শিরোনাম

সড়কে পাথর বালু সমপরিমাণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ১৬:৩৬, জুন ২৬, ২০১৯

৭৫ শতাংশ পাথরের খোয়া এবং বাকিটা বালু মিশানোর কথা। কিন্তু নিয়মের তোয়াক্কা না করে রাস্তা নির্মাণে ম্যাকডামের (কার্পেটিংয়ের নিচের স্তর) বালু ও পাথর প্রায় সমান করে ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, পাথরের খোয়ার পরিবর্তে ইটের খোয়াও ব্যবহার করা হয়েছে।

এভাবেই মোংলাবন্দরের সড়ক নির্মাণে ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়ে। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বালু ও পাথরের অনুপাতও মানা হয়নি। এটি যেনতেন কোনো প্রকল্পে নয়, মোংলাবন্দরের রোজভোল্ট জেটির বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবচিত্র।

শুধু এটি নয়, বাগেরহাট জেলার মোংলাবন্দরের চেহারা বদলাতে চলমান ৬টি প্রকল্পেই কোনো না কোনো ত্রুটি, অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগেও মানা হয়নি নিয়ম।

বাস্তবায়নেও ধীরগতি। বাস্তব অগ্রগতির হার খুবই কম। এছাড়া খুলনা-মোংলা পোর্ট রেল প্রকল্পেও অনিয়ম হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এডিপিভুক্ত প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে মোংলা বন্দরের চেয়ারম্যান কমডোর এ কে এম ফারুক হাসানের (এন) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, পরিমাপের সময় সঠিক জায়গায় না পড়ায় সড়কে পাথর ও বালু মেশানের ব্যাপারে তথ্যের ভুল হয়েছে। পিডির অনুপস্থিতিতে প্রকল্প পরিদর্শন করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। পরে বুয়েট থেকে পরীক্ষা করা হয়েছে। তা ঠিকই পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন প্রকল্পের বাস্তবায়নের অগ্রগতির ব্যাপারে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের বরাদ্দকৃত সব অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে। লোকবল কম থাকায় একই অফিসারকে একাধিক প্রকল্পের পিডি নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯৮ শতাংশ সমুদ্রপথে অর্থাৎ সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আশ্চর্যজনক বা হতাশাজনক হলেও সত্য যে, দেশে দুটি সমুদ্রবন্দর থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে একটিমাত্র বন্দর অর্থাৎ চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।

অপরদিকে, দেশের দ্বিতীয় মোংলাবন্দর ২০০৮ সাল পর্যন্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচিত ছিল। দীর্ঘ ১৮ বছর লোকসানের বোঝা টানার পর মোংলাবন্দর এখন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে বর্তমান সরকারের নেক নজর এবং সদিচ্ছার কারণে।

কারণ মোংলাবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। কয়েকটি চলমান। আবার সম্প্রতি কয়েকটির অনুমোদনও দিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য ঢাকা-মাওয়া-মোংলা মহাসড়ক উন্নয়ন, পদ্মা সেতু নির্মাণ, খানজাহান আলী বিমান বন্দর নির্মাণ, রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, মোংলাবন্দর এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা, মোংলা ইপিজেড সমপ্রসারণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন কাজ এগিয়ে চলছে।

এসব হচ্ছে মোংলাবন্দরকে কেন্দ্র করে অর্থাৎ এগিয়ে নেয়ার জন্য। তাই বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি ও বিশ্ব বাণিজ্যের আলোকে বন্দরের আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয় সরকার।

এ জন্য অসংখ্য প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে মোংলাবন্দরের উন্নয়নে। এসব কাজ ২০২১ সালে সম্পন্ন হবে। মোংলাবন্দর কর্তৃপক্ষের রোজভোল্ট জেটির বিদ্যমান অবকাঠমো উন্নয়ন প্রকল্পটি ছিলো খুবই স্বল্প সময়ের জন্য। প্রায় ১২০০ মিটার রাস্তার জন্য এ প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৪ কোটি টাকা।

তা ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার কথা। কিন্তু তা তো হয়নি, বরং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ওই প্রতিবেদনে ত্রুটি-বিচ্যুতি উল্লেখ করা হয়েছে। রাস্তা কার্পেটিংয়ের আগে ম্যাকাডাম যথাযথ হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী পাথর ও বালু দেয়া হয়নি। বরং সমান সমান করে দেয়া হয়েছে।

এছাড়া কোথায় কোথায় পাথরের খোয়ার জায়গায় ইটের খোয়াও ব্যবহার করা হয়েছে। সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রকল্প পরিচালক ও মোংলাবন্দর কর্তৃপক্ষের উপ-প্রধান প্রকৌশলী মো. বজলুর রহমান এ প্রতিবেদককে জানান, টেন্ডার করতে কিছু সময় চলে গেছে।

এক বছরে সব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব না হওয়ায় ৬ মাস সময় বাড়ানো হয়। চুক্তি অনুযায়ী এ জুন মাসেই প্রায় ১২০০ মিটার রাস্তার কাজ শেষ করা হয়েছে। এতে কোনো অনিয়ম হয়নি। কাজের ব্যাপারে তিনি সন্তুষ্ট বলে জানান।

মোংলাবন্দরের গতি বাড়াতে মোংলাবন্দর হতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। এটি ২০১৬ সালের জুলাই শুরু হয়ে ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। তাতে ১৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। কিন্তু প্রকল্পটির অগ্রগতি খুবই ধীর।

এতে প্রায় ৩৯ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং করার কথা থাকলেও গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৭ লাখ ঘনমিটার হয়েছে। সময় এক বছর বাড়ানো হলেও ২০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। তাই বাকি সময়ে কিভাবে সব কাজ সম্পন্ন হবে সে ব্যাপারে সংশয়ের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে প্রকল্প পরিচালক ও মোংলাবন্দরের প্রধান প্রকৌশলী এসকে শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার সংবাদকে বলেন, বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে। প্রায় ৩৯ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের মধ্যে ৩৫ লাখ সম্পন্ন হয়েছে। তাতে অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশ এবং টাকার পরিমাণ ৩৫ কোটি টাকা বলে জানান প্রধান প্রকৌশলী।

মোংলাবন্দরের আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে- ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম প্রবর্তন। প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুনে শেষ করার কথা। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পার হলেও গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ।

পূর্ত কাজের দরপত্রও আহ্বান করা হয়নি। বাকি ৯০ শতাংশ কাজ ছয় মাসে করা সম্ভব নয় বলে আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। অপরদিকে চলতি অর্থবছরেই প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা খুবই অপ্রতুল।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব- ডিপিপি অনুযায়ী কাজ অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্বিক ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে পিডি না হলেও প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হারবার মাস্টার কমান্ডার দুরুল হুদা বলেন, প্রকল্প সংশোধন করে সময় এক বছর বাড়ানো হয়েছে।

আগামী জুনে শেষ হবে। এলসি ওপেন করা হয়েছে। ড্রয়িং ও ডিজাইন করা হয়েছে। কনস্ট্রাকশনের কাজও শুরু হয়েছে। বর্তমানে অগ্রগতি ২৫ শতাংশ। তাই বাকি সময়ে সব কাজ বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান তিনি।

মোংলা বন্দরের হারবার চ্যানেলের ফুড সাইলো এলাকায় ড্রেজিং প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১৯ আগস্টে সরকার অনুমোদন দেয়। গত বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ড্রেজিং কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সার্বিক ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। দেশের দ্বিতীয় বন্দরকে সাজাতে মোংলাবন্দরের চ্যানেলের আউটার বারে ড্রেজিং প্রকল্পটিরও অনুমোন দিয়েছে সরকার।

২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালে তা বাস্তবায়ন করার কথা। ৭১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে জাহাজ হ্যান্ডেলিং করার জন্য নাব্য বৃদ্ধির এ প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করা হয়েছে। তবে পিডি নিয়োগে মানা হয়নি নিয়ম। কারণ অত্যন্ত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে একজন পূর্ণকালীন পিডি নিয়োগের কথা বলা হলেও এর ব্যত্যয় ঘটেছে। অন্য প্রকল্পের পিডি হওয়ার পরও উপ-প্রধান প্রকৌশলী মো. বজলুর রহমান এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়া মোংলাবন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়মিত দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। তাই কৌশল অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্বিক ব্যাপারে পিডি বজলুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে না হওয়ায় এ অবস্থা।

ড্রেজিংয়ের কোনো কাজই শুরু হয়নি। তবে ডাইকের কিছু কাজ হয়েছে। সবমিলে বাস্তব অগ্রগতি ১০ শতাংশ বলে জানান তিনি। একই ব্যক্তি একাধিক প্রকল্পের পিডি নিয়োগ হওয়া যায় না, এটা আমি জানি। কিন্তু সরকার চিঠি দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছে। তাই পিডির দায়িত্ব পালন করছি বলে জানান উপ-প্রধান প্রকৌশলী।

এছাড়া মোংলাবন্দরের জন্য টাগবোট সংগ্রহ প্রকল্পটিরও অনুমোদন দেয় সরকার। এক বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ৪৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয় করে টাগবোটটি মালয়েশিয়ায় নির্মাণ করা হয়। এর পিডিও হচ্ছেন অন্য প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কমান্ডার দুরুল হুদা। সার্বিক ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, নির্ধারিত সময়েই শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

মার্চে জাহাজ এসেছে দেশে। বর্তমানে লাভ করতে এ প্রকল্পে যা যা করা দরকার তাই করা হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া খুলানা-মোংলা পোর্ট পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোড টেস্ট ছাড়া ওয়াকিং পাইলের কাজ করা হয়।

একই সঙ্গে ফুলতলা স্টেশনের ফাংশনাল ভবনের ছাদ ঢালাই কাজে স্ক্যাফোল্ডিংয়ের পরিবর্তে বাঁশ এবং ওয়াটার টাইট স্টিল সাটারের পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। মূল ঠিকাদার প্যাকেজ-১ এর কাজ ৮টি সাব-প্যাকেজে স্থানীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করায় কাজের গুণগত মান নিয়ে সংশয় রয়েছে। সব মিলে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যতই দিন যাচ্ছে মোংলাবন্দরের চাহিদা ততই বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার। এজন্য মোংলাবন্দরের কার্গো ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়াতে অত্যাবশ্যকীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ নামে সম্প্রতি একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। চলতি বছর থেকে ২০২১ সালের জুনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে মোংলাবন্দর কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর, কর্পোরেশন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের উন্নয়নে ৩৩টি প্রকল্প চলমান। এর মধ্যে শুধু মোংলাবন্দরের উন্নয়নে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত চলমান প্রকল্প ছিলো ছয়টি। পরে আরও একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত