বহু কাঙ্ক্ষিত ডাকসু নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক ভোটগ্রহণ

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০১:২৫, মার্চ ১১, ২০১৯

দীর্ঘ আঠাশ বছর পরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- ডাকসু নির্বাচন। আজ সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে কোনো বিরতি ছাড়াই চলবে বেলা ২টা পর্যন্ত। নির্বাচনে ৪৩ হাজার ১৭৩ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ডাকসুতে প্রার্থী ২২৯ জন আর হল সংসদে প্রার্থী হয়েছেন ৫০৯ জন। ছাত্রলীগ নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, কোটা আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এবং প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত বামজোটসহ কয়েকটি প্যানেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ভিপি পদে ২১ জন এবং জিএস পদে প্রার্থী হয়েছেন ১৪ জন। ডাকসু ও হল সংসদে ছাত্র সংগঠনের প্যানেলের বাইরে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।ডাকসু নির্বাচনের ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে একটি আশঙ্কা জনমনে তীব্র হয়ে উঠেছিল- নির্বাচনি পরিবেশ শেষ পর্যন্ত শান্ত ও সুস্থ থাকে কিনা তা নিয়ে। তবে স্বস্তির কথা হলো, ছাত্র সংগঠনগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানের কারণে নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হতে যাচ্ছে। যদিও এখনো অনেকের মনে এ শঙ্কা রয়েছে- ভোটের দিন পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে, ডাকসু নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে তারা প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এদিকে প্রচারণার শেষ মুহূর্তে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনগুলোর মিছিল-স্লোগানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস মুখরিত হয়ে ওঠার খবর দিয়েছে সংবাদ মাধ্যমগুলো। গত শনিবার ছিল প্রচারণার শেষদিন। এদিন সবগুলো প্যানেলের প্রার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল ক্যাম্পাস। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন প্রার্থী ও সংগঠনের কর্মীরা। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী-ভোটরদের কাছে গিয়ে ভোট প্রার্থনার পাশাপাশি নানা রকম প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন। শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন, যাতায়াতের জন্য সুষ্ঠু পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ডাইনিংয়ে খাবারের মান উন্নীত করাসহ নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও প্রত্যাশা করছেন, ছাত্রনেতারা নির্বাচিত হয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হবেন। দীর্ঘদিন ডাকসু না থাকায় শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার কেউ ছিল না।ডাকসু নির্বাচনের প্রতি দেশের সচেতন মানুষের রয়েছে প্রবল আগ্রহ। যদিও এটি শিক্ষার্থীদের নির্বাচন, তারপরও এর সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দুই-একটি ছাড়া প্রায় সবগুলো ছাত্র সংগঠনই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব এ নির্বাচনে পড়ে কি-না তা নিয়ে অনেকেরই মনে সংশয় রয়েছে। তবে, নির্বাচনে জয়লাভের জন্য পরামর্শ দেয়া ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলো এখনো পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন নিয়ে তেমন নাকগলায়নি।এদিকে এ নির্বাচনকে নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চিন্তা-ভাবনা করছে। সংবাদ মাধ্যগুলোতে তাদের সে চিন্তা-ভাবনার কথা তুলে ধরা হচ্ছে। সেসব অভিমতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র প্রতিনিধিত্বশীল ডাকসু দেখতে চান। এ বিষয়ে দৈনিক আমার সংবাদ ‘অগ্রজের চোখে ডাকসু’ শিরোনামে যে ধারাবহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে মতামত ব্যক্ত করেছেন সাবেক ছাত্র ও ডাকসু নেতারা। তারা সবাই একটি বিষয়ে একমত যে, একটি কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল ডাকসু অত্যন্ত প্রয়োজন। তাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ডাকসু নির্বাচন না হওয়াকে এক ধরনের পাপ বলে অভিহিত করে ভবিষ্যতে এমন বন্ধ্যাত্ম যেন আর সৃষ্টি না হয় সেদিকে মনোযোগ দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। সচেতন ব্যক্তিরা ডাকসু নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অবশ্য বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর ডাকসু গঠন সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়ে কেউ কেউ সংশয়ও প্রকাশ করেছেন। তবে, অনেকেই মনে করছেন শেষ পর্যন্ত হয়তো শান্তিপূর্ণভাবেই ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনগুলোর মনোভাব ও ভূমিকাই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। তারা যদি পরাজয়ের আশঙ্কায় বা বিজয়ী হওয়ার উদগ্র বাসনায় উন্মত্ত হয়ে না ওঠে, তাহলে যে ডাকসু নির্বাচন দেখার জন্য অধীর আগ্রহে সবাই অপেক্ষা করছে, তা সম্ভব হতে পারে। আমরা ছাত্র সংগঠনগুলোর কাছে সে রকম দায়িত্বশীলতাই আশা করি। আমরা মনে করি, নতুন প্রজন্ম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কীভাবে সমুন্নত রাখতে হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীরা যদি পরাজয়কে হূষ্টচিত্তে মেনে নিয়ে বিজয়ীদের অভিনন্দিত করে এবং বিজয়ীরা হূদয়কে প্রসারিত করে পরাজিতদের যদি আলিঙ্গনাবদ্ধ করে, তাহলেই নিশ্চিত হবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধাররা এ প্রত্যাশা পূরণ করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।