শিরোনাম

শেরপুরবাসীর প্রিয় হয়ে ‍উঠেছেন আনারকলি মাহবুব

তপু সরকার হারুন, শেরপুর প্রতিনিধি  |  ১৭:৩৫, আগস্ট ১৪, ২০১৯

৯ আগস্ট শেরপুরে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের এক বছর পূর্ণ করেছেন আনার কলি মাহবুব। গত বছরের ওই দিনে তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এর উপ-সচিব থেকে চাকরি জীবনের প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে দেশের প্রান্তিক ও সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরে যোগদান করেন।

এক কথায় মূল্যায়ন করতে গলে বলা যায়, জেলা প্রশাসক হিসেবে তার প্রথম বছরটা বেশ কেটেছে। শেরপুরবাসীর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণে তিনি অনেকটাই সফল হয়েছেন।

দেশের ৮ নারী জেলা প্রশাসকের অন্যতম হচ্ছেন আনার কলি মাহবুব। তিনি ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসনে যোগদান করেন। তিনি কেবল রংপুরের এক বনেদী-সম্ভ্রান্ত পরিবারেরই নয়, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সরকারের যুগ্ম সচিব থেকে অবসর নেওয়া গর্বিত পিতার সন্তান।

শেরপুরে জেলা প্রশাসক হিসেবে তিনি ২৪তম হলেও নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে তৃতীয়। জেলা প্রশাসক ডা. পারভেজ রহিমের সময়কাল শেষে ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেনের মাত্র এক বছর কয়েক মাস কাটানোর পরপরই হঠাৎ বদলির সুবাদে আনার কলি মাহবুবের যোগদান ও কর্মযজ্ঞ অধ্যায়ের শুরু হয়।

বলতে দ্বিধা নেই, ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে নান্দনিক শেরপুর গড়তে জেলা প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে যখন চলছিল ব্যাপক গতিশীল, ঠিক তখন আনার কলি মাহবুবের যোগদানে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন, আদৌ তিনি সঠিকভাবে প্রশাসন পরিচালননাসহ জেলার মুখ্য প্রশাসনিক কর্ণধারের দায়িত্বটা পালন করতে পারবেন কিনা।

কিন্তু তাদের সেই সন্দেহ খুব বেশিদিন থাকেনি। জেলা প্রশাসনের অধস্তন-চৌকস কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়ে তিনি ঠিকই প্রশাসন পরিচালনায় দক্ষতা, সফলতা ও সততার পরিচয় দিয়ে আসছেন। যদিও জেলা প্রশাসক হিসেবে সবকিছু ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের এক বছর পূর্ণ করার সময়টা যথেষ্ট নয়, তথাপি আমাদের প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তি অনেকটাই বেশি।

জেলা প্রশাসনের চলমান নান্দনিক অসমাপ্ত কাজগুলো চলমান রেখে শেষ করার ক্ষেত্রে আনার কলি মাহবুবের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতারও কোনো ঘাটতি নেই। যে কারণে এখন ভূমির রেকর্ড রুমসহ জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের প্রতিটি দপ্তরেই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। জমির পর্চা ও রেকর্ড জানতে যেখানে দীর্ঘ সময় লাগতো, সেখানে ই-পর্চার মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যেই সকল সেবা পাচ্ছেন সেবাপ্রত্যাশী জনগণ।

তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই জেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করার বিষয়ে নজর দেন। ফলে মাত্র এক বছরেই জেলায় প্রায় ৫০ শতাংশ ভিক্ষুকমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

এছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে, ইভটিজিং আর সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি শান্ত, সুন্দর ও নান্দনিক শেরপুর গড়ার ক্ষেত্রে তার রয়েছে নিরন্তর প্রচেষ্টা। ফলে ইতোমধ্যেই তিনি শেরপুরবাসীর কাছে অতিপরিচিত ও প্রিয়জন হিসেবে সমাদৃত হচ্ছেন।

জেলা প্রশাসক আনারকলি মাহবুবের সময়কালের নানা কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় সর্বাগ্রে বলতে হয় সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে একমাত্র নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে তিনিই বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি শেরপুরবাসীর প্রাণের দাবি, শেরপুরে রেল লাইন স্থাপন ও একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা যখন তুলে ধরেন, ঠিক তখন অপলক তার দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষার বক্তব্য শুনছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।

তিনি শেরপুরে যোগদানের পর গত বছরের ১৩ আগস্ট জেলায় কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভায় বলেছিলেন, ‘আমি রংপুরের মেয়ে হলেও এখন নিজেকে শেরপুরের বাসিন্দা মনে করি। তাই আমি এখন প্রতিটি কার্যঘন্টা শেরপুরের উন্নয়নে কাজ করবো।’

যোগদানের পর গণমাধ্যম কর্মীদের মতবিনিময় সভায় দেওয়া তার ওই বক্তব্যের প্রতিফলনই যেন ঘটেছে ডিসি সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে। আর এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের যোগ্যতা তুলে ধরার পাশাপাশি শেরপুরের সময়োপযোগী শীর্ষ দাবিগুলো তুলে ধরে খোদ শেরপুরবাসীকেই আপন করে নিয়েছেন। শেরপুরবাসীও তাকে নিয়ে ভাবছেন নতুন করে।

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তার বাইরেও অস্থি-মজ্জা, রক্ত-মাংসে বিরাজমান আদর্শ বলে কথা। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার আদর্শ তার শিরা ও ধমনীতে প্রবাহিত বলেই তিনি শেরপুরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোন ম্যুরাল না থাকায় জেলা কালেক্টরেট ভবন প্রাঙ্গণে সেই ম্যুরাল স্থাপন করে শূন্যতা পূরণ করেন।

এর মধ্য দিয়ে তিনি দায়বদ্ধতা ঘুচানোর পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের দীর্ঘদিনের একটি দাবিও পূরণ করেছেন। ফলে ওই অঙ্গণে প্রবেশ করতেই সকলের দৃষ্টি কাড়ে বঙ্গবন্ধুর সেই ম্যুরাল। এছাড়া একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো নালিতাবাড়ীর সীমান্তবর্তী সোহাগপুর বিধবাপল্লীর উন্নয়ন এবং নানা উৎসবে তাদের পাশে দাঁড়ানো তার আন্তরিকতা ও সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ।

তিনি জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জেলা ব্র্যান্ডিং ও ইনোভেশনেও বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করায় চলতি বছর ময়মনসিংহে বিভাগীয় পর্যায়ে ইনোভেশন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান ও ৪র্থ জাতীয় উন্নয়ন মেলায় শ্রেষ্ঠ জেলা ব্র্যান্ডিং এর গৌরব অর্জন করে শেরপুর। তিনি শহরবাসীর চিত্ত বিনোদনের জন্য নির্মিত ডিসি উদ্যান ও ডিসি লেকের সৌন্দর্য বর্ধনে বাহারি রঙের বাতির ব্যবস্থা করেন তিনি, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে সবার নজর কাড়ে।

হিজড়া জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দিয়ে তাদের ভোটাধিকার দেওয়ার পরও সারাদেশের ন্যায় শেরপুরেও যখন সেই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা অবহেলা-বঞ্চনায় জীবন-যাপন করছিলেন, ঠিক তখন তাদের পুনর্বাসন ও দিন-মানের পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে হাত বাড়ান জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব। তার প্রচেষ্টায় ইতোমধ্যে জেলা সদরে স্থায়ী আবাসন নির্মাণের জন্য ২ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সেলাই, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। শহরে কমেছে হিজড়াদের উৎপাত। ‘পর্যটনের আনন্দে, তুলসীমালার সুগন্ধে’ জেলা ব্র্যান্ডিং এর ওই সে গানের পরিপূর্ণ স্বার্থকতা অর্জনে তিনি শেরপুরে অন্যতম পর্যটন স্পট গজনী অবকাশের উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

ইতোমধ্যে গজনী অবকাশের লেকটি পুনঃখননের মাধ্যমে গজনীর মূল আকর্ষণ ফিরিয়ে আনার কাজ চলছে।

জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুবের কার্যক্রমের অন্যতম দিক হচ্ছে তিনি প্রতি সপ্তাহের বুধবার তার কার্যালয়ে নিয়মিত গণশুনানী গ্রহণ করছেন। এর মধ্য দিয়ে হতদরিদ্র মানুষসহ নানা সমস্যায় পর্যুদস্ত লোকজন তার দ্বারস্থ হয়ে একদিকে যেমন সরাসরি কথা বলতে পারছেন, অন্যদিকে ওই গণশুনানীর পরপরই তারা পাচ্ছেন প্রয়োজনীয় সহায়তা-পরামর্শ।

এ বিষয়টি সাধারণ মানুষের আলোচনাতেও স্থান পাচ্ছে। এছাড়া সমকালীন প্রধান সমস্যা গুজব ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিসহ নিয়েছেন নানা পদক্ষেপ। মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতার লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চলছে ক্রাশ প্রোগ্রাম। এতে যুক্ত হয়েছে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সরকারি-বেসরকারি নানা দপ্তর।

সর্বোপরি বলা যায়, জেলা প্রশাসক হিসেবে শেরপুর তার প্রথম কর্মস্থল হলেও এক বছরেই তিনি যথেষ্ট সফলতা ও সাহসিতার পরিচয় দিয়েছেন। সঙ্গত কারণে তার প্রতি শেরপুরবাসীর প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেছে।

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত