শিরোনাম
পাঁচ ধাপে ১৪৩ উপজেলায় নৌকার পরাজয়

নৌকাবিরোধী এমপি-মন্ত্রীরা আ.লীগের নজরদারিতে

প্রিন্ট সংস্করণ॥রফিকুল ইসলাম  |  ০০:২৮, জুন ২০, ২০১৯

গত মঙ্গলবার পঞ্চম ও শেষ ধাপের ভোটগ্রহণের মধ্যদিয়ে সমাপ্ত হয়েছে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এদিকে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক  উপজেলাতে হেরেছে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা।

মূলত স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের ক্ষমতার দাপটেই হেরেছে তারা। তবে এবার নৌকার বিরোধিতা ওই সকল এমপি-মন্ত্রীদের কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। নৌকাবিরোধী এমপি-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে নেয়া হবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা।আগামীতে তাদের দলীয় পদের ব্যাপারেও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে, যার মাধ্যমে পদ হারাতে পারেন অনেকে।

গত ১০ মার্চ থেকে সারা দেশে শুরু হয়েছে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচন মোট পাঁচটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। সব কটি ধাপের ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পান্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরষ্কুশ বিজয় অর্জনের মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে দেশের ১৪৩টি উপজেলায় নৌকার প্রার্থীরা হেরেছেন। অথচ বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো এবার ভোটের মাঠে ছিল না। অনেকটা একতরফা এই নির্বাচনেও বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছেন আ.লীগের
প্রার্থীরা।

ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পঞ্চম স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক উপজেলাতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা হেরেছেন। নির্বাচনে আ.লীগের নৌকা হেরেছে সেগুলো হলো— শেরপুরের নকলা, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী, মাদারীপুর সদর, রাজবাড়ীর কালুখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া ও খুলনার ডুমুরিয়া।

এর আগে ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ ধাপের নির্বাচনে ময়মনসিংহের আটটি উপজেলার মধ্যে ছয়টিতেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা হেরে যান। খুলনার ছয়টির মধ্যে চারটি। টাঙ্গাইলের চারটি। কুমিল্লায় দুটিতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি, মুন্সিগঞ্জের দুটিতে, পটুয়াখালীর একটি, ভোলার একটিতে ও ঢাকার একটি।

এর আগে তৃতীয় ধাপে লক্ষ্মীপুর তিনটি, কক্সবাজারের চারটি উপজেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হন আ.লীগে দলীয় প্রতীকের প্রার্থীরা। এ ছাড়াও প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে বেশ কিছু উপজেলাতে হেরে যায় আ.লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। তবে অনুষ্ঠিত ওই উপজেলা নির্বাচনে আ.লীগের দলীয় প্রতীকের প্রার্থীদের পরাজয় মেনে নিতে পারেনি কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির বর্জনের কারণে উপজেলা নির্বাচনকে জমজমাট করতে এবার নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর পাশাপাশি দলের অন্যদেরও প্রার্থিতার সুযোগ তৈরি করে দেয় আ.লীগ। কেন্দ্রীয় এমন সিদ্ধান্তের পর পক্ষপাতিত্ব শুরু করে এমপি-মন্ত্রীরা।

এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের নেতাদের অভিযোগে ওই সকল এমপি-মন্ত্রীদের সতর্ক করেন আ.লীগের হাই-কমান্ড। কেন্দ্রীয় ওই নিদের্শনা অমান্য করে নৌকার জন্য অজানা আতঙ্কে পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে যান মন্ত্রী-এমপিরা।

উন্মুক্ত নির্বাচনে যেখানে তাদের চুপ থাকার নির্দেশনা রয়েছে সেখানে অনেক এমপি-মন্ত্রী অন্তরালে নৌকার বিরোধিতা করেন। শুধু বিরোধিতাই নয়, কোনো কোনো মন্ত্রী-এমপি নৌকার বিরোধিতা করে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি প্রচারণায় শামিল হন।

অনেকে আবার নৌকার প্রার্থী ও প্রশাসনকেও নানা ধরনের হুমকি-ধামকি দিয়ে নৌকার পরাজয় নিশ্চিত করেন। উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারী মন্ত্রী-এমপিদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ আ.লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভোটের মাঠে তাদের কার্যকলাপ ভালোভাবে নেননি তিনি। ওই সকল মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, নৌকার বিরোধিতাকারী এসব মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে কেন্দ্রে একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েছেন নৌকার প্রার্থী ও জেলা আ.লীগ নেতারা। এসব অভিযোগ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে প্রায় অর্ধশত মন্ত্রী-এমপির তালিকা এখন আ.লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরে।

দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে যে সকল মন্ত্রী-এমপিদের কপাল পুড়তে পারে— গাজীপুরের সিনিয়র মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে গাজী গোলাম দস্তগীর (বীর প্রতীক), নাটোরের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস ও সংসদ সদস্য শহীদুল ইসলাম বকুল, কুমিল্লা-২ আসনের এমপি সেলিমা আহমাদ মেরী, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-৫ আসনের এবাদুল করিম বুলবুল, টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারী, ময়মনসিংহ-৯ আসনের আনোয়ারুল আবেদীন খান তুহিন, মুন্সীগঞ্জ সদরে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ড. আজিজ, সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপি, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলসহ আরো অনেক এমপি-মন্ত্রী রয়েছেন।

এসব মন্ত্রী-এমপি কোনো সময় অন্তরালে এবং কখনো সরাসরি নৌকার প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে নৌকার প্রার্থী এবং জেলা আ.লীগ সংবাদ সম্মেলন করেও অভিযোগ জানান। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও নির্বাচন কমিশনের আদেশের পরও সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রীদের লাগাম টানা যায়নি।

স্থানীয় রাজনীতির ত্রাণকর্তা এখন ওই আসনের সাংসদ। জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড— সব কমিটিতে তার একক কর্তৃত্ব। জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ সব নির্বাচনেই সাংসদপন্থিরাই মনোনয়ন ও নির্বাচিত হন।

আ.লীগের একাধিক সূত্র জানায়, পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আ.লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়েছে। বিভক্ত হয়ে পড়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীরা। জেলা-উপজেলার রাজনীতি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একাধিক উপজেলায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ও হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এতে আ.লীগের তৃণমূলে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছে অনেকেই। দলে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সারা দেশে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে অবিলম্বে এসব মন্ত্রী-এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে দলের বিভিন্ন ফোরামে।

আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক আমার সংবাদকে বলেন, নৌকার ওপর ভর করে আজ সংসদে কথা বলছেন। নির্বাচনি এলাকায় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর সেই নৌকার বিরোধিতা শুরু করেছেন। এটার জন্য আ.লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী কাছে জবাবদিহিতা করার জন্য প্রস্তুত থাকুন। নৌকার বিরোধীদের ছাড় দেয়া হবে না।

তিনি বলেন, ব্যক্তিস্বার্থ থেকে দলের স্বার্থ বড়। তাই আগামীতে দলকে আরো শক্তিশালী করাতে হলে এই রিবোধিতা সকলকে পরিহার করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, খুবিই কষ্ট পাই। যখন দেখি নেত্রী মনোনয়নপত্রে সাক্ষর করেছেন।

কিন্তু সেই প্রার্থীকে বাদ রেখে যারা অন্য প্রার্থীকে সাপোট দেয়।এমন বিষয় ও শৃঙ্খল দলের অনেকেই মেনে নিতে পারে না। এটা দলের প্রতি অনুগত হতে পারে না।

উপজেলা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া আ.লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নেক্সট ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। আমরা খুব দ্রুত ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক করব। আমাদের কাছে রিপোর্ট আছে। রিপোর্টের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত