শিরোনাম

শেষ হচ্ছে আইপিও শিকারীদের রাজত্ব

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী  |  ০৫:১০, জুন ১৯, ২০১৯

দেশের পুঁজিবাজারে আইপিও শিকারিদের রাজত্ব করার দিন শেষ হয়ে আসছে।

এরইমধ্যে বিএসইসি আইপিও বিধান সংশোধনের যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি কার্যকর হলেই আইপিও নিয়ে কারসাজিকারীদের অসাধু তৎপরতা বন্ধ হবে বলে মনে করছেন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টরা।

একইসঙ্গে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারে ভারসাম্য ফিরবে বলে মনে করছেন শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা।

জানা গেছে, গত কয়েক বছরে ব্যক্তিপর্যায়ের মতো প্রাতিষ্ঠানিকপর্যায়েও অনেক আইপিও ‘শিকারি’ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অসাধু তৎপরতার কারণে পুঁজিবাজারে আরও বেশি অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

নতুন বিধান কার্যকর হলে এসব আইপিও শিকারিদের দৌরাত্ম্য কমবে। একইসঙ্গে প্রাথমিক শেয়ারের প্লেসমেন্ট বাণিজ্যেও লাগাম পড়বে।

গত ২৯ মে আইপিও বিধানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধনের জন্য খসড়া প্রস্তাব চূড়ান্ত করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন- বিএসইসি।

সংশোধন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সেকেন্ডারি বাজারে ন্যূনতম বিনিয়োগ না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রাইমারি অর্থাৎ আইপিও শেয়ার কেনার যোগ্য হবে না।

একইসঙ্গে আইপিওর নির্দিষ্ট মূল্য ও বুক বিল্ডিংয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোটা ১০ শতাংশ কমিয়ে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরে এটি জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ করা হয়। আগ্রহীদের ১৭ জুনের মধ্যে মতামত পাঠাতে বলা হয়।

জনমত যাচাইয়ে ১৫ দিন সময় দেওয়া হলেও ঈদের ছুটির কারণে আগ্রহীরা মতামত পাঠাতে মূলত এক সপ্তাহ সময় পান।
এরই আলোকে

গত সোমবার বিএসইসিতে আইপিও সংশোধনীর বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়েছেন স্টেকহোল্ডাররা।

এরমধ্যে শুধু প্লেসমেন্ট শেয়ারে লক-ইন এর মেয়াদ নিয়ে স্টেকহোল্ডাররা ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন।

এই শেয়ারে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) পক্ষে ৩ বছরের লক-ইন প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) পক্ষে ২ বছর বা তালিকাভুক্তির পরে ২টি বার্ষিক সাধারণ সভা পর্যন্ত লক-ইন রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়া স্টেকহোল্ডাররা আইপিওতে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে কমিশনের গৃহিত কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার পরিবর্তে ৩০ কোটি টাকা বা পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ উত্তোলন করার প্রস্তাব করেছেন।

এক্ষেত্রে যেটির পরিমাণ বেশি, সেই পরিমাণ তুলতে হবে। তবে আইপিওসহ পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকা হতে হবে।

আর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১০০ কোটি টাকার পরিবর্তে ৭৫ কোটি টাকা বা পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ উত্তোলন করার প্রস্তাব করেছেন।

এক্ষেত্রেও যেটির পরিমাণ বেশি, সেই পরিমাণ উত্তোলন করতে হবে।

আইপিওতে যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে কোটা সুবিধা পেতে প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ফান্ড ও গ্রাচ্যুইটি ফান্ডের ক্ষেত্রে কিছু শর্তের প্রস্তাব দিয়েছেন স্টেকহোল্ডাররা।

এরমধ্যে রয়েছে— ফান্ডগুলোর বয়স রেজিস্ট্রেশন থেকে কমপক্ষে ৩ বছর হতে হবে, সর্বশেষ ২ বছরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দিতে হবে, সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব জমা দিতে হবে ও সর্বশেষ ব্যালেন্স শীটের ৫ শতাংশ সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ থাকতে হবে।

এছাড়া অন্য যোগ্য বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে সেকেন্ডারি মার্কেটে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ থাকতে হবে।

স্টেকহোল্ডাররা আইপিও অনুমোদনের জন্য আবেদনের সময় ইস্যুয়ারকে পূর্বে নগদে উত্তোলিত মূলধনের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ব্যবহার সম্পন্ন করার শর্ত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

এছাড়া বাকি ৫০ শতাংশ কোম্পানির আইপিওতে আবেদন শুরু হওয়ার আগে সম্পন্ন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আইপিওতে বুক বিল্ডিংয়ে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কোটা (মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ) ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন স্টেকহোল্ডাররা।

আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা ৪৫ শতাংশ ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে।

অন্যদিকে ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কোটা (মিউচ্যুয়াল ফান্ডসহ) ৩৫ শতাংশ, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা ৬০ শতাংশ ও প্রবাসীদের কোটা ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আর ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ৩৫ শতাংশের কম ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কোটা পূরণ না হলে, ওই আইপিও বাতিল করার প্রস্তাব করেছে।

বৈঠকে স্টেকহোল্ডারদের বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. খায়রুল ইসলাম জানিয়েছেন, এরইমধ্যে আরও কিছু প্রস্তাবনা জমা পড়েছে।

কমিশন সবকিছু যাচাই-বাছাই করে বাজারের জন্য যা ভালো হবে, সেই সিদ্ধান্তই নেবে।

এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, আইপিও শিকারিদের মতো অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও শুধু প্লেসমেন্ট ও আইপিও শেয়ারের ব্যবসা করছে।

বিএসইসি বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করে এ সংশোধন প্রস্তাব এনেছে।

স্টেকহোল্ডাররাও কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছেন। এটা কার্যকর হলে সার্বিকভাবে পুরো শেয়ারবাজার উপকৃত হবে।

ডিবিএ সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, গত কয়েক বছরে কিছু কোম্পানি ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির পর তালিকাভুক্ত হতে আইপিওতে নামমাত্র ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছে।

কাগজে-কলমে ১০ টাকায় শেয়ার বিক্রি হলেও তারা মূলত ১৫ থেকে ৩০ টাকায় শেয়ার বিক্রি করে মালিকদের এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের পকেট ভারী করছে।

এ বিধান সংশোধনের পর সে সুযোগ আর থাকবে না। বিষয়টি নিয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, প্লেসমেন্ট ও আইপিও বাণিজ্য পুরো বাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে।

এ বাণিজ্যের কারণে গত কয়েক বছরে যেসব মানহীন কোম্পানি বাজারে এসেছে, সেগুলোর কারণে এরই মধ্যে যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণে আরও কয়েক বছর লেগে যাবে।

তবে শেয়ারবাজার উন্নয়নে সমপ্রতি যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, এগুলো বাস্তবায়ন করা হলে এর সুফল পাওয়া যাবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত