শিরোনাম

ড. আবুল জানেন না ল্যাব বন্ধের খবর

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০২:৩১, মে ১৬, ২০১৯

‘ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির’ প্রজেক্ট ডাইরেক্টর ড. আবুল হোসাইনের অনিহার কারণে নবজাতক শিশুর পিতৃত্বের অধিকার, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ৫ শতাধিক মামলার তদন্ত ফাইলবন্দি। নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রকল্পের আওতাধীন এই ডিএনএ ল্যাব।

দীর্ঘ প্রায় চার মাস ধরে গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবটি বন্ধ থাকলেও প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) জানেন বলে জানিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টরাল প্রকল্পের পিডি হিসেবে অবস্থান করছেন।

আর এ কারণেই তিনি এসব বিষয়ে কোনো প্রকার খোঁজ রাখেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য দেশের বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত ‘ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি’তে ধরনা দিচ্ছেন।

অপরদিকে নির্যাতিত নারী ও শিশুরা তাদের নির্যাতনের প্রকৃত বিচার ও পিতৃত্বের অধিকার হতে বঞ্চিত থাকছেন। সূত্র জানায়, গত ২০১৮ সালে মোট ৪৮০টি চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তের জন্য ডিএনএ ল্যাবে ভিকটিম ও আসামির নমুনা পাঠানো হয়। তার মধ্যে এখনো ৩০২টি মামলার আলামত ডিএনএ ল্যাবে পরীক্ষাধীন রয়েছে। আর চলতি বছরের গত চার মাসে মোট ২০৮টি মামলার নমুনা পরীক্ষাধীন রয়েছে।

এতে গত ২০১৮ ও ১৯ সালে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে মোট ৫১০টি মামলার নমুনা এখনো পরীক্ষাধীন। অপরদিকে গত জানুয়ারি মাস থেকে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির মেশিনগুলো অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ ন্যাশনাল ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির প্রজেক্ট ডাইরেক্টর (পিডি) ড. আবুল হোসেন বিষয়টি জানেন না। দেশের বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত ধর্ষণ, শিশুর পিতৃত্বের পরিচয় সনাক্ত, নিহত ব্যক্তির পরিচয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে হয়ে থাকে। আর ওই ল্যাবের পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে প্রতিবেদন প্রদান করেন। আবার আদালতও ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের পর মামলার রায় প্রদান করতে পারেন।

কিন্তু গত প্রায় ৪ মাস ধরে ন্যাশনার ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির মেশিনগুলো অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তারা ডিএনএ রিপোর্ট সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে দেশের বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত ৫১০টি মামলার তদন্ত কাজ ফাইলবন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।

আর এসব মামলার মধ্যে ৫৩টি মামলার ডিএনএ রিপোর্টের জন্য আদালতের পক্ষ থেকেও তাগিদপত্র ন্যাশনাল ডিএনএ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া বাকি মামলাগুলোর জন্য টেলিফোনে তাগিদ করা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সাভার মডেল থানার মামলা নম্বর-০৭, তারিখ ০২/০৯/১৮, ধারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০০০ (সংশোধনীর)/০৩ এর ৯(১) এবং মামলা নম্বর-১০৩, তারিখ-২৪/০২৫/২০১৯ ইং, ধারা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের (সংশোধনী/০৩)এর ৯ (১) ধারা।

উক্ত দুটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার সহকারী পরিদর্শক (এসআই) প্রাণ কৃষ্ণ অধিকারী। সম্প্রতি তিনি ন্যাশনাল ডিএনএ প্রোফাইলিং, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকায় একটি তাগিদপত্র প্রেরণ করেছেন। ওই তাগিদপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, উল্লিখিত মামলা সাভার থানার জয়নাবাড়ি এরজু মেম্বারের বাড়ির ভাড়াটিয়া এক নারীর গর্ভজাত শিশু এবং মামলার আসামি হাজতি খায়রুল ইসলামের ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া, উল্লিখিত অপর মামলার ভিকটিম ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)-তে ভর্তি অবস্থায় ধর্ষণ ও ডিএনএ পরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু বারবার যোগাযোগ করেও তিনি উক্ত ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পাননি। বিধায় উক্ত রিপোর্ট না পাওয়ার কারণে মামলার তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা গতকাল সেলফোনে আরও জানান, মামলার ডিএনএ রিপোর্ট ব্যতিত সকল প্রকার তদন্ত সম্পূর্ণ করা হয়েছে। শুধু ডিএনএ রিপোর্টের কারণেই মামলার চার্জশিট দিতে পারছি না। উক্ত ডিএনএ রিপোর্ট পেতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রাণ কৃষ্ণ অধিকারী গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেছেন। এছাড়া বাকপ্রতিবন্ধী ভিকটিমের ভূমিষ্ট সন্তান আব্দুল্লাহর পিতৃপরিচয় সনাক্তে মামলার আসামি ময়মনসিংহ জেলার গাফরগাঁওয়ের রাঘাইচটির ফয়সালের ডিএনএ সনাক্তে নমুনা পরীক্ষার প্রোফাইলিং সংরক্ষণ করা হয়।

কিন্তু দীর্ঘদিনেও উক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট প্রদান করা হয়নি বলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, গত ২৪ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়ায় মামলাটি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। আর মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বিজ্ঞ আদালত আদেশনামা মূলে বারবার তাগিদ প্রদান করা হচ্ছে। তিনি আমার সংবাদকে জানান, দীর্ঘদিনেও উক্ত ডিএনএ রিপোর্ট পাচ্ছি না। ফলে মামলার কার্যক্রম অগ্রগতি করা যাচ্ছে না।

আবার নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা নং- ৫৯/২০০৮ইং ঠাকুরগাঁও। উক্ত মামলার আসামি মো. আলমাস আলী নির্যাতিত নারী ও তার গর্ভজাত পুত্র সন্তান মো. আব্দুল্লাহ আজিজের ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট প্রাপ্তির জন্য গত ২০১৮ সনের ১৫ জুলাই ধার্য করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও ডিএনএন পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। ফলে উক্ত আদালতের পক্ষ থেকেও ঠাকুরগাঁও জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি ট্রাইব্যুনালে দাখিলের জন্য তাগাদা দেয়া হয়েছে।

তাছাড়া ঢাকা মহানগরীর তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পুলিশের ইন্সপেক্টর কুইন আক্তার গত ২০১৮ সালের ১১ জুলাই ডিএনএ রিপোর্টের জন্য ভিকটিমের নমুনা দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি সেই রিপোর্ট হাতে পাননি। ফলে মামলাটির কার্যক্রম থমকে রয়েছে। আবার রাজধানীর কদমতলী থানার সহকারী পরিদর্শক এসআই দীপঙ্কর জানান, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ভিকটিম ও মামলার আসামির নমুনা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে না। সেখান থেকে বলা হচ্ছে- ডিএনএ ল্যাবের মেশিনগুলো অকেজো অবস্থায় আছে।

এ ব্যাপারে ‘ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি’র প্রজেক্ট ডাইরেক্টর (পিডি) ড. আবুল হোসাইনের সেলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। এ সময় তিনি ক্ষুদে বার্তায় তিনি ফোন করার কথা জানান। এর কিছুক্ষণ পর তিনি ফোন করলে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির মেশিন বন্ধ ও সারা দেশের অসংখ্য মামলার কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিমাসেই আমাকে রিপোর্ট দেয়া হয়। আর মেশিন নষ্টের বিষয়টি আমার জানা নেই। জেনেই জানাতে হবে বলে জানান তিনি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত