শিরোনাম

গানের মানুষ সুবীর নন্দীর প্রতি শ্রদ্ধা

প্রিন্ট সংস্করণ॥মোমিন মেহেদী  |  ০৩:৫৩, মে ১৪, ২০১৯

গানের সুরে সুরে আর মুগ্ধতা ছড়াবেন না তিনি। ভালোবাসার গান, ভালোলাগার গানের রাজত্বে তিনি ছিলেন নিবেদিত থাকা আলোর মানুষ। অর্ধশতকের সংগীত জীবনে বাংলা গানের ভুবনে বহু জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে চিরবিদায় নিলেন কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী। সুবীর নন্দীর দরদী কণ্ঠে ‘দিন যায় কথা থাকে’ ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’ ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’র মতো বহু গান শ্রোতার হূদয়ে অমর হয়ে থাকবে।

১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার নন্দীপাড়ায় সুবীর নন্দীর জন্ম। বাবার চাকরি সূত্রে তার শৈশব কেটেছে চা বাগানে। পরিণত বয়সে গানের পাশাপাশি চাকরি করেন ব্যাংকে। প্রাইমারিতে পড়ার সময় মা পুতুল রানীর কাছে সংগীতের হাতেখড়ির পর ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নেন সুবীর নন্দী। সিলেট বেতারে তিনি প্রথম গান করেন ১৯৬৭ সালে। এরপর ঢাকা রেডিওতে সুযোগ পান ১৯৭০ সালে। রেডিওতে তার প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্লেব্যাকে আসেন সুবীর।

১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় আজিজুর রহমানের অশিক্ষিত। সেই সিনেমায় সাবিনা ইয়াসমিন আর সুবীর নন্দীর কণ্ঠে ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠের রোমান্টিক আধুনিক গান ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘আশা ছিল মনে মনে’ ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’ ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়া’, ‘তুমি এমনই জাল পেতেছ’ ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’ ‘কতো যে তোমাকে বেসেছি ভালো’ ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’ ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’ ‘একটা ছিলো সোনার কইন্যা’ ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’র মতো গানগুলো সুবীর নন্দীকে পৌঁছে দিয়েছে ভক্ত-শ্রোতাদের হূদয়ে।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আড়াই হাজারের বেশি গানে কণ্ঠ দেয়া সুবীর নন্দী চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও চারবার বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন। সংগীতে অবদানের জন্য এ বছরই তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে সরকার। তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ বাজারে আসে ১৯৮১ সালে। ‘প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘ভালোবাসা কখনো মরে না’, সুরের ভুবনে, ‘গানের সুরে আমায় পাবে’ ছাড়াও ‘প্রণামাঞ্জলি’ নামে একটি ভক্তিমূলক গানের অ্যালবাম রয়েছে তার।

‘ও আমার উড়াল পঙ্খী রে যা যা তুই উড়াল দিয়া যা’ উড়াল দিয়েই চলে গেলো চারবার পুরস্কার পাওয়া কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর প্রাণপাখি। তার গানের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ১০টি গান হলো- ও আমার উড়াল পঙ্খী রে: ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘ও আমার উড়াল পংখী রে’। দিন যায় কথা থাকে: ১৯৭৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিন যায় কথা থাকে’ সিনেমার শিরোনাম গানটি সুবীর নন্দীকে এনে দেয় তুমুল জনপ্রিয়তা। ও মাস্টার সাব: ১৯৭৮ সালে কালজয়ী বাংলা সিনেমা ‘অশিক্ষিত’-এর বিখ্যাত ‘ও মাস্টার সাব আমি দস্তখত শিখতে চাই’ গানটি ছিলো সুবীর নন্দীর কণ্ঠের অন্যতম জনপ্রিয় গান।

পাখি রে তুই দূরে থাকলে: ‘লাল গোলাপ’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘পাখি রে তুই দূরে থাকলে কিছুই আমার ভালো লাগে না।’ কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো: ১৯৮৬ সালে ‘উছিলা’ সিনেমায় গাওয়া ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’ সুবীর নন্দীর জনপ্রিয়তা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই: ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’ও জনপ্রিয়তা পায় সমান তালে। তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে: ‘শুভদা’ সিনেমায় গাওয়া ‘তুমি এমনই জাল পেতেছো সংসারে’ গান সুবীর নন্দীকে এনে দেয় দ্বিতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। একটা ছিলো সোনার কন্যা: ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমার আরেক জনপ্রিয় গান ‘একটা ছিলো সোনার কন্যা’ গানটি সুবীর নন্দীকে তৃতীয় জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়।

বন্ধু হতে চেয়ে তোমার: ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম’ সুবীর নন্দীর আরেকটি জনপ্রিয় গান। কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়: সুবীর নন্দীর জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’ গানটি। কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার মত অবিরত গানে গানে নিবেদিত থাকা আলোর মানুষ, ভালোর মানুষ, সঙ্গীতের মানুষ সুবীর নন্দী প্রসঙ্গে বলেছেন, আমাদের সাংস্কৃতিক জগৎটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক গুণী মানুষ চলে যাচ্ছেন। এটা সত্যিই মেনে নেয়ার মতো নয়। মাত্র দুদিন আগেও তিনি চোখ মেলে তাকিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও চলে গেলেন। আমরা একেবারেই শূন্য হয়ে যাচ্ছি। সুবীর দার (সুবীর নন্দী) সঙ্গে আমার বহু বছরের পরিচয়। অনেক সিনেমায় আমরা যেমন গান গেয়েছি, আবার অনেক রিয়েলিটি শোতে একসঙ্গে বিচারকের ভূমিকায়ও কাজ করেছি।

খুব ভালো এবং সাদা মনের একজন মানুষ ছিলেন তিনি। আমাদের ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও তিনি অংশগ্রহণ করতেন। প্রাণ খুলে কথা বলতেন। কিন্তু সেই প্রাণ খোলা হাসির মানুষটি চলে গেলেন! আমাদের আলো দেখিয়ে সামনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন একের পর এক। এটা আমাদের জন্য সত্যিই অনেক কষ্টের বিষয়। সুবীর দার সঙ্গে সর্বশেষ চাষী নজরুল ইসলামের ‘দেবদাস’ সিনেমায় মোহাম্মদ রফিকুজ্জামানের কথায় ও খন্দকার নূরুল আলমের সুর সঙ্গীতে ‘বলো কে বা শুনেছে এমনও পীরিতের কথা’ গানে কণ্ঠ দিয়েছিলাম।

খুব মজা করে গানটি গেয়েছিলাম সেদিন। শেষবার অসুস্থ হওয়ার আগে তিনি আমার বাসায় এসেছিলেন। আমিই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তার সঙ্গে আরও অনেক শিল্পী এসেছিলেন সেদিন। আমার বাসায় আসার পর সেদিন তাকে দেখে মনে হয়নি এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। ওই দিন অন্য শিল্পীরাসহ আমরা একসঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। সঙ্গীত নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনাও হয়েছিলো। গান গেয়েও শুনিয়েছেন তিনি আমাদের। খাবারের প্রতি আগ্রহ ছিলো তার। বিশেষ করে বিভিন্ন রকম ভর্তা, ভাজি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতে পছন্দ করতেন তিনি। সেদিনের দেখাই যে তার সঙ্গে শেষ দেখা হবে সেটা কল্পনাও করিনি।

বিভিন্ন সময় গান করতে গিয়ে সুবীর দার সঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি। অনেক রকম কথা হতো আড্ডায়। সঙ্গীত নিয়ে তিনি অনেক ভাবতেন। একটু চঞ্চল রকমের মানুষ ছিলেন, সবার সঙ্গেই মিশতে চাইতেন। মনের মধ্যে কোনো অহংবোধ ছিলো না তার। তাকে সাদা মনের মানুষ বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। কখনও যদি টিভিতে লাইভ প্রোগ্রামে থাকতেন তিনি আগেই আমাদের জানাতেন। দেখার কথা বলে মেসেজ দিতেন। এ বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগতো। সুবীর দা বিভিন্ন আয়োজনে ‘পাখিরে তুই দূরে থাকলে কিছুই আমার ভালো লাগে না’ গানটি প্রায়ই আমাদের গেয়ে শোনাতেন। তার পি য় একটি গান ছিলো এটি। আড্ডায় প্রায়ই তার স্ত্রীর প্রশংসা করতেন।

বছরজুড়েই তিনি তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রিয় স্থানে ঘুরে বেড়ানোর চেষ্টা করতেন। উপলদ্ধি তার এমনই ছিলো যে, জীবন তো একটাই, কাজের ফাঁকে ফাঁকে জীবনটাও উপভোগ করতে হবে। নবীন শিল্পীদের উদ্দেশে তিনি প্রায়ই বলতেন, একদিন বা অল্পদিন টিকে থাকার জন্য নয়, আজীবন টিকে থাকার জন্য তোমরা সঙ্গীতচর্চা করবে। এ জন্য একনিষ্ঠ সাধনার প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। কারণ গান অনেক অনেক সাধনার বিষয়। সুবীর দার এভাবে চলে যাওয়া সঙ্গীতের জন্য অনেক বড় ক্ষতি। এক এক করে কয়েকজন চলে গেলেন। সঙ্গীতাঙ্গনে যে কি হবে বুঝতে পারছি না। নিজের কাছেও খারাপ লাগছে খুব। মানতে পারছি না সুবীর দা আমাদের সামনে আর গান করবেন না। তবে তিনি যে সৃষ্টি রেখে গেছেন তাতে সারা জীবন মানুষ তাকে মনে রাখবে। কোটি কোটি শ্রোতা হূদয়ে আসন পেতে থাকবেন তিনি। সুবীর দা বেঁচে থাকবেন তার অগণিত শ্রোতাপ্রিয় গানের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

তোমাকে বেসেছি ভালোর মতো কালজয়ী সব গান। তার কণ্ঠেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষ শুনেছে ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়, তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়’। সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেলো। লাখো ভক্তের বুকে পাহাড়সম বেদনা দিয়ে তিনি হারিয়ে গেলেন। দু’চোখে ছল ছল পানি আর পাথরের মতো ব্যথা নিয়েই তাকে জানাতে হলো বিদায়। এই বিদায়ের সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি স্ত্রী পূরবী নন্দী, মেয়ে ফাল্গুনী নন্দীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব, ভক্ত, শুভাকাঙক্ষী রেখে গেছেন। সুবীর নন্দী ‘মহানায়ক’, ‘শুভদা’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘মেঘের পরে মেঘ’ ও ‘মহুয়া সুন্দরী’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

২০১৯ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আড়াই হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। তিনি শুধু সঙ্গীতশিল্পী নন, অসংখ্য গানের গীতিকার ও সুরকার তিনি। এমন নিবেদিত গানের মানুষ সঙ্গীতাঙ্গনে আর হবে কি না তা নিয়ে যেমন সন্দেহ আছে; তেমন রয়েছে তার প্রতি আমাদের অনেক দায়বদ্ধতা। সেই আলোকে সুবীর নন্দীর মত গুণী শিল্পীর জন্য চাই- স্মৃতি জাদুঘর; চাই সুবীর নন্দী সঙ্গীত বিশ্ববিদ্য্যলয়ও। যা তার স্বপ্ন ছিলো বলে বিভিন্ন সময় আলোচনায় অনেকবার বলেছেন। আর তা কানে বাজছে...।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত