শিরোনাম

কুল বাকা গাঙ বাকা বাকা গাঙের পানি

প্রিন্ট সংস্করণ॥অ্যাড. রোকনুজ্জামান খান  |  ০৯:৫৬, জুলাই ০৩, ২০১৯

বরগুনায় রিফাত নামক এক যুবককে প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটিকে খুবই দুঃখজনক উল্লেখ করে আসামিরা যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের আইজিপি বরগুনার এসপি, ডিসি-কে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনার পর গত বৃহষ্পতিবার বিচারপতি এফ.আর.এম. নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে.এম. কামরুল কাদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্দেশ্য আইজিকে বলেন আসামিরা যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারে। বর্ডার ক্রস করতে না পারে। এ জন্য সীমান্তে রেড এলার্ট জারী করতে বলেন।

আদালত তার অবজারভেশনে বলেন, ‘প্রকাশ্য রাস্তায় মানুষটিকে মারলো। একজন ছাড়া কেউ এগিয়ে আসলোনা। ডিভিও করলো কিন্তু কেউ এগিয়ে আসলো না এটি জনগণের ব্যর্থতা। এই সামাজিক সচেতনতা তৈরি করবে কে? দাঁড়িয়ে দেখেছে, কেউ প্রতিবাদ করলো না।

পাঁচজন মানুষ অন্তত এগিয়ে আসলে তারা হয়ত সাহস পেত না’। মহামান্য হাইকোর্টের এই মন্তব্য একটি জাতির নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ইঙ্গিত বহন করে। (এক) ১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে নবাব সিরাজ-উ-দৌলার নবাবী গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নবাব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। নবীন নবাব প্রথম বারের মত বাংলায় কোম্পানির অবৈধ কার্যক্রমের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তার তিনটি প্রধান অভিযোগ ছিলো। (১) অনুমতি ব্যতিত ফোর্ট ইউলিয়ামে প্রাচীর নির্মাণ ও সংস্কার। (২) ব্যক্তিগত অবৈধ ব্যবসা এবং কোম্পানির কর্মচারীদের দ্বারা দস্তকের নির্লজ্য অপব্যবহার এবং (৩) নবাবের অবাধ্য প্রজাদের আশ্রয় প্রদান।

উল্লেখিত অভিযোগ সমূহের মিমাংসার জন্যে পদক্ষেপ নিতে নবাব ব্রিটিশদের অহবান জানান। কিন্তু ব্রিটিশরা নবাবের এ অভিযোগ সমূহ আমলে না নিয়ে যু্দ্ধ অথবা আত্মসমর্পনের এই দুইয়ের স্পর্শে যেতে বাধ্য করে। রবাট ক্লাইভ মাদ্রাজের ফোর্ট জজ থেকে সৈন্য সামন্ত নিয়ে কলকাতা আগমন করেন এবং যুদ্ধ ঘোষণা করেন। লর্ড ক্লাইড ১৩ জুন সৈন্য সামস্ত নিয়ে মুর্শিদাবাদ অভিমুখে রওনা হন।

১৯ জুন ক্লাইড কাটোয়া পৌছান। স্থানটি আগের দিনই কর্নেল কুট দখল করে নেন। ২১ জুন ক্লাইড সমর পরিষদের সভা ডাকেন। ২২ জুন সকালে ব্রিটিশ বাহিনী ক্লাইডের নেতৃত্বে পলাশীর পথে যাত্রা শুরু করেন।

ইতোমধ্যে নবাব মুর্শিদাবাদ থেকে রওয়ানা দেন এবং শত্রু মোকাবিলার জন্য পলাশীতে শিবির স্থাপন করেন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধ আরম্ভ হয়। মীর মদন, মোহন লাল, খাঁন আ. হাদী, নবসিং হাজারী প্রমুখের অধীনে নবাব সেনারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। অন্যদিকে মীর জাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভের অধীনে নবাবের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সৈন্য নিষ্ক্রিয়ভাবে পুতুলের মত দাঁড়িয়ে থাকে।

যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি আঁচ করতে পেরে লর্ড ক্লাইড কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বেলা ৩টার দিকে কামানের ১টি গোলা মীর মদনকে আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন।

এই মৃত্যুর খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে নবাব বাহিনী হতভম্ব হয়ে দিক বিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। ফলে ইংরেজ বাহিনী নতুন করে আবার অক্রমন শুরু করলে বিকাল ৫টা নাগাদ পলাশী প্রান্তর ইংরেজদের সম্পূর্ণ দখলে আসে।

ডুবে যায় বাংলার স্বাধীনতার সুর্য। যুদ্ধের সময় পলাশীর অস্ত্র-আম্র কাননের পাশেই স্থানীয় বেলেডাঙ্গা গ্রামের কৃষকরা ধান কাটছিলো। তারা নিজেদের মধ্যে খোষ গল্পে মসগুল ছিলো। কেউ কেই আবার ধুয়া গান গাচ্ছিলো। তারা আরো মন্তব্য করছিলো যে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে, তাতে আমদের কী। বেলায় বেলায় ৪ বিঘা জমির ধান কেটে বাড়ি যেতে চাইলে কামানের আওয়াজ গুনে আমাদের-কী লাভ ! ইংরেজরা যুদ্ধে জয়ী হলে আমাদের কী ক্ষতি। উৎসক কৃষকরা সেদিন কান পেতে যুদ্ধের আওয়াজ শুনছিলো।

তারা বাঙালি। দেশপ্রেম সেদিন ও তাদেরকে এতটুকু স্পর্শ করতে পারে নাই। পুতুলের মত দাঁড়িয়ে থাকা সিপাহীরা আর বেলেডাঙ্গা গ্রামের ধান কাটতে থাকা কৃষকরা পলাশীর যুদ্ধকে পরম আনন্দে উপভোগ করছিলো।

যুদ্ধ উপভোগ করা, সতীর্থদের সাহায্য না করা, জাতীয়তা বোধে উদ্বুদ্ধ না হওয়া, দেশের প্রতি চরম মমত্যবোধ না থাকা এবং জাতিস্বত্তায় বিকশিত না হওয়া বাঙালি জাতির কলঙ্কিত ইতিহাসে এক চরম পরাকাষ্ঠা।

ঐতিহাসিকরা বলেন, পলাশী যুদ্ধের পরে বাঙালিরা যখন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মৃতদেহ নিয়ে হাতির পিঠে চড়িয়ে মুর্শিদাবাদের রাস্তায় রাস্তায় উল্লাশ প্রকাশ করছিলো তখন ইংরেজরা ২২০০ বজরা নৌকায় বাংলার ধন দৌলত কলকাতা অভিমুখে পাচারে ব্যস্ত ছিলো।

(দুই) ১৫ আগস্ট ১৯৭৫- এ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়। জাতির রক্তের বদলে পাওয়া জাতির পবিত্র সংবিধান সংশোধন করা হয়।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অবিনাশি চেতনাকে বুকে ধারণ করে বাঙালি জাতি যে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো, স্বাধীনতা নিয়ে এসেছিলো সেদিন আবেগময় ১৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের ভুখণ্ডে।

সেদিন কিছু পথভ্রষ্ট সেনা অফিসার তথাকথিত সামরিক অভ্যূত্থানের নামে শেষ করে দেয়া হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ছিলেন একটি চেতনা, একটি স্বপ্ন, একটি প্রতীক, বাংলার মুক্ত আকাশে এক সু-শীতল ছামিয়ানা। কিন্তু বাঙালিরা সেদিন এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কি ভূমিকা নিয়েছিলেন তা এক কলঙ্কিত ইতিহাস বৈ আর কিছুই নয়।

সেদিনকার বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ করেন নাই। বরং অনেকে উল্লাস প্রকাশ করেছিলো। জাতীয় পর্যায়ে রেডিও টেলিভিশনে শুধু দেশাত্ববোধক গান গেয়ে আর শেখ পরিবার বর্গকে সমূলে হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকাময় বুলেটিন উপস্থাপন করা হয়।

দেশের আবাল বৃদ্ধ জনতা কোথাও কোনো শব্দ করে নাই। শহর বন্দর নগর পল্লী গ্রামে এমনকি জাতির জনকের নিজ জেলা গোপালগঞ্জের টুঙ্গি পাড়ার গ্রামবাসীরাও সেদিন কোনো প্রতিবাদ প্রতিরোধ করে নাই।

স্বাধীন দেশের মহা নায়কের মহাতীরধানে এই জাতি উদ্বেলিত হয় নাই। এতবড় জঘন্য অন্যায় এবং এতবড় নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত এই জাতি বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছে। একেই বলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ !

ধুলিষ্যৎ হলো বাঙালির রক্তের ঐক্য, ভাষার ঐক্য, ধর্মের ঐক্য, এবং ভুখণ্ডের ঐক্য। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি যখন ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গ বিজয় করেন তখন মাত্র ১৭ জন ঘোড় সাওয়ার নিয়ে তিনি বাংলার রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করেন।

রাজা লক্ষন সেন খালি পায়ে পিছন দরজা দিয়ে নৌকা যোগে পূর্ব বঙ্গের সোনার গাঁয়ে পলায়ন করেন। ভীরু কা-পুরুষ বাঙালি হিসাবে তিনি ইতিহাসে আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। তাহলে পলায়নপর মনোভাব কি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ?

(তিন) হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিরাদ, কিষাদ, আলপাইন, ককেশিয়, মঙ্গোলীয়, ইউরিপয়েড, দ্রাবিড়, অদ্রাবিড়, আর্য-অনার্যদের রক্তের কৌমজ স্রোতধারায় স্বজাতি আর বিজাতির বিরহ মিলনের ফলশ্রুতিতে বঙ্গভাগে বসতী স্থাপন করা এই বিশাল জনগোষ্ঠী হচ্ছে আজকের বাঙালি জাতি। মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, আর্য দেবতা দীর্ঘতম নামক ঋষীর কামাচার্যে অতিষ্ঠ হয়ে তার স্ত্রী প্রদেযীর সিদ্ধান্ত এবং শাপে তাকে সাগরে ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

পূর্বে হিমালয়ের পাদদেশে টিসিস নামে এক সাগর ছিলো। ঐ সাগর পাড়েই দৈত্য রাজা বলীর রাজত্ব ছিলো। সকালে বলী রাজার সুন্দরী স্ত্রী সুদেষ্ন্না সখীগণ নিয়ে স্নান করতে গেলে ভেলায় ভাসমান অবস্থায় সুদর্শন আর্য ঋষী দীর্ঘতমাকে ঘাটে ভেলায় ভাসতে দেখতে পান।

এই সংবাদ দ্রুত রাজমহলে পৌছে যায়। তখন মহারাজা দৈতরাজ বলী এবং তার স্ত্রী মিলে উক্ত ঋষীকে রাজদরবারে নিয়ে যান। বলী দম্পতির কোনো সন্তান ছিলো না। স্ত্রী সুদেষ্নার প্রতি কু-দৃষ্টি পড়লো দুশ্চরিত্র আর্য্য ঋষী দীর্ঘতমার। দীর্ঘতমার ঔরশে বলী রাজার স্ত্রী সুদেষ্নার গর্ভে পাঁচটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে।

তাদের নাম রাখা হলো, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুষ্ম এবং পুন্ড্র। এই পাঁচটি সন্তানকে পাঁচটি জনপদের রাজত্ব দেয়া হয়। তারা ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হতো। রক্তের কৌমজ স্রোতধারা তাদেরকে একই জাতীয়তা বোধে উদ্বুদ্ধ করতে পারে নাই। এমন কি ভৌগলিক সীমা রেখার মাধ্যমেও তাদের জাতীয়তা বোধের ঐক্য গঠিত হয় নাই। ফলে বলীর রাজা পাঁচ সন্তানকে পাঁচটি ভূ-ভাগে ভাগ করে দিয়ে প্রথম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূলে আঘাত করেন মহারাজা বলী নিজেই।

আজ বাংলাদেশের সামগ্রিক জনপদ অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, সুষ্ম, এবং পুন্ড্র রাজ্য নিয়ে গঠিত। বঙ্গ অঞ্চলের জনসাধারণ সাগরের জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ হাত উঁচু এবং ত্রিশ হাত চওড়া আইল নির্মাণ করতেন। ফলে বঙ্গ শব্দের সাথে আইল প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বঙাল শব্দের সৃষ্টি হয়। পরে অপভ্রংস রুপে তা বাঙাল শব্দে পরিবর্তিত হয়। এবং বাঙাল শব্দের সাথে ইষ্নিক প্রত্যায় যুক্ত হয়ে বাঙালি শব্দের উৎপত্তি হয়। আজ আমরা সেই বাঙালি।

বেদব্যাস রচিত মহাভারতে ঐ কাহিনী কতটা সত্য তা জানা না গেলেও বাঙালিদের জাতীয়তা বোধে যে কলঙ্ক আছে তা হাজার হাজার বছরের ইতিহাস ঘাটলে তা প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া বাঙালিরা মৎস্য ভোজী।

মাছের শরীরে যে কোষ এবং সেল আছে মৎস্য ভোজী হওয়ার কারণে বাঙালিদের রক্তে মাছের সেল চারিত্রিক গঠনকে নিয়ন্ত্রণ করে। মাৎস্যের ন্যায় চরিত্র এখানে প্রস্ফূটিত। বড় বড় মাছ যেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাছকে গ্রাস করে, জলে অন্য কোনো নিয়ম নাই। জোর যার মুল্লুক তার।

ফলে ন্যায় ধর্ম, শক্তিশালী ঐক্য এবং ঈষ্পাত কঠিন জাতীয়তা বোধ ও দেশাত্বপ্রেম সেখানে নিরর্থক ও উলু খাগড়া ছাড়া আর কিছুই নয়।

লেখক : বিশ্লেষক- কলামিস্ট ও আইনজীবী

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত