শিরোনাম

বাড়িভাড়ায় স্বেচ্ছাচারিতা ভাড়াটিয়াদের কথাও ভাবতে হবে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০১:০২, মার্চ ১৩, ২০১৯

রাজধানী ঢাকায় আবাসন সংকট নতুন কিছু নয়। এ সংকটের শুরু স্বাধীনতার পর থেকেই। স্বাধীনতার পর ঢাকার গুরুত্ব বেড়ে যায় বহুলাংশে। প্রাদেশিক রাজধানী থেকে একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীতে ঢাকার রূপান্তর তাই নানাদিকে প্রভাব ফেলে। সঙ্গত কারণেই ঢাকা হয়ে ওঠে ব্যস্ত নগরী। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের হেড কোয়ার্টার স্থাপিত হয় ঢাকায়। ফলে ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে দ্রুত। একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটায় লোকজনও বাড়তে থাকে। এসব মানুষের বসবাসের জন্য প্রয়োজন হয় বাসস্থানের। কিন্তু জনসংখ্যা অর্থাৎ ঢাকায় বসবাসকারীদের সংখ্যা বাড়লেও সেভাবে বাড়েনি আবাসন। আবাসনের এই সংকটকে পুজি করে বাড়িওয়ালারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন ইচ্ছে মতো বাড়িভাড়া আদায় করে।রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা সোয়া কোটি। এর ৮০ শতাংশেরই নিজস্ব আবাসনের ব্যবস্থা নেই। থাকতে হয় ভাড়া বাড়িতে। আর সেখানেই বিপত্তি। চাকরিজীবীদের অনেককেই বেতনের অর্ধেকের বেশি দিয়ে দিতে হয় বাসাভাড়া হিসেবে। গত দশ বছরে এ বাড়িভাড়া কতটা বেড়েছে তা যারা ভাড়া দিয়ে থাকেন তারাই বোঝেন। এই সময়ের মধ্যে কোথাও কোথাও বাড়িভাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়েছে। অথচ যারা এসব বাড়িতে ভাড়া থাকেন তাদের আয়-রোজগার সেভাবে বাড়েনি। ভূক্তভোগীদের অভিযোগ- ভাড়া নিতে গেলে বাড়িওয়ালা যা হাঁকবেন তাই দিতে হয়। হয় ভাড়া নিন, না হয় বিদায় হন। তার ওপর বছর না ঘুরতেই বাড়িয়ে দেওয়া হয় ভাড়া। বেড়ে যায় সার্ভিস চার্জের অঙ্ক। অনেক বাড়িতে ভাড়াটিয়াদের জন্য বিদ্যুতের আলাদা মিটার থাকে না। তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার অভিযোগও রয়েছে। পানির জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে। দিনে একবারের বেশি পানি অনেক বাড়িতেই দেয়া হয় না। ভাড়াটিয়ারা সবকিছু সহ্য করে থাকতে বাধ্য হয়। কারণ প্রতিবাদ করলেই তাদের বাড়ি ছেড়ে দিতে বলা হয়। বাড়িওয়ালাদের এমন স্বেচ্ছাচারিতা ঠেকাতে সরকার, সিটি কর্পোরেশন বা অন্য কোনো সংস্থার কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে।দেশে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন বলে একটি আইন আছে; যেটি ১৯৯১ সাল থেকে কার্যকর। কিন্তু সেটার অবস্থা হয়েছে- ‘কাজীর গরু খাতায় আছে’ গোয়ালে নাই’-এর মতো। আইনজ্ঞরা বলছেন যে, বিদ্যমান আইনটির কিছু ত্রুটি থাকায় তা যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না। সিটি কর্পোরেশন এলাকাভিত্তিক ভাড়ার একটি তালিকা করে দিয়েই খালাস। নাগরিকগণ সে তালিকা অনুযায়ী ভাড়া সুবিধা পাচ্ছে কি না তার কোনো খোঁজ তারা রাখেন না। আর তা কোনো বাড়িওয়ালাই মানে না। মানানোর জন্য সিটি কর্পোরেশনের কোনো উদ্যোগও নেই। এমনকি সিটি কর্পোরেশনে ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ পেশ করারও কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। থানায়ও প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা নেই। আদালতে যাওয়া যায়, কিন্তু অনেকেই ঝামেলার কথা বিবেচনা করে চুপ থাকেন। আবার বাড়িওয়ালার রোষানলে পড়ার কিংবা নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে অনেক ভাড়াটিয়া প্রতিবাদ করেন না। খুব বেশি অসহ্য হয়ে উঠলে বেশিরভাগ ভাড়াটিয়া নীরবে বাড়ি ছেড়ে দেন। আবার অনেক ভাড়াটিয়া জানেনও না কোথায় কীভাবে প্রতিকার চাওয়া যায়। অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ানো হলে আদালতে ভাড়া নিয়ন্ত্রক বরাবরে দরখাস্ত দেওয়া যায়। আদালতের আদেশ নিয়ে আদালতেই ভাড়া জমা দেওয়া যায়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেও অভিযোগ নেয়া হয় এবং সেখানে বর্তমানে অনেকেই যাচ্ছেন অভিযোগ নিয়ে। দ্রুত সমাধানও করা হচ্ছে।কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কয়েক বছর আগের এক হিসাব অনুযায়ী ২৬ বছরে ঢাকায় বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩৮৮ শতাংশ। সে অনুযায়ী চাকরিজীবীদের, বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কতটা বেড়েছে? বেসরকারি চাকরিজীবীদের ‘উপরি আয়ের’ সুযোগও তো নেই। তারা চলবে কীভাবে? নিম্ন-আয়ের মানুষের দুর্ভোগ আরও বেশি। বস্তির একটি খুপড়িঘরের ভাড়াও কয়েক হাজার টাকা। এরা কি এ দেশের নাগরিক নয়? তাদের দুর্ভোগ দেখা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? আমরা চাই, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ও ভোক্তা অধিকার আইন দ্রুত সংশোধন করে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হোক। সিটি কর্পোরেশন প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিক। একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সমাজে এমন নৈরাজ্য চলতে পারে না। বাড়িওয়ালারা ভিন গ্রহ থেকে আসেনি। তারাও এ দেশের নাগরিক এবং সরকার ও বিধিবদ্ধ সংস্থা কর্তৃক প্রণীত আইন মানতে বাধ্য। তাহলে তারা কেন এমন বল্গাহীনভাবে বাড়িভাড়া বাড়িয়ে চলেছে তা ভেবে দেখা দরকার। স্বল্প আয়ের মানুষদের বাড়িভাড়ার যাঁতাকল থেকে বাঁচাতে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে দেশবাসীর প্রত্যাশা সেটাই।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত