শিরোনাম

খালেদা জিয়া মুক্ত হলেই তারেক সেটআপ তছনছ

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০০:১৯, জুন ২০, ২০১৯

বন্দি খালেদার অনুপস্থিতিতে বিএনপিতে কী হচ্ছে সব খবরই রাখছে সরকার। সরকারি দুটি গোয়েন্দা সংস্থার জাদুর বাক্সে দিন শেষে সব তথ্যই জমা পড়ছে। সঠিক সময়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধুর দল অনেকটাই সফল বলে দাবি দেশের বুদ্ধিজীবীদের।

বিরোধী দলকে মুঠোয় রাখার সব কৌশলই জানা আছে ক্ষমতাসীন দলের। খালেদার মুক্তি ইস্যুতেও সময়ের পদক্ষেপ অপেক্ষা করছে বলে রাজনীতিপাড়ার ভাষ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, লন্ডনে বসে তারেক রহমান খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের সমাপ্তি চান!

এমন কথা দলের ভেতরে-বাইরে সিনিয়রদের মুখে মুখে দীর্ঘদিন ধরে ফিরছে। সেই আলোকে খালেদা জিয়ার ইচ্ছা ও অনুমতি ছাড়াই জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও তুচ্ছ করে মির্জা ফখরুলকে হাতে রেখে একের পর এক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারেক জিয়া।

১৬ মাস কারাভোগের পরও খালেদার মুক্তি ও চিকিৎসা দাবিতে আসেনি কোনো কর্মসূচি। খালেদাপন্থি সিনিয়র স্থায়ী কমিটির নেতাদের মতামত ও সিদ্ধান্তের কোনো মূল্য নেই দলে। লন্ডন নেতার ইচ্ছায় এখন আবার কারো কারো ভাগ্যও খুলে যাচ্ছে, হচ্ছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য!

খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে জ্যেষ্ঠদের পরামর্শ, কাউন্সিল ছাড়াই লন্ডনে বসে নতুন স্থায়ী কমিটির সদস্যদের নামও ঘোষণা করছেন খালেদাপুত্র! এতে করে বন্দি খালেদা জিয়া দলের ভেতর দিন দিন নেতৃত্ব-ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছেন। আর এই সুযোগই কাজে লাগাতে ক্ষমতাসীন দল ও সরকার অপেক্ষা করছে বলে রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মত।

জানা যায়, দলের ভেতর খালেদা অনুসারী ও কৃতজ্ঞ নেতারা দল গঠনের চাইতেও অসুস্থ খালেদার মুক্তির জন্য লন্ডন নেতা তারেক রহমানের কাছে দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে জোর দাবি জানিয়ে আসছেন।

কিন্তু মায়ের বন্দিজীবনেও মন গলছে না পুত্র তারেকের। বামপন্থি ঘর থেকে হঠাৎ জাতীয়তাবাদী চরিত্র গ্রহণ করা মির্জা ফখরুলও আন্দোলনের পক্ষে নেই। আর তারেকও চায় আগামীর নেতৃত্বের স্বাদ। তাই ফখরুলকে হাতে রেখে দলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর তিনি।

কারাগারে বসে খালেদা জিয়াও দলের এমন কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষিপ্ত বলে স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য বেশকিছু গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন। খালেদাপন্থি পুরনোরা শেষ সময়ে দলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গোপনে নানাভাবে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সিনিয়র নেতাদের ভাষ্য, খালেদার মুক্তি ইস্যুতে কোনোভাবে যদি তারেকের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অনুমতি পাওয়া যায়, এতে করে খালেদা জিয়ার মুক্তির একটা সম্ভাবনা থাকবে। কারণ তারেক বিএনপিকে নেতৃত্ব দিক এটি অন্তত ক্ষমতাসীনরা চায় না। তাই খালেদার মুক্তিই হতে পারে সরকারের জন্য বড় সফলতা!

কারণ খালেদা জিয়া এখন বের হলেই তারেক সেটআপের সব বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। তাই খালেদাপন্থিরা আইনি প্রক্রিয়া ও আন্দোলন দুটিই চালিয়ে যাওয়ার কৌশলে রয়েছেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দলও শক্ত অবস্থান থেকে কিছুটা নরম হয়ে আসছে। অনেকেই মনে করছেন, খালেদা জিয়াকে আটক রেখে সরকারও কোনো চাপ গ্রহণ করতে আপাতত চাচ্ছে না।

তাছাড়া খালেদার বন্দি যদি রাজনৈতিক হয়, তাহলে সেদিক থেকেও সরকার সফল। এখন সরকারের হাতে যদি পূর্ণ তথ্য থাকে; খালেদার মুক্তিতে বিএনপিতে ফাটল ধরার শতভাগ সম্ভাবনা, তবেই খালেদার মুক্তির সম্ভাবনা আশা করা যায়।

না হয় ২০২০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এ দুটি উৎসবে আন্দোলনের নামে কোনো বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত থাকে, তাহলে সরকার কোনো ধরনের ঝুঁকি নেবে না।

যদিও বন্দি খালেদার মুক্তি নিয়ে বিএনপির ঘরে আশা জাগছে। তারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে প্রমাণ হচ্ছে, এতদিন খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির বিষয়ে তারা আদালতকে বাধা দিয়েছেন।

সরকার আগামী দিনে আর কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। আর জ্যেষ্ঠদের ঠাণ্ডা রাখতে নরম কর্মসূচি ও আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে কিছুটা তাজা রাখতেও গত স্থায়ী কমিটিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন তারেক জিয়া।

তবে আশা জাগলেও খালেদার মুক্তি প্রসঙ্গে লন্ডন নেতা ও মির্জা ফখরুল অনেকটাই আতঙ্কে রয়েছেন বলে দলের বড় একটি অংশের দাবি। দীর্ঘ ১৬ মাসে তারেক-ফখরুল সিনিয়রদের বাদ দিয়ে যত সেটআপ দিয়েছেন তা বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। অনেক সিদ্ধান্তের জবাবও এই দুজনকে দিতে হবে।

কারণ খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে আন্দোলন ও রাজনৈতিক ভূমিকার যে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন এবং নির্বাচনে পরাজয় ঘটলে আন্দোলনের ছক তৈরি করে গেছেন, অদৃশ্য কারণে এর কিছুই করা হয়নি।

খালেদা জিয়া মুক্তি ও বিজয়ের মাধ্যমে দেশ পরিচালনার ইশারা নিয়েই আদালতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কারাগারে গেছেন। ছিল আন্তর্জাতিক সবুজ সংকেতও। মুক্তি পেয়ে নির্বাচনে গেলে খালেদা জিয়া আবারো দেশ পরিচালনা করবেন। অবশেষে সব ছকই ভেস্তে গেলো এই নেতার জন্য।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তারেক শুধু তার হিসাবের খাতাই পূরণ করছেন। খালেদার ১৬ মাস অনুপস্থিতিতে তারেক জ্যেষ্ঠদের বাদ দেয়ার যে প্ল্যান করেছেন তা দলের অনেকেই জানেন। দলের শীর্ষ নেতাদের ধারণা এমন, তারেক অধ্যায় পর্যন্ত যদি রাজনীতিতে খালেদাপন্থিরা সক্রিয় থাকেন, তাহলে তারেকের পথ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। সিনিয়র-জুনিয়র ব্যবধানে তারেকের নেতৃত্ব সহজ হবে না।

তাই তাদের (খালেদা অনুসারীদের) তারেক অধ্যায়ের আগেই ব্যর্থতার কাতারে ফেলে দলত্যাগে বাধ্য করতে সব ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করেছেন তিনি। অনেকে এটি জেনেও শেষ সময়ে সম্মান রক্ষায় নীরব রয়েছেন।

এখন বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র মতে, স্কাইপি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে তারেক জিয়া সবসময় তার অনুগত লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। আলাদা সিন্ডিকেট তৈরি করে রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিচ্ছিন্নভাবে অনেকের সঙ্গেই কথা বলছেন। তবে সমর্থন ছাড়াই দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর মাধ্যমে অস্তিত্ব ও টিকে থাকার কৌশলে দল পরিচালনা করছেন।

রিজভীর মাধ্যমে পল্টন চাঙ্গা রাখছেন আর ফখরুলের মাধ্যমে গুলশান। আর তৃণমূলের যেসব নেতাকে আগামীর নেতৃত্বে প্রয়োজন শুধু তাদের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন। উপরের নির্দেশ মতে, ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রুহুল কবির রিজভী সবসময় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নরম বাণী দিয়ে যাচ্ছেন।

দল এখন তারেক জিয়ার একক সিদ্ধান্তেই চলছে। স্থায়ী কমিটিতে দল পরিচালনার সিদ্ধান্ত ছাড়াই বাকবিতণ্ডায় শেষ হওয়ার পর গতকাল দলের শীর্ষ ফোরামে উপস্থাপন ছাড়াই দুই স্থায়ী কমিটির নাম ঘোষণার পর এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জানা যায়, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন সদস্য করা হয়েছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্থায়ী কমিটিতে নতুন এই দুই সদস্যকে মনোনীত করেছেন। স্থায়ী কমিটিতে স্থান পাওয়া দুজনই সাবেক মন্ত্রী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু শেখ পরিবারের বেয়াই এবং সেলিমা রহমান সরকারের পার্টনার ও সাবেক মন্ত্রী ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেননের বোন হিসেবে বিভিন্ন সময় আলোচিত। স্থায়ী কমিটির সদস্য পদপ্রত্যাশী হিসেবে সর্বাধিক আলোচিত আবদুল্লাহ আল নোমান, শামসুজ্জামান দুদু, ড. এসএম আসাদুজ্জামান রিপন এবারো সুযোগ পেলেন না। অবশ্য এখনো স্থায়ী কমিটির তিনটি পদ খালি আছে। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৯। কাউন্সিলের পর স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে ১৭ জনের নাম ঘোষণা হয়েছিল।

তারা হলেন— বেগম খালেদা জিয়া (চেয়ারপারসন), তারেক রহমান (ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান), মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (মহাসচিব), ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, তরিকুল ইসলাম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, এম কে আনোয়ার, মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সালাহউদ্দিন আহমেদ।

এর মধ্যে তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ার ইন্তেকাল করেছেন। ফলে স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ১৪ জন। এখন দুজন নতুন মনোনয়নের ফলে সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ালো ১৬ জনে। এখনো শূন্য রয়েছে তিনটি পদ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত