শিরোনাম

রাজধানী ঢাকার দিন-রাত!

প্রিন্ট সংস্করণ॥ মারুফ রায়হান  |  ০১:৩৬, জুলাই ১২, ২০১৯

ঝড় বাদলার তেমন একটা খবর নেই (আষাঢ়ের যা বৈশিষ্ট্য) অথচ রাজধানীর প্রাণভোমরার ওপর দিয়ে যথারীতি বয়ে চলেছে নানা ধরনের ঝড়ঝঞ্ঝা। গভীর কথায় না গিয়ে সোজা করেই শুরু করা যাক। আবারও রাজধানীর রাস্তার পাশের গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটলো।

গত শুক্রবার তেজগাঁও কলেজের সামনে গাড়ির ওপর একটি কড়ইগাছ ভেঙে আহত হয়েছেন দুই ব্যক্তি। সাময়িকভাবে ওই সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ গাছ সরিয়ে নতুন চারাগাছের প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এসব দুর্ঘটনার ঝুঁকি কিংবা অনাকাঙিক্ষত মৃত্যু এড়াতে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ থাকলেও ঝুঁকি নিরসনে উদ্যোগী হতে দেখা যাচ্ছে না কোনো সংস্থাকেই।

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা শোক এবং প্রতিবাদ:-
আমার ছোটবেলা কেটেছে যশোরে। স্কুল থেকে ফিরে গোসল আর কোনো মতে খাওয়া মুখে পুরেই খেলতে চলে যেতাম বাইরে। কতবার আম্মু কানে ধরে বাসায় নিয়ে এসেছে কেননা বিকেলে খেলতে যাওয়ার অনুমতি ছিলো, দুপুরে ছিলো নয়। তবুও বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য কারোরই ছিলো না।

খেলতে খেলতে কত দূরে চলে যেতাম মাঝে মাঝে। নদীর পারে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুঁশুক দেখবো বলে। সেখানে ছিলো ওয়ার্কার কলোনি। ওরা আমাদের ডাব কেটে এনে দিত পানি খেতে চাইলে। সন্ধ্যায় কবরস্থানের পাশ দিয়ে দিতাম ভোঁ দৌড়। সাপ আছে জানতাম তাই সবাই তালি বাজিয়ে হাঁটতাম।

সাপের ভয় পেতাম, ভূতের ভয় পেতাম। কখনও পুরুষের ভয় তো পাইনি! তখন সব পুরুষগুলো মানুষ ছিলো বোধহয়! এখন অনেকেই হিংস্র জানোয়ার, লকলকে জিহ্বা আর রক্ত চক্ষুর কিম্ভূতকিমাকার কুৎসিত জানোয়ার। ওপরের কথাগুলো একজন মায়ের, যিনি আছেন ফেসবুকে আমার বন্ধু তালিকায়।

পোস্টটি পড়ে কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে থাকি। চলতি সপ্তাহের ‘ঢাকার দিনরাত’ লেখা শুরুর আগে এক সহকর্মী জানালেন, শিশু সায়মার ধর্ষক ধরা পড়েছে। তার ছবিও চলে এসেছে অনলাইনে। দেখলাম ছবিটা। তরুণ বয়সী একজন। কোনো মাদ্রাসা শিক্ষক হলে হয়ত চমকাতাম না।

কেননা গত শনিবার ফতুল্লার এক মাদ্রাসা অধ্যক্ষ ১২ জন ছাত্রীকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। পরদিন নেত্রকোনার এক মাদ্রাসা অধ্যক্ষ স্বীকার করেছে ৮ জনকে ধর্ষণের কথা। এর আগে ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ নুসরাত জাহান রাফি কাণ্ড ঘটিয়েছে। একের পর এক মাদ্রাসা শিক্ষকের ভয়ঙ্কর অপরাধের কাহিনি সংবাদপত্রে আসতে শুরু করেছে।

টিভিতে তাদের স্বীকারোক্তি শোনা যাচ্ছে। প্রতিদিনই একই প্রশ্ন শুনছি: শিশু ধর্ষণ কি বেড়ে গেলো হঠাৎ করে? আমার এক ছোট ভাই একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে।

পরিসংখ্যানটির চিত্র তুলে দিতে গিয়ে সে লিখেছে : ‘সাত বছরের শিশু মেয়েটি প্রতিদিন বিকেলে খেলতে বেরোয়। ঢাকা শহর, বাইরে তো খেলার জায়গা নেই, ফ্ল্যাটেই খেলাধুলা করে। মেয়েটির খেলার সঙ্গী ওপরতলার ফ্ল্যাটের তারই সমবয়সী আরেকটি মেয়ে।

গত শুক্রবার বিকেলে মেয়েটি খেলতে ওপরতলায় যায়, সঙ্গী মেয়েটি বাইরে যাবে তাই খেলতে পারবে না বলে, মেয়েটি বাসায় ফিরে আসবে বলে লিফটে ওঠে।

সাত বছরের মেয়েটির আর বাসায় ফেরা হয় না, সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও শিশুটির খোঁজ না পেয়ে আশপাশে ফ্ল্যাটে খোঁজ শুরু হয়, রাত আটটায় ভবনের সবচেয়ে ওপরের তলার শূন্য ফ্ল্যাটের রান্না ঘরে মেয়েটির রক্তে ভেজা মৃত্যুদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। হাসপাতাল জানিয়েছে, মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়, ধর্ষণের পর গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় সাত বছরের শিশু মেয়েটিকে।

মেয়েটির নাকে মুখে ছিলো রক্ত।’ ঢাকার ওয়ারীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সারাদেশেই এ নিয়ে আলোচনা চলছে। ধর্ষণ রোধে কোনো মেকাজিমই কি কাজে আসছে? কয়জন ধর্ষককে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে, কতজন শেষ পর্যন্ত শাস্তি পাচ্ছে- এসবের পরিসংখ্যান নিতে গেলে হতাশ হতে হয়।

চাঞ্চল্যকর বেশকিছু ধর্ষণের বিচার সম্পন্ন হয়নি। তার পরও সমপ্রতি ধর্ষকদের পাকড়াও করা হচ্ছে আগের তুলনায় ঢের বেশি। বিশেষ করে যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয় সেগুলোর আসামিদের ধরার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আশাতীত তৎপরতা দেখাতে সমর্থ হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে শিশু সায়মা ধর্ষণকারী ও হত্যাকারীকে পুলিশ ধরে ফেলেছে।

ধর্ষকদের কি শাস্তি দেয়া হবে? আইন করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হোক- এমন দাবিতে বহু লোক সোচ্চার। আবার লিঙ্গ কর্তনের বিষয়টিও অনেকেই উল্লেখ করে থাকেন।

একটি ধর্ষণের ঘটনা সমাজের ওপর নিঃশব্দে গভীরতর চাপ তৈরি করে। এটি নারী সমাজকে বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত করে। তার চেয়েও বড় কথা, এটি তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার বোধের জন্ম দেয়।

নগরীর একটি বড় অনুষঙ্গ হলো ফ্ল্যাটবাড়ি। সেই নিরাপদ আবাসিক স্থানেই শিশুকন্যার ওপর বর্বর আক্রমণ হলে সমাজে বিপুল অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হবে- এটাই স্বাভাবিক।

আমাদের স্বীকার করতে হয়ত লজ্জা হবে, তাই অনেকে স্বীকার করবেন না যে একটি সমাজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুরুষের (বিভিন্ন বয়সী) মধ্যে অবদমিত ও বিকৃত যৌন বাসনা থাকে। সুযোগ পেলে সেই বাসনা চরিতার্থ করার জন্য সে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তার মনুষ্যত্ববোধও তখন সাময়িকভাবে লোপ পায়।

কিন্তু যদি তাদের মনে নিশ্চিত শাস্তির ভীতি জাগিয়ে তোলা সম্ভব হয়, সেক্ষেত্রে বাধ্য হয়েই নিজেকে সে সংযত রাখবে। তাই জোরেশোরে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। শাসক মহলকেও লক্ষ্যযোগ্য ভূমিকা রাখতে হবে। এ কাজে যত দেরি হবে ততই ক্ষতি বাড়বে। আর একটি কথা।

পারিবারিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণও ঘটানো দরকার। ধনী- গরিব যে পরিবারই হোক না কেন, অভিভাবকরা ছেলে- সন্তানের নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলায় বিশেষ উদ্যোগী হতে পারেন, যাতে তারা কখনই ধর্ষক না হয়ে ওঠে।

পানিতে মলের জীবাণু!
ওয়াসার পানি নিয়ে ওয়াসার কর্তাব্যক্তির অসম্ভব দাবি আমরা শুনেছি। তা নিয়ে বিদ্রুপের রেশ না ফুরোতেই নতুন তথ্যের বিস্ফোরণ। ওয়াসার পানিতে এবার পাওয়া গেলো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, মলের জীবাণু। ওয়াক থু!

ঢাকা ওয়াসার ১০টি জোনের মধ্যে চারটি জোন এবং সায়েদাবাদ ও চাঁদনীঘাট এলাকা থেকে সংগৃহীত পানির আটটি নমুনাতে দূষণ পেয়েছে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমিটি। এসব এলাকার পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও উচ্চ মাত্রার এ্যামোনিয়া পাওয়া গেছে।

এছাড়াও কিছু কিছু নমুনাতে মলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ অনিরাপদ উৎসের পানি পান করে।

৪১ শতাংশ পানির নিরাপদ উৎসগুলোতে রয়েছে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া। ১৩ শতাংশ পানিতে রয়েছে আর্সেনিক। পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা পানিতে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৮২ শতাংশ। ওই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পত্র পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

পরে সে প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন আইনজীবী তানভীর আহমেদ। এরপর ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৬ নবেম্বর রাজধানী ঢাকায় পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করা ওয়াসার পানি পরীক্ষার জন্য ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দেন হাই কোর্ট।

পরে ঢাকা ওয়াসার পানি পরীক্ষার জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও আইসিডিডিআরবির প্রতিনিধির সমন্বয়ে ওই কমিটি গঠিত হয়। এরপর ওই কমিটিকে ২০১৯ সালের ২১ মে পানি পরীক্ষার নির্দেশ দেন হাই কোর্ট।

লেখক : কলামিস্ট

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত