শিরোনাম

ভৌগোলিক কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে দেশ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ০২:০৪, জুন ২১, ২০১৯

গত দুই তিন বছর ধরে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৪ থেকে ৫ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের মতে, ভূতাত্ত্বিকভাবেই এ অঞ্চল এখন ভূমিকম্প ঝুঁকিতে আছে। তবে এতে আতঙ্কিত না হয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্তুতি নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলেন, আমাদের এখানে টেকটনিক প্লেট আছে। সেখানে মাঝে মাঝেই সংঘর্ষ হয়। পুরো বাংলাদেশ ঝুঁকির মধ্যে আছে। আমাদের উচিত সতর্ক থাকা। বুয়েট বলছে, প্রস্তুতি হিসেবে প্রথমেই পুরানো ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনীয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি মাটির গুণাগুণ যাচাই করে নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশী রড ব্যবহারসহ ভূমিকম্প সহনীয় করা অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বিশেষ করে পিলারে রডের শেষ ও শুরুর অংশে এবং বিমের পুরো অংশে বেশি করে রড দিলে ভূমিকম্পের সময় ভবনগুলো মচকাবে কিন্তু ভেঙে পড়বে না। উদাহরণ হিসেবে তারা জাপানের ভবন নির্মাণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরামর্শ দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে ভবনের রড এমনভাবে দিতে হবে যেনো তা দুলবে কিন্তু ভেঙে পড়বে না। প্রতি স্কয়ার ফিটে ৫০ থেকে ৬০ টাকা খরচ করলেই মজবুত করে বানানো সম্ভব।

ভূমিকম্পের পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমাতে সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষিত করারও পরামর্শ দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি নির্ভর করে সেখানকার আবাসন ব্যবস্থা কেমন সেখানকার রাস্তাঘাট কেমন যে স্থাপনাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো সংস্কার করা।

যারা বিল্ডিং কোড অনুসরণ করেনি তাদের চিহ্নিত করা উচিত। নিয়ম মেনে ভবন নির্মাণ ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতির কারণে ২০১০ সালে চিলিতে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পরও মারা গিয়েছিলো মাত্র ৫০০ মানুষ। যেখানে একই বছর প্রস্তুতির অভাবে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্পে হাইতিতে নিহত হয়েছিলো তিন লাখের বেশী। বাংলাদেশে দিন দিন ভূমিকম্পের প্রবণতা বেড়েই চলছে।

তবে ভূমিকম্পের প্রবণতা বাড়লেও নেই সে অনুযায়ী প্রস্তুতি। এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে এক ভয়ংকর তথ্য। তাদের মতে, দেশের ৬০ শতাংশ ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। ছোট ছোট ভূমিকম্পকে বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস আখ্যায়িত করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন প্রস্তুতিই জরুরি।

পুরনো ভবন সংস্কার করার পাশাপাশি বুয়েটের স্থপতিরা বলছেন, বেশী রড দিয়ে নতুন ভবনের পিলার ও বিম এমনভাবে বানাতে হবে, যেটা মচকাবে কিন্তু ভাঙবে না। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। সেই ভূমিকম্পের তীব্রতা হতে পারে রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার।

এতে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশসহ আশপাশের অঞ্চলের ১৪ কোটি মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে রাজধানী ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের একদল গবেষকের তৈরি করা এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নেচার জিওসায়েন্স জার্নালে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কবে নাগাদ বড় ধরনের ভূমিকম্পটি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা না গেলেও বাংলাদেশ অঞ্চলের নিচে দুটি গতিশীল ভূগাঠনিক প্লেট পরস্পরের ওপর চেপে বসতে থাকায় সেখানে শক্তিশালী ভূমিকম্পের শক্তি জমা হচ্ছে। গবেষকদলের প্রধান নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ মাইকেল স্টেকলার টমসন রয়টার্সকে বলেন, ওই ধরনের ভূমিকম্প কবে ঘটতে পারে, সেই পূর্বাভাস আরো গবেষণা না করে দেয়া সম্ভব নয়।

গবেষকদলের অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। ভূতাত্ত্বিক ও ভূগাঠনিক কারণে আমরা ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে রয়েছি। শুধু ভূমিকম্পই নয়, সুনামির ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষ করে দুটি ফল্টে যেভাবে শক্তি জমাট হচ্ছে, তা যেকোনো সময় ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে ঘন ঘন মৃদু, হালকা ও মাঝারি ভূকম্পন অনুভূত হচ্ছে।

এগুলোর কোনোটির উৎস বাংলাদেশের কাছে-কিনারে; আবার কোনোটি বহু দূরে। ভূকম্পনের কারণে এ অঞ্চলের ভূ-ফাটল লাইনগুলো নাজুক ও শিথিল হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশেই রয়েছে ১২টি ফাটল। টাঙ্গাইলের ফাটলটি খুবই বিপদজনক। ফলে জোরালো ভূমিকম্পের কারণ তৈরি হচ্ছে।

রিখটার স্কেলে ৮ কিংবা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে নেমে আসতে পারে মহাবিপর্যয়। মুহূর্তেই রাজধানী ঢাকা অথবা কোনো একটি জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। জানা গেছে, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহের মতো জনবহুল শহরগুলো বেশি ঝুঁকিতে আছে।

এসব শহরে আকস্মিক আঘাত হানা ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় বেশি হতে পারে। ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, সামপ্রতিককালে ভূকম্পন প্রবণতা বেড়ে গেছে। এ ধরনের ঘন ঘন মৃদু, হালকা কিংবা মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন অদূর ভবিষ্যতে বড় আকারের ভূমিকম্পের অশনি সংকেত।

বাংলাদেশ এবং এর সংলগ্ন ভারত ও মিয়ানমারের অবস্থান ভূমিকম্পের বলয়ে। এ অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে যে কোনো সময়ই। অথচ ভূমিকম্প নিয়ে ভয়-আতঙ্ক থাকলেও উপযুক্ত সতর্কতা ও পূর্বপ্রস্তুতির দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পেছনে পড়ে আছে। আসাম ও মিয়ানমার ভূমিকম্পের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলো আমাদের খুব কাছে। এজন্য আমরাও ঝুঁকিতে আছি। ভূমিকম্পের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস নেই।

৫শ বছরের ভূমিকম্পের ডাটা বিশ্লেষণ করে বলা হচ্ছে, এই অঞ্চল এতটা ঝুঁকিপূর্ণ যে কোনো সময় হতে পারে, এটা মাথায় রেখেই আমাদের কাজ করতে হবে। বাংলাদেশে ভূমিকম্প পরিমাপের জন্য দশটি স্থানে সিসমোমিটার রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো থেকে ২৪ ঘণ্টা ডাটা ঢাকার কেন্দ্রীয় অফিসের সার্ভারে আসতে থাকে।

ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং মিয়ানমার টেকটনিক প্লেটের মধ্যে অবস্থান করছে। ভারতীয় এবং ইউরেশীয় প্লেট দুটি (১৯৩৪ সালের পর থেকে) দীর্ঘদিন যাবত হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে আছে। বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা বা ফল্ট জোন সচল অবস্থায় রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, পার্বত্য সীমান্ত আর সিলেট অঞ্চলের ভূঅভ্যন্তরে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে। যেখানে ভূমিকম্প হলে সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়ময়নসিংহসহ জনবহুল শহরগুলোতে বড় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। ইন্ডিয়ান, ইউরোপিয়ান এবং বার্মিজ এই তিনটি গতিশীল প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। আর এগুলোর মধ্যে সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তের ভূঅভ্যন্তরে যে শক্তি সঞ্চিত হয়েছে তা বড় মাত্রার ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।

তাতে দেখা যায় যে, আগামীতে যদি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তাহলে তিন লাখ ২৬ হাজার ভবনের মধ্যে ৭২ হাজার ভবন তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়বে। একেবারে অক্ষত থাকবে খুব কম সংখ্যক ভবন। এ ছাড়া গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। ঘটবে মানবিক বিপর্যয়ও।

এই দুর্যোগের জন্য আমাদের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়। প্রথমত, ভূমিকম্পে যারা গৃহহীন হবেন তাদের আশ্রয় দেয়ার মতো খালি জায়গা নেই ঢাকায়। উদ্ধার কাজের জন্য দক্ষ জনবল এবং যন্ত্রপাতি নেই। নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা। তাছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতাও নেই।

তাই ভূমিকম্পের সময় কী কী করণীয় সে সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। অপরদিকে ন্যাচার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত এক জার্নাল থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের ভূপৃৃষ্ঠের নিচে সম্ভবত বড় ধরনের ভূমিকম্প দানা বাঁধছে। ভূমিকম্পটি খুব দ্রুত ঘটার আশঙ্কা না থাকলেও সেটা অবশ্যম্ভাবী।

বাংলাদেশের বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, সস্তা নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরি অপরিকল্পিত ভবনসহ ভারি শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে ভূমিকম্প নিয়ে আরো বেশি আশঙ্কার কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ের অধ্যাপক ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেছেন, মূল হিমালয়ের প্রধান চ্যুতিটির সঙ্গে দেশের ভেতরেই এখন অন্তত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ চ্যুতি রয়েছে এবং পাঁচটিই সক্রিয়।

এর মধ্যে আগে থেকেই ডাউকি ও মধুপুর চ্যুতি বা ফল্ট নিয়ে ব্যাপক আশঙ্কা ছিল ও আছে। বাকি তিনটি চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা বেল্ট ফল্ট, চট্টগ্রাম-রামরী ফল্ট ও সিলেট-আসাম ফল্টও সক্রিয়। একই সঙ্গে আরো ছোট ছোট ১৩টি ফাটলের অস্তিত্বও নিশ্চিত হওয়া গেছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই। ছোট ফাটলগুলো থেকেই ৬.৫ থেকে ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। আর বড় ফাটল থেকে হতে পারে আরো শক্তিশালী ভূমিকম্প।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঢাকায় যেভাবে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে নগরায়ণ হচ্ছে, বাড়িঘর ও ভবন উঠছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো ভবনগুলো বহাল রয়েছে তাতে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে দেশের ভেতরে না হয়ে পার্শ্ববর্তী কোথাও শক্তিশালী ভূমিকম্প হলেও এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।

লেখক : কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত