এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১৪ জন। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ২৪৯ জন ভর্তি আছে এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি আছে ৮৫৮ জন।

ঢাকা শহর ব্যতীত ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ২১৯, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫২, খুলনা বিভাগে ১৪৫, রংপুর বিভাগের ৩১, রাজশাহী বিভাগে ৯৫, বরিশাল বিভাগে ১৫৫, সিলেট বিভাগে ১৫ ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৪৬ জন ভর্তি হন।

চলতি বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৫৪ হাজার ৭৯৭ জন। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে রয়েছে ৬ হাজার ৭৩৩ জন। চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে ৪৮ হাজার ২৪ জন। আক্রান্তদের মধ্যে শুধু ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছে ৩৩ হাজার ৫২৪ জন। হাসপাতালে আছে ৩ হাজার ৪১৯ জন।

আর বাড়ি ফিরেছে ২০ হাজার ৬৬ জন। শুধু বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ১৫ হাজার ১৫৪ জন। এদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে আছে এক হাজার ১২২ জন। আর বাড়ি ফিরেছে ১৩ হাজার ৯৯৯ জন। ঢাকার বাইরে এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে ২১ হাজার ২৭৩ জন। এদের মধ্যে এখনো আছে তিন হাজার ৩১৪ জন। আর বাড়ি ফিরেছে ১৭ হাজার ৯৫৮ জন।

শুধু আগস্ট মাসের ১৯ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৩৬ হাজার ৩৩৬ জন। চলতি মাসে সরকারি হিসেবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১০ জন মারা গেছে। জুলাই মাসে ১৬ হাজার ২৫৩ জন আক্রান্ত হয়ে ২৪ জন মারা গেছে। জুনে ১ হাজার ৮৮৪ আক্রান্ত হয়ে চারজন মারা যায় এবং এপ্রিল মাসে ৫৮ আক্রান্ত হলেও দুইজন মারা যায়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত