শিরোনাম

২০ বছর ধরে শিকলে বাঁধা দুই যুবক!

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, সিরাজদিখান (মুন্সীগঞ্জ)  |  ০৫:৪১, জুন ২৭, ২০১৯

মানসিক ভারসাম্যহীন ২ যুবক। একজন ২০ বছর ধরে ও আরেকজন ১২ বছর ধরে শিকলবন্দি হয়ে আছে। চিকিৎসার জন্য ডাক্তার, পীর, ওঝা, ফকির কাউকেই বাদ দেয়নি তাদের পরিবার। তবুও ভালো হয়নি তারা। অন্যের সন্তান হাঁটে-খেলে আর তাদের সন্তানকে শিকলে বেঁধে রাখতে হয় বছরের পর বছর ধরে।

মায়ের মন মানে না একমাত্র পুত্রকে এভাবে একটি ঘরে শিকলবন্দি করে রাখা। মায়ের আকুতি— এর কি কোনো চিকিৎসা নেই? ঘটনা দুটি ঘটেছে উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের দুই গ্রামের দুটি পরিবারে।

উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের খাসমহল বালুচর গ্রামের আব্দুল করিম ও তার স্ত্রী খাদেজা বেগমের একমাত্র ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী ইব্রাহীম। তারা ৪ বোনের একমাত্র ভাই। বয়স ৩১ বছর। ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল কিন্তু ভালোভাবে কথা বলতে পারত না।

তারপরও বাবার কাজে সহযোগিতা করত। ১০-১২ বছর থেকে পাগলামো ভাব শুরু হয়। বিভিন্ন ফকির ওঝা ডাক্তার দেখিয়েও লাভ হয়নি। বেসরকারিভাবে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নিলেও সেখানে ভর্তি নেয়নি। এখন নিজ বাড়িতেই ১২ বছর ধরে শিকলে বাঁধা রয়েছে ইব্রাহিম।

এছাড়া বালুচর ইউনিয়নের খাসনগর দক্ষিণপাড়া গ্রামের মো. হেলাল উদ্দিন ও তার স্ত্রী জয়নব বিবির বড় ছেলে আল মামুন। বয়স ৩৩ বছর, ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। তারা ২ ভাই ২ বোন। ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই পাগলামি শুরু হয়। পাবনা মানসিক হাসপাতালে বেসরকারিভাবে সাড়ে ৩ বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর ২-১ মাস ভালো ছিল।

এরপর আবার একই অবস্থা। বিভিন্ন ডাক্তার, কবিরাজ দেখিয়ে কোনো লাভ হয় নাই। এখন অর্থের অভাবে চিকিৎসা দিতে পারছে না। তাকে ২০ বছর ধরে শিকলবন্দি করে রাখা হয়েছে। মাঝে মাঝে ছেড়ে দিলে মানুষের অনেক ক্ষতি সাধন করে তাই ৭-৮ বছর ধরে এখন একটানা শিকলবন্দি অবস্থায় আছে।

ইব্রাহিমের বাবা আব্দুল করিম জানান, পাবনা রাখে নাই, অন্য পাগলদের মারধর করতে পারে তাই। এখন তালা দিয়ে রেখেছি। টাকা নাই চিকিৎসা কি করব।
মা খাদেজা বেগম বলেন, ফকির ফাকরা হাসপাতালে নিয়েছি। পাবনা নিয়েছি ভালো হয় নাই। ৪টা খাশি মানতি দিয়েছি।

পীরে মহিষ চাইছে ভালো হলে দিতাম। জমি বিক্রি করে চিকিৎসা দিয়েছি। এখন নিজেরা চলতে পারি না। তালা দিয়ে রেখেছি, মায়ের মন মানে না। স্বজনরা জানান, অনেক টাকা খরচ করেছে। ১০/১২ বছর ধরে শিকল দিয়ে বাঁধা রয়েছে।

প্রতিবেশীরা জানান, এই প্রতিবন্দির কি কোনো চিকিৎসা নেই।

আল মামুনের বাবা মো. হেলাল উদ্দিন জানান, পাবনায় সাড়ে তিন বছর চিকিৎসা করে বাড়ি আনি। এরপর ২ মাস ভালো থাকার পর সেই একই অবস্থা। সে মানুষের ক্ষতি করে তাই ১৫-২০ বছর ধরে আটকে রেখেছি শিকল দিয়ে। তার বয়স ৩৩। চার ভাইবোনের মধ্যে সেই বড়। মামুনের চিকিৎসায় সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

আল মামুনের মা বলেন, কত জায়গায় চিকিৎসা করালাম ভালো হল না। মানুষের সন্তান হাঁটে আমার সন্তান বাইনদা ধুইছি। আহহারে কেউ যদি ওরে ভালো কইরা দিত। আমার বুকটা ছিড়া যায়।

আল মামুনের ছোট বোন বলেন, ছোটবেলায় ভালো ছিল আমাকে মজা কিনে দিত। এর সমস্যা হয় মানুষের অনেক ক্ষতি করত জরিমানা দিতে হয়েছে অনেক।

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. আজিজুর রহমান মাসুম জানান, তারা সম্প্রতি জানতে পেরেছেন বালুচরে ২ জন মানসিক প্রতিবন্দি রয়েছে। একজন ২০ বছর আরেকজন ১২ বছর ধরে শিকল বন্দি। তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তারা নিজ উদ্যেগে সহযোগিতা ও ভাতা দিবেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনে চিকিৎসা দিবেন।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত