শিরোনাম

প্রশ্নবিদ্ধ কৃষক লীগের কর্মকাণ্ড!

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম  |  ০২:৩৪, মে ২৭, ২০১৯

চলতি মৌসুমে সারা দেশে উৎপাদিত ধানের মূল্য নিয়ে বিপাকে পড়েছে দেশের কৃষক। অধিক খরচে ফসল উৎপাদনের পর সঠিক মজুরি দিতে না পারায় খেতেই নষ্ট হচ্ছে ওই কৃষকের স্বপ্ন। আবার ধানের ন্যায্য মজুরি না পেয়ে খেতেই আগুন দিয়ে নীরব প্রতিবাদ করেছে অনেকেই।

কৃষকের এই দুঃসময় এখনো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগ। দল ও সরকার উৎপাদিত ধান নিয়ে কথা বললেও এখন নীরব ভূমিকা পালন করছে তারা। যা নিয়ে সংগঠনের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কৃষকলীগের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

দিনের পর দিন মাঠের রাজনীতি ও দলীয় কার্যক্রমসহ প্রায় সবকিছুতেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে কৃষকলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম। অথচ একসময় কৃষকের অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

বিশেষ করে বিএনপির শাসনামলে সারের দাবিতে মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে অনেক কৃষককে জীবন দিতে হয়েছিলো। তখন কৃষকদের পক্ষে কৃষক লীগ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সেসময় দেশের কৃষিতে খাতে উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা নিয়মিতভাবে তৃণমূলে সাংগঠনিক সফর করেন।

সফরের সাথে সাথে কৃষকলীগের জেলা-উপজেলা কমিটিতে কৃষকদের স্থান দেওয়া হয় সে সময়। কিন্তু বর্তমান আর জেলা-উপজেলা পর্যায় দূরে থাক, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড শাখার কমিটিতে ওই কৃষকদের স্থান হয় না।

মূলত দলে কৃষকের এই দুর্দিনে এখনো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে অনেকটাই নীরব কেন্দ্রীয় কৃষকলীগের নেতাকর্মীরা। শুধু কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি নয়, কৃষকের এ অবস্থায় কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ও উপ-কমিটির নেতারা। দল ও সরকার উৎপাদিত ধান নিয়ে কথা বললেও এখন নীরব ভূমিকা পালন করছে তারা।

কৃষকের এই সমস্যা দূর করার জন্য এখনো তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে জানান কৃষকলীগের একাধিক নেতা। তারা বলছেন, কৃষকের খরচ বাঁচাতে অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীরা, তরুণরা তাদের ধান কাটায় সহায়তা করছেন।

সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন কৃষকের ধান কাটায় সহযোগিতা করছেন। আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এরই মধ্যে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছেন কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

এমন পরিস্থিতিতে বলাই যায় নিষ্ক্রীয় কৃষকলীগের কার্যক্রম। কৃষকের জন্য সংগঠন করা হলেও কৃষকের দুর্দিনে পাশে পান না তাদের। শুধু নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সংগঠনগুলো ঠিকে রয়েছে- এমনও অভিযোগ সাধারণ কৃষকদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা আমার সংবাদকে বলেন, বর্তমান কৃষকলীগের কী কাজ আমি বুঝি না। কৃষকের এই সময়ে আরও পাশে থাকতে পারিনি। তালে কবে তাদের পাশে থাকবো। অথচ বঙ্গবন্ধু কৃষক লীগ গঠন করেছিলেন দেশের কৃষকের অধিকার আদায়ের আন্দোল সংগ্রাম করার জন্য। এটা খুব দুঃখজনক বিষয়।

তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ কেন্দ্রীয় কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. খন্দকার শামসুল হক রেজা। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, কেন্দ্রীয় নিদের্শ অনুযায়ী জেলা-উপজেলায় সকল নেতাকর্মীরাই কৃষকের এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষকের বিপদে গিয়েছি। সেখানে কেন ফটোসেশন করব। আরও ফটোসেশন করি নাই বলে ছাত্রলীগের মতো সুনাম পাইনি।

কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কৃষকলীগের নেতারা কৃষকের পাশে না থাকলেও আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কৃষকের পাশে দাঁড়িছে। সংগঠনের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী নিজেরাই মাঠে গিয়ে দরিদ্র কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন।

শুধু তাই নয়, ছাত্রলীগের জেলা-উপজেলাসহ সকল ইউনিটিতেই নির্দেশ দিয়েছেন তারা। নেতাদের নির্দেশনা পেয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা-উপজেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। যা নিয়ে ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে ছাত্র সংগঠনটি।

কৃষকের এমন অবস্থায় সরকারের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীরাও মাঠে নেমে পড়েছে। তাদের কেউ ধান কাটতে সাহায্য করছে আবার কেউ সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করতে সহযোগিতা করছেন।

বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা নিতে না পারে, এ জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে ধান সংগ্রহ করছে স্থানীয় প্রশাসন। ধান সংগ্রহের পাশাপাশি সরকার চালের আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে বাজার পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছেন।

কৃষকের উৎপাদিত ধানের দাম নিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চিন্তিত বলে জানিয়েছে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। গত ১৯ তারিখে রাজধানীর আইডিইবি সেমিনার হলে ‘জলবায়ু পরিবর্তন : কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, কীভাবে কৃষকের সমস্যার সমাধাণ করবেন সে পরিকল্পনা তুলে ধরে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কৃষিকে আরও বাণিজ্যিক কৃষি করব, এই কৃষিকে আরও বহুমুখী করব। শুধু ধান না অন্যান্য অর্থকরী ফসলের দিকে নিয়ে যাব। এই কৃষিকে আরও যান্ত্রিকীকরণ করব। আজ শ্রমিক পাওয়া যায় না শ্রমিক আর দরকার হবে না। এই যান্ত্রিকীকরণের জন্য আরও ভর্তুকি দেব।

উৎপাদিত ধানের সঠিক মূল্য ও শ্রমের দাম নিয়ে প্রথম থেকেই বিপাকে পড়ে কৃষক। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেক কৃষক ধান খেতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে নীরব প্রতিবাদ করেন। শুধু আগুন নয়, সারা দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা-উপজেলাতে ধানের দাম বৃদ্ধির জন্য মানববন্ধন করেন কৃষকরা।

ধানের খেতে আগুন দেওয়ার ঘটনা বিষয়ে সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, একটা সমস্যা হয়েছে, আগুন জ্বালিয়ে, ধান পুড়িয়ে এ সমস্যার সমাধান তো হবে না।

সরকার এখানে আন্তরিক এবং সরকার কখনো চাইবে না আমাদের কৃষির মেরুদণ্ড যে কৃষকরা, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কৃষকদের স্বার্থবিরোধী, কৃষকবান্ধব সরকার কখনো করবে না। শেখ হাসিনা সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিক। এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এখানে যে সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, এর বাস্তব সম্মত সমাধানে উদ্যোগী সরকার।

সরকার প্রতি মণ বোরো ধান ১০৪০ টাকায় নিধারণ করে দিয়েছেন। কিন্তু দালালতে কারণে কৃষক পাচ্ছে তার চেয়ে অনেক কম। এখনো বাজারে ধানের মণ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়, যেখানে ধান কাটার একজন শ্রমিককে দিতে হয় তার চেয়ে বেশি টাকা। ধানের দাম নিয়ে অসন্তোষ থেকে পাকা খেতে কৃষকের আগুন দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত