শিরোনাম

লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পথে বাজেট বইয়ের ‘স্বাবলম্বী’ ফারজানার!

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১১:৫৪, জুন ২০, ২০১৯

বেশ কয়েকদিন হয়ে গেলো জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনা করা হয়েছে। এতে সরকারের বিভিন্ন সাফাল্য তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

এবারের এক ব্যাগ বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরবরাহ কৃত ‘শিশু বাজেট ২০১৯-২০’ বই হাতে এসেছে অনেকেরই কাছে। এই বইয়ে শিশুদের সাফল্য নিয়ে অনেক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ‘বিকশিত শিশু: সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক শিশু-বাজেট বইতে লালবাগের ফারজানার জীবনালেখ্যকে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ায় কেসস্টাডি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাজেট-বইয়ে ফারজানার পরিবারে অভাব-অনটন না থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবের চিত্র খানিকটা উল্টো। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও শুধু অভাবের কারণে তার উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির বিষয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অথচ শিশু বাজেট-বইয়ের দশম অধ্যায়ে পঞ্চম স্মারণীতে ‘স্বাবলম্বী’ হিসেবে দেখানো হয়েছে আঠারো বছরের এই তরুণীকে।

তাকে ২০০৮ সালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)-এর মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা প্রদানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।

তবে বাজেট বইয়ের সেই স্বাবলম্বী ফারজানার জীবন চলছে দুঃখে গাঁথা। তার বাবার ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে চলে তাদের কষ্টের সংসার।

মাধ্যমিকের গন্ডী পেরুনো ফারজানার এখন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে অর্থের সংকুলান হয় না। জীবন-যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে অসুস্থ বাবাকে সাহায্য করতে নিজেই কাজ করছে তাদের ছোট এক টেইলারিংয়ের দোকানে।

‘‘বিকশিত শিশু : সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’’ বইয়ের তথ্যে উঠে এসেছে- দুৎখ কষ্ট আর বাস্তবতার সাথে লড়াই করে কাটছিলো ফারজানা ও তাদের পরিবারের জীবন সংসার। বাবা-মা আর তিন ভাইসহ ৬ জন সদস্যের পরিবার।

রাজধানীর লালবাগ থানার শহীদনগর ৩ নং গলির একটি বাড়িতে বসবাস করতো। বাবা একটি সামান্য দোকানে কাজ করে যে অর্থ উপার্জন করতো তাতে তাদের বাসা ভাড়া দিয়ে তিন বেলা খাবার ঠিক মত জুটতো না, শিক্ষা গ্রহণের কোন সুযোগ ছিলো না।

সময়টা ছিলো অক্টোবর, ২০০৬। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন (২য় পর্যায়) প্রকল্পের মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য ফারজানাকে নির্বাচিত করা হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে এ সুযোগ পেয়ে ফারজানা লালবাগ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রের মাধ্যমে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

বইটিতে আরো বলা হয়, ফারজানার বয়স এখন ২০ বছর এবং ফারজানার বাবা হুমায়ন অসুস্থ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন (২য় পর্যায়) প্রকল্পের মাধ্যমে পরিচালিত টেইলারিং এর দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে লালবাগের শহীদ নগর এলাকার ২ নং গলিতে ফারজানা টেইলারিংয়ের দোকান দেয়। এখন সে নিজে সেলাই- এর কাজ করে অর্থ উর্পাজন করে তার পুরো সংসার এবং তার ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছে।

অথচ সরেজমিন আমার সংবাদ টিমের কাছে উঠে আসে তার উল্টো চিত্র। তার পরিবার ছোট এক টুপরি ঘরে বসবাস করছে। তাদের টেইলার্স এর ছোট এক দোকান থাকলেও নেই তেমন সক্ষমতা। কোন রকমে দিনযাপন করছে ফারজানার পরিবার।

আমার সংবাদকে ফারজানা দুঃখ করে বলে, আমি ছোট থেকেই অভাবের মধ্যে বড় হয়েছি। এখন মাধ্যমিক পাশ করেছি। তবে উচ্চ মধ্যমিক পড়শোনার খরচ নিয়ে সংঙ্কায় আছি। তার অসুস্থ বাবাকে নিয়ে চলাচল তাদের পরিবারের জন্য অনেক কষ্ট হয়ে দাড়িয়েছে বলে জানায় ফারজানা।

২০০১ সালে জন্ম নেওয়া ফারজানা ২০০৯ সালের কথা উল্লেখ করে সে বলে তখন আমার বয়স ৮ বছর। এলাকায় এক সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ৬ মাসের ট্রেনিং নেই। এরপর কোন কিছু পাইনি। নিজের পরিশ্রমে কাজ করছি।

ট্রেনিং এর প্রায় ৫ বছর পর ২০১৪ সালে এনজিও থেকে লোন করে আমার জমানো কিছু টাকা এইসব মিলিয়ে বাবা একটা ছোট দোকান ভাড়া নেয়। বাবাও টেইলার্স এর কাজ যানে, সেখানে টেইলার্স দোকান করা হয়। এখন কোন মতে সংসার চলে। অসুস্থ বাবার কথা চিন্তা করে সেও টেইলার্সের কাজে সাহায্য করে বলে জানায় ফারজানা।

তবে বাজেট বইয়ের তথ্যে উঠে আসে ২০০৬ সালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্পের মাধ্যমে ফারজানাকে ট্রেনিং দেওয়া হয়। তাহলে ফারজানার জন্ম তারিখ অনুযায়ী ৫ বছর বয়সে একটি শিশুকে কিভাবে সেলাই প্রশিক্ষন দেওয়া হয় এমনটাই প্রশ্ন অনেকের। তথ্যে উঠে এসেছে ছোট ভাইদের লেখাপড়ার কথা অথচ ফারজানার এক ভাই প্রতিবন্ধী আর ছোট দুই ভাই অভাবের তাড়নায় অন্যের দোকানে কাজ করে।

এতো কিছুর পরও উঠে দাঁড়াতে চায় ফারাজানা। তার আশা ভবিষ্যতে আইনজীবী হওয়া, তবে তার বর্তমান অবস্থায় সে পথ অন্ধকার। ফারজানার সরকারের কাছে আকুতি, যদি সরকারের কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পান।

তাহলে সে তার মত গরীব ছেলে-মেয়েদের জন্য নিজেই একটা সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলবে। এবং দেশটাকে স্বাবলম্বী করার কাজে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সাক্ষাতকার নিয়েছেন বেলাল হোসেন ও এনায়েত উল্লাহ

ছবি তুলেছেন সুমন আহমেদ সানি

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত