শিরোনাম

ধানের মূল্য কম ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০৩:৪৬, মে ২৩, ২০১৯

বাম্পার ফলন হওয়ায় ধান-চালের দাম তথা বাজার নিয়ে মধুর একটা বিতর্ক চলছে দেশে। সরকার থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী শ্রেণী, চাতাল মালিক, মধ্যস্বত্বভোগী এমনকি কৃষক শ্রেণির প্রতিনিধিও বাদ যাচ্ছে না ধান-চালের দাম নিয়ে মতামত দিতে। এতে সর্বশেষ যোগ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও চাল রফতানি করা হবে কৃষকের স্বার্থে। কেননা, বাঁচাতে হবে তাদের। কৃষক যাতে ধানের ন্যায্য দাম পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবে অর্থনীতিবিদরা চাল রফতানির বিরুদ্ধে।

কেননা, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে চালের দাম কম। তদুপরি রফতানি প্রক্রিয়ায় কৃষকের কোনো অংশগ্রহণ নেই। বরং এর সঙ্গে জড়িত আমদানি-রফতানিকারক, চাতাল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। বরাবর লাভবান হন তারাই।

দেশের অভ্যন্তরে ধান-চালের দাম বাড়াতে সরকার চাল আমদানি বন্ধ না করে শুল্ক বাড়ানোর কথাও ভাবছে। বর্তমান ২৮ শতাংশের স্থলে ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা ভাবা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে সরকারি ধান-চাল ক্রয়ের অভিযান। সবচেয়ে ভাল হয় সরকার যদি সংগ্রহ মূল্য কিছুটা বাড়িয়ে সরাসরি ধান-চাল কিনে কৃষকের কাছ থেকে। তাতে উপকৃত হবে কৃষক। বর্তমানে গ্রাম-গঞ্জে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার শ’ থেকে পাঁচ শ’ টাকায়।

অথচ একজন ধান কাঁটা শ্রমিকের মজুরি দৈনিক ৮৫০ টাকা, তাও প্রায়ই পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ আছে। বীজধান, সার, কীটনাশক, সেচ বাবদ বিদ্যুৎ-ডিজেল ইত্যাদিতে সরকারি প্রণোদনা সত্ত্বেও বাস্তবতা এই যে, সার্বিকভাবে উৎপাদন বাড়ায় বর্তমানে কৃষককে প্রতিমণ ধানে লোকসান গুনতে হচ্ছে গড়ে দেড় শ’ থেকে দু শ’ টাকা।

ধানের দাম না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে পাকা ধানক্ষেতে নিজ হাতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে। ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বহু সংখ্যক কৃষকের আত্মহত্যার কথা প্রায়ই প্রকাশিত হয়ে থাকে ভারতের গণমাধ্যমে।

অনুরূপ অবস্থা আমাদের দেশেও ঘটুক, আমরা তা চাই না কোনো অবস্থাতেই। সরকার অবশ্য সমস্যাটি সম্পর্কে সম্যক সচেতন বলেই প্রতীয়মান হয়। খাদ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে ১০-১৫ লাখ টন চাল বিদেশে রফতানির চিন্তা ভাবনা চলছে বলে জানিয়েছেন।

কৃষককে ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য অন্তত দু’মাস ধান ঘরের গোলায় ধরে রাখারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, গরিব কৃষক ধান ঘরে রাখবে কিভাবে? তার তো ধান বেচেই সংসার চালাতে হয়, নগদ মূল্যে কিনতে হয় নিত্যপণ্য।

সরকার তথা খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকেও স্বীকার করা হয় যে, তারা সরাসরি মাঠপর্যায়ের কৃষকদের থেকে ধান-চাল কিনতে পারে না। এর সুবিধা নিয়ে থাকে ধান-চাল ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। ফলে সরাসরি ধান-চালের ন্যায্য মূল্য কৃষকের হাতে তুলে দেয়ার বিষয়টি একটি দূরতিক্রম্য বাধা বটে।

এই সমস্যার সমাধানের সূত্র খুঁজে বের করতে হবে সরকারকেই। এর পাশাপাশি বর্তমান সঙ্কট উত্তরণে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাড়াতে হবে সরকারি গুদামের মজুদ। মনে রাখতে হবে যে, কৃষক না বাঁচলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ।

বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। উন্নতমানের প্রযুক্তি, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে এই উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়। এর পাশাপাশি নজর দেয়া উচিত বিভিন্ন ও বহুমুখী খাদ্যশস্য উৎপাদন এবং সংরক্ষণে।

সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো সব মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদেরও উচিত হবে জনসাধারণ এবং সরকারকে জিম্মি কিংবা কারসাজি করে নয়, বরং আস্থায় নিয়েই ব্যবসা করা।

তদুপরি দেশে ধান-চাল-পাটসহ কৃষিজাত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার জন্য তৃণমূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত একটি আধুনিক ও সমন্বিত মার্কেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি এবং অপরিহার্য। তা না হলে উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্যদ্রব্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে বাংলার কৃষকসমাজ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত