শিরোনাম

জাতীয় চাঁদ দেখার কমিটির নতুন সিদ্ধান্ত : বৃহস্পতিবার নয়, বুধবারই ঈদ

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ২৩:১৭, জুন ০৪, ২০১৯

চাঁদ দেখা যায়নি বলে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরে সিদ্ধান্ত  পরিবর্তন করে বুধবার বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। জাতীয় চাঁদ দেখার কমিটির জানায়, বৃহস্পতিবার (০৬ জুন) নয়, আগামীকাল বুধবারই (০৫ জুন) বাংলাদশেে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর মঙ্গলবার (০৪ জুন) রাত সোয়া ১১টার দিকে কমিটির সভাপতি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ এই ঘোষণা দেন।

জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বেশকিছু বাসিন্দা চাঁদ দেখতে পেয়েছেন। তারা এ বিষয়টি নিজেদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) লিখিতভাবে অবহিত করেন। পরে ইউএনও বিষয়টি অবহিত করেন জেলা প্রশাসককে। তিনি চাঁদ দেখা কমিটিকে অবহিত করলে চাঁদ দেখা কমিটি ফের বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেয়।

জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে দেশের প্রধান ঈদ জামাত সকাল সাড়ে ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ঈদের প্রধান জামাতের নামাজে ইমামতি করবেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা, বিদেশি কূটনীতিক, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ সাধারণ মুসল্লিরা নামাজ আদায় করবেন।

প্রতিবারের মতো এবারও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রথম জামাত সকাল ৭টায়, দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টায়, তৃতীয় জামাত সকাল ৯টায়, চতুর্থ জামাত সকাল ১০টায় এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে।

ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে মুসলমানদের অবশ্যই ফিতরা আদায় করার বিধান রয়েছে। এই বিধান মেনে এবারও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ফিতরার হার নির্ধারণ করে। এবার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকা। সর্বোচ্চ ফিতরার এই হার ধরা হয়েছে এক হাজার ৯৮০ টাকা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, যে কেউ ইচ্ছা করলে সর্বনিম্ন ৭০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার ৯৮০ টাকা পর্যন্ত ফিতরা প্রদান করতে পারবেন।

হিজরি বর্ষপঞ্জী অনুসারে রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উৎসব পালন করা হয়। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের সমাপ্তিতে শাওয়ালের প্রারম্ভ গণনা করা হয়। ঈদের আগের রাতটিকে ইসলামী পরিভাষায় ‍‍লাইলাতুল জায়জা‌ (অর্থ: পুরস্কার রজনী) এবং চলতি ভাষায় "চাঁদ রাত" বলা হয়। শাওয়াল মাসের চাঁদ অর্থাৎ সূর্যাস্তে একফালি নতুন চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদ হয়, এই কথা থেকেই চাঁদ রাত কথাটির উদ্ভব।

ঈদের দিন ভোরে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। ইসলামিক বিধান অনুসারে ২ রাকাত ঈদের নামাজ ৬ তাকবিরের সাথে ময়দান বা বড় মসজিদে পড়া হয়। ফযরের নামাযের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের নামাযের সময় হয়। এই নামায আদায় করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব।

সাধারণত, ঈদের নামাজের পরে মুসলমানরা সমবেতভাবে মুনাজাত করে থাকে এবং একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করে ঈদের সম্ভাষণ বিনিময় করে থাকে। ঈদের বিশেষ শুভেচ্ছাসূচক সম্ভাষণটি হলো, "ঈদ মুবারাক"। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অণুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া নামক স্থানে।

মুসলমানদের বিধান অণুযায়ী ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার আগে একটি খেজুর কিংবা খোরমা অথবা মিষ্টান্ন খেয়ে রওনা হওয়া সওয়াবের (পূন্যের) কাজ। ঈদুল ফিতরের ব্যাপারে ইসলামী নির্দেশসমূহের মধ্যে রয়েছে গোসল করা, মিসওয়াক করা, আতর-সুরমা লাগানো, এক রাস্তা দিয়ে ঈদের মাঠে গমন এবং নামাজ-শেষে ভিন্ন পথে গৃহে প্রত্যাবর্তন। এছাড়া সর্বাগ্রে অযু-গোসলের মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার বিধানও রয়েছে। ইসলামে নতুন পোশাক পরিধান করার বাধ্যবাধকতা না থাকলেও বিভিন্ন দেশে তা বহুল প্রচলিত একটি রীতিতে পরিনত হয়েছে।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের রমযান মাসের রোযার ভুলত্রুটির দূর করার জন্যে ঈদের দিন অভাবী বা দুঃস্থদের কাছে অর্থ প্রদান করা হয়, যেটিকে ফিৎরা বলা হয়ে থাকে। এটি প্রদান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিৎরা আদায় করার বিধান রয়েছে। তবে ভুলক্রমে নামাজ পড়া হয়ে গেলেও ফিৎরা আদায় করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে।

মহান আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে রোজাদারদের জন্য বিশেষ একটি পুরস্কার হচ্ছে, ঈদুল ফিতর। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যারা রমজানে রোজা রাখেনি তারা ঈদের নামাজে সু-সংবাদপ্রাপ্ত মুক্তিপ্রাপ্ত মানুষের কাতারে শামিল হবে না। তাদের জন্য কোনো আনন্দ নেই। আর যারা রোজা পালন করেছে, গরিবদেরকে নিজের মাল থেকে ফিতরা দিয়েছে শুধুমাত্র ঈদ তাদের জন্যই। তবে যাদের রোজা রাখার বয়স হয়নি অথবা বিশেষ কোনো কারণে রোজা রাখতে পারেনি তারাও ঈদের এই আনন্দে শরীক হতে পারবে।

কিন্তু যারা বিনা কারণে এবং অলসতা করে রোজা রাখেনি তাদের জন্য এ ঈদে আনন্দ নেই। এ ঈদ তাদের জন্য আনন্দ স্বরূপ নয়, বরং তিরস্কার স্বরূপ।’ অসহনীয় অপব্যয় : আজকের মুসলিম বিশ্ব ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। ঈদ এলেই দেখা যায় এক শ্রেণির লোক আনন্দ-ফুর্তি, ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে। যারা কিনা সারা বছর আল্লাহর বিধি-বিধান অবজ্ঞা করে চলছে। পুরো রমজান মাস তারা গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দিয়েছে, তারাই ঈদের মহা-আনন্দে মেতে উঠছে।

তাদের পরিবারেই চলছে ভোগ-বিলাসের নানা আইটেম। তাদেরকেই দেখা যায় রূপচর্চা ও সাজ-সজ্জার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তারাই জাঁকজমকভাবে পোশাক-পরিধেয় ও ক্রয় করে উগ্রভাবে চলাফেরা করে। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই’। ঈদের বাজারে আমরা দেখতে পাই বিশেষ করে মহিলারা অসহনীয় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তারা অধিক মূল্যবান পোশাক-আশাকে সুসজ্জিত হয়ে সবার দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় হওয়ার চেষ্টা করেন।

ঈদুল ফিতরের যথার্থ শিক্ষা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে এই পৃথিবীকে শান্তির নীড়ে পরিণত করতে সবার সচেষ্ট হতে হবে। সাধারণ ক্ষমার দিন ঈদ : সাধারণত দুনিয়ার রাজা-বাদশাহ তাদের ক্ষমতার ফখর হিসেবে বিশেষ কিছু দিনে জাতির অপরাধীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে থাকে, তেমনি মহান আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য ঈদের দিন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।

আনাছ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ঈদের দিন মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের মাঝে রোজাদারদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, হে ফেরেশতাগণ, আমার কর্তব্যপরায়ণ প্রেমিক বান্দার বিনিময় কী হবে? ফেরেশতাগণ বলেন, হে প্রভু, পুণ্যরূপে পুরস্কার দান করাই তো তার প্রতিদান। আল্লাহপাক বলেন, আমার বান্দারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে।

দোয়া করতে করতে ঈদগাহে গমন করেছে। আমার মর্যাদা, আমার সম্মান, দয়া ও বড়ত্বের কসম আমি তাদের দোয়া কবুল করবো এবং তাদেরকে মাফ করে দেবো। সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন : কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে/ তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।’ ঈদ এসেছে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একে-অপরের সঙ্গে আবদ্ধ হওয়ার জন্য।

হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি, মারামারি সবগুলো মুছে ফেলার জন্য। একে অপরের, আপন-পর সকলের পিছনের জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা ভুলে, হাতে-হাত রেখে, কাঁধে-কাঁঁধ মিলিয়ে ঈদগাহে আসতে হবে। গরিব-দুঃখী সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে ঈদের আনন্দ ভোগ করার জন্য। ঈদে শুধু বিত্তশালীরা আনন্দ করবে এরকম নয় বরং ঈদ সবার জন্য। ধনীরা যেভাবে পোশাক পরে আনন্দ করে গরিবরাও সে আনন্দ করবে। শুধু ধনীরা আনন্দ করবে আর এতিম অসহায়রা আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকবে— এটা ঈদের মূল শিক্ষা নয়।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত