শিরোনাম

সরকারি চাকরিতে ডোপটেস্ট বাধ্যতামূলক

প্রিন্ট সংস্করণ॥মোহাম্মদ আবু নোমান  |  ০২:০৩, জুলাই ০৫, ২০১৯

একটি সুখী, সুন্দর সাজানো সংসার ও পরিবার ধ্বংস করতে একজন মাদকসেবী সন্তানই যথেষ্ট। বিভিন্ন পারিবারে অশান্তি সৃষ্টির কারণও এই মাদক। মাদকের কারণে যুবসমাজ দিশা হারাচ্ছে। তরুণরা ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। মাদকাসক্তির বড় শিকার এই তরুণ সমাজ।

দেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি নেশায় বুঁদ হয়ে থাকলে উন্নয়নের চাকা খাদে পড়বে। মাদকের ভয়াবহ থাবায় জাতীয় অস্তিত্ব হুমকির সাথে বিভিন্ন পরিবারে ও সমাজে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও হানাহানির কারণ হয়েছে। মরণ নেশা মাদকের করাল গ্রাসের ছোঁয়ায় চরিত্র নষ্টের সাথে এইচআইভি ও এইডসের মতো ঘাতক রোগের বিস্তার ও আক্রান্ত হয়ে তরুণরা অকালে প্রাণ হারাচ্ছে।

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গত ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, সরকারি চাকরিতে ডোপটেস্ট বাধ্যতামূলক হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি মাদকাসক্ত হন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস (২৬ জুন) উপলক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। পুলিশ, জনপ্রশাসন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের মধ্যে মাদকাসক্ত রয়েছে, এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাদক পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গত ২৫ জুন মন্ত্রণালয়ের নেওয়া এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চাকরিতে ডোপটেস্ট বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন! এই ধরনের পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই!

এ ক্ষেত্রে পিছন ফিরে তাকানো বা দেরি করার মোটেই কোনো সুযোগ ও সময় নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। মাদক নিয়ে সমাজের সর্বস্তরের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার শেষ নেই। আমরা মাদক প্রজন্ম চাই না। আমরা চাই মাদকমুক্ত সুন্দর ও উজ্জ্বল প্রজন্ম। আমরা মাদক নামক ময়লা থেকে পরিষ্কার হতে চাই।

সর্বনাশা মাদকের সর্বগ্রাসী ছোবল থেকে রক্ষা পেতে ডোপটেস্টের মতো একটি কার্যকর, ক্রিয়াশীল, জোরালো ও দুঃসাহসিক পদক্ষেপ অনেক আগেই প্রত্যাশিত ছিলো। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্য মতে, শুধু রাজধানীতেই ইয়াবা ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার।

বেশ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে রয়েছে দুই শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী। এ ছাড়াও বহু আগে থেকেই রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বখে যাওয়া সন্তানরা ‘ইয়াবা ক্লাব’ গঠন করেছে।

ওইসব ক্লাবে দিনে-রাতে তরুণ-তরুণীরা চুর হয়ে থাকে ইয়াবা নেশার আড্ডায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ডোপটেস্টের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছি। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অনুশাসন দিয়েছেন। এটা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে।

সরকারি কর্মকর্তারাও যদি মাদকাসক্ত হন তাহলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় ডোপটেস্ট করা হবে। রক্তে যদি মাদক পাওয়া যায়, যার পরীক্ষার ফলাফল নেতিবাচক হবে, তাহলে তার আবেদন বাতিল বা গ্রহণ করা হবে না।

তিনি চাকরির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন।’ এ সিদ্ধান্ত কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, বা হলেও সঠিকভাবে হবে কি না সেটাই ভাবার বিষয়। তবে শুধু সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময়ই নয়, বেসরকারি চাকরি ও জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগেও প্রার্থীদের ডোপটেস্ট করা বাধ্যতামূলক করা হোক।

সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিবছর এসিআরের সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি ডোপটেস্টও বাধ্যতামূলক করে, মাদক গ্রহণের অভিযোগ পেলেই শাস্তিযোগ্য ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সাথে পর্যায়ক্রমে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, বুয়েটকেও এর আওতায় আনতে হবে। যদি এটা করা যায় তাহলেই মাদকমুক্ত দেশ হবে।

পুলিশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাদক ব্যবসায় ও মাদক সেবনের অভিযোগে গত এক বছরে পুলিশের শতাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কনস্টেবল থেকে শুরু করে পুলিশ পরিদর্শক পদের সদস্যরাই মাদক ব্যবসা এবং মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত।

এছাড়া এএসপি থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও কিছু কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসায় সহায়তা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ যদি নিজেই মাদক সেবন করে, তবে তিনি মাদক বিক্রেতা ও মাদকাসক্তকে সুযোগ-সুবিধা দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। ইতোপূর্বে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, পরিতাপ ও লজ্জার খবর, যা ফাঁস করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম শিকদার।

তিনি বলেছিলেন, ‘শিক্ষার্থীরাই বেশি ইয়াবা সেবন করে’। সমাজবিজ্ঞানীরা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ার জন্য অনেকটা দায়ী করেন আমাদের পরিবার ও সামাজিক পরিস্থিতিকে।

তারা বলেন, আধুনিকতার নামে একটা টিনেজ ছেলে-মেয়েকে অধিক স্বাধীনতা দেওয়া, সন্তানের জন্য চরম সর্বনাশের কারণ? বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন, বেহিসেবী জীবনযাপন কখনোই ভাল কিছু বয়ে আনতে পারেনা, পরিবার থেকে বেশুমার হাত খরচের টাকা পাওয়া ছেলে-মেয়েরাই মাদকের নেশায় বেশি আসক্ত হচ্ছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাদক ব্যবসায়ীদের টার্গেটে পরিণত হওয়ার নেপথ্য কারণ হিসেবে জানা গেছে, সাধারণত ধনাঢ্যদের সন্তানরা ইংলিশ মিডিয়াম ও বেসরকারি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।

এ থেকে আমাদের বাবা-মারও কি কোনো শিক্ষা নেই। সন্তানরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে কিনা এ বিষয়ে খোঁজ-খবর বাড়াতে হবে বাবা-মাকে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলেন, মানসিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত না হলে এমনটা হয়।

এতে করে প্রমাণ হয় আমাদের ভিত্তি ও মূল্যবোধ কতটুকু দুর্বল। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা শুধু মাদকাসক্ত নয়।

তারা চরমভাবে টাকাসক্তও! চাকরি পেতে ডোপটেস্টের শর্তের কারণে আরো একটু খরচ বাড়নো, যোগ্যপ্রার্থী বাদ ও ঘুষ নেয়ার আরো একটা পথ সৃষ্টির কারণ যেন না হয়। যোগ্যপ্রার্থী ঘুষ না দিতে পারলে আনফিট বলে বাদ দেওয়ার সুগম পথ যেন না হয়।

ইতোপূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানানো হয়েছিলো, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন।

বিভিন্ন পেশাজীবীদের মধ্যেও মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে ও কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। চিঠিতে বলা হয়, ডোপটেস্টের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করলে যুবসমাজের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাস্তবেই মাদক ও মাদকাসক্তির মারাত্মক প্রভাব অনেক অপরাধেরও ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। মাদকাশক্তরা চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাসী, ধর্ষণ, রাহাজানি ও ডাকাতির সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে। এক গবেষণায় এসেছে, যদি কোনো দেশে শুধু মাদক বন্ধ করা যায়, তবে সেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ অপরাধ কমে যেতে পারে। মাদকের সঙ্গে যে অপরাধের সম্পর্ক— এ বিষয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। এছাড়াও বিশ্বে যেসব রাষ্ট্রে দুর্নীতি কম, সেখানে মাদকের কারবারও কম।

সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও বিক্রির বিষয়টি উঠে এসেছে।

এর আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক চিকিৎসক নিয়মিত মাদক গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। একটি গোয়েন্দা সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের মাদকাসক্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘কিছুদিন আগে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) নিয়োগের সময় সন্দেহ হওয়ায় ডোপটেস্ট করার পর ১৮ জনকে মাদকাসক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়।

আরও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি ভয়ংকর। দিন দিন এ সংখ্যা বাড়ছে। নিয়োগের সময় এ পরীক্ষা করলে শিক্ষার্থীরা সচেতন হবে, ভীতি তৈরি হবে।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ মাঠপর্যায় থেকে প্রায়ই পাওয়া যায়। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে, তাদেরও ডোপটেস্ট করা হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতিবছর এসিআরের সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি ডোপটেস্টও বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই কর্মকর্তারা।’

দেশের ক্ষমতাসীনরা মাঝে মধ্যেই সুশাসন ও আইনের শাসনের কথা বলেন। সুশাসনতো তাকেই বলে, যে শাসন অপরাধিকে শাস্তি দেয়ার আগেই অপরাধকে নিয়ন্ত্রণ করে। যে শাসন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে সমাজে সুশাসন আশা করা যায় না।

দেশে মাদককারবারির যারা বড় খেলোয়াড়, তারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা যথেষ্ট পরিমাণে পেয়ে থাকেন। মাদকের সমস্যা এক দিনের নয়, অতএব সমাধানও তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে— এমন ভাবনার সুযোগ নেই। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে মাদক নির্মূল করতে চায়, তাহলে একটা সামগ্রিক এবং বহুমুখী পরিকল্পনা তৈরি করে, একটা শক্তিশালী মাদকবিরোধী টাস্কফোর্সের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালুর সাথে মূল্যবোধ, সুনৈতিকতা বিষয়ক উপস্থিত বক্তৃতা, প্রবন্ধ, রচনা, দেয়াল লিখন, পত্রিকা বের করার সাথে এসব কর্মকাণ্ডে যারা ভালো করবে, তাদের পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হলে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সৃজনশীলতা বেড়ে যাবে।

ইন্টারনেট ও আকাশ সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের সহশিক্ষার সুবাধে- অবাধ মেলা মেশার সাথে পর্যায়ক্রমে আবেগ, কৌতুহল, প্রেম, ভালোবাসায় জড়ানো এরপর ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, বিচ্ছেদ, বিরহ, প্রতিশোধের স্পৃহা, অবসাদ ও হতাশায় পড়ে মাদক ধরে পরবর্তী সময়ে আর ফিরে আসতে পারছে না।

মেধাবী সু-চরিত্রবান ছাড়া একটা দেশ কোনোদিন উন্নতি করতে পারবেনা। সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে, মাদক বিক্রেতা ও মাদকাশক্তদের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতেই হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত