শিরোনাম

ময়লা-আবর্জনা থেকে সম্ভাবনার ইট

প্রিন্ট সংস্করণ ॥ ফারুক আলম  |  ১৬:৪৪, জুন ২৬, ২০১৯

রাজধানীর ময়লা-আবর্জনা থেকে ইট তৈরি করা যেতে পারে বলে ভাবছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে লাল-সবুজ রঙের ইট তৈরিও করা হয়েছে। যা সিটি কর্পোরেশনের মূল সড়ক, অলিগলির রাস্তাঘাট ও ড্রেন নির্মাণে ব্যবহার করা যাবে। এটি যেমন টেকসই তেমনি স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারবেন নগরবাসী। সাধারণ ইটের মতোই হবে স্থায়িত্বকাল। সহজে ভেঙে পড়বে না।

নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, বাংলাদেশ দ্রুত এগিয়ে যাওয়া নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বের কাতারেও পৌঁছার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু কীভাবে এগোচ্ছে সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। কারণ একটি দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী।

সেই রাজধানী ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে নগরীতে। এ নিয়ে খোদ ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন চরম বিপাকে পড়ার মুহূর্তেই বর্জ্য নিয়ে এক নতুন উদ্ভাবনে নতুন সম্ভাবনা দেখছে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে বছরে ২৮ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় পরিবেশ দূষণজনিত অসুখবিসুখে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ। দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। বিশেষ করে শহর এলাকায় দূষণরোধ করতে ও পরিবেশ রক্ষায় ময়লা-আবর্জনার ব্যবস্থা নিতে হবে।

সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ময়লা-আবর্জনা থেকে পরিবেশবান্ধব ‘লাল-সবুজের কংক্রিট’ তৈরির পরিকল্পনা করছে ডিএসসিসি। যা গোটা দুনিয়ার মানুষকে তাক লাগিয়ে দেবে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ছাড়াও এসব উদ্ভাবন অনেক প্রয়োজনীয় চাহিদাও মেটাতে সাহায্য করবে।

পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পোড়া ইটের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে বছরে ফসলি জমির শতকরা ১ ভাগ কমে যায়। ২০৪১ সালে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা হবে ২৩ কোটি। এভাবে ফসলি জমি কমলে পাঁচ কোটি লোকের খাবারে ঘাটতি পড়বে। এ জন্য এখন থেকেই এ ধরনের ইট তৈরির কথা ভাবছে ডিএসসিসি।

সরকারি প্রতিষ্ঠান হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিবছর দেশে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ইট তৈরি হয়। এতে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টন ভূমির উপরিভাগের উর্বর মাটি ব্যবহার করা হয়। ইট পোড়াতে ৫০ লাখ টন কয়লা ও ৩০ লাখ টন কাঠ ব্যবহার করা হয়।

এতে প্রায় দেড় কোটি টন কার্বন নিঃসরণ হয়। সেখানে বর্জ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী ইট ব্যবহার করলে দূষণ হবে না। কৃষিজমি নষ্ট কম হবে। পোড়ানো ইটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই ইট বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলেও সিটি কর্পোরেশন ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজে লাগানো যাবে।

ডিএসসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দেশে গতানুগতিক তৈরি ইটের বহুল ব্যবহার হয়ে আসছে। ইট তৈরিতে কৃষি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বহুল ব্যবহূত হয় এবং প্রচুর জ্বালানি প্রয়োজন হয় যা দেশের বনজসম্পদ এবং কৃষি জমি হ্রাসের অন্যতম কারণ।

তবে সিটি কর্পোরেশন বাসা-বাড়ির শক্ত আবর্জনা ও বহুতল ভবন ভাঙা রাবিশ দিয়ে লাল-সবুজের কংক্রিটের পরিকল্পনায় পরিবেশ দূষণ রোগের সাথে কৃষি জমি রক্ষা পাবে।

জানা যায়, বর্জ্য থেকে তৈরি ইটের খরচ প্রচলিত ইটের খরচের অর্ধেক। যদি সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত, রাজউক, সিটি কর্পোরেশন ও এলজিইডি রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণে সম্পৃক্ত করে, তাহলে মানুষ এটি দেখে বর্জ্য থেকে ইটের ব্যবহারে উৎসাহিত হবে।

সূত্র জানায়, বর্জ্য থেকে ইট তৈরিতে প্রথমে হোঁচট খেতে হতে পারে। তাই বলে পিছিয়ে গেলে হবে না। সবকিছুকে অতিক্রম করেই সাফল্যের দেখা মিলবে। এতে বর্জ্য নিয়ে সিটি কর্পোরেশন যে সমস্যায় পড়েছে সেটির একটি বড় সমাধান আসবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, বর্জ্য থেকে তৈরি কংক্রিটের ভিতরে প্রতিটি উপাদান, কংক্রিটের ভিতরকার আকার, রসায়ন, অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা, আর্দ্রতার পরিমাণ, কংক্রিটে কতটা ফাইবার আছে ও কী ধরনের ফাইবার এসব প্যারামিটার দিয়ে কংক্রিটের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

এছাড়া বর্জ্য থেকে ইট তৈরি করার আগে জনগণের চাহিদার কথা ভাবতে হবে। ইট টেকসই হবে কিনা সেজন্য কয়েক ধাপে টেস্ট করতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জনগণের চাহিদা ছাড়া প্রকল্প হাতে নিলে জনগণের টাকায় নষ্ট হবে। কারণ প্রকল্পগুলো জনগণের টাকায় নেয়া হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দূষণ, কৃষিজমি নষ্ট, পরিবেশের ক্ষতির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ সংশোধন করার তাগিদ দেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, বর্জ্য থেকে ইট তৈরি করা যেতে পারে। তবে এ ইট দিয়ে বাসা-বাড়ির বিল্ডিং বানানোর দরকার নেই, সিটি কর্পোরেশনের রাস্তা, ফুটপাত ও ড্রেন মেরামতের কাজে লাগবে। সিটি কর্পোরেশন নিজেই বর্জ্য থেকে ইট তৈরি করে নিজেই ব্যবহার করতে পারবে।

তবে এটিতে কমার্শিয়াল চিন্তাভাবনা করলে হবে না, আমাদের মূল উদ্দেশ্য বর্জ্য নিঃশেষিত করা। বর্জ্য থেকে যে পরিমাণ ইট আসবে তা দিয়ে সিটি কর্পোরেশনের বেশকিছু রাস্তা-ড্রেনের কাজ করা যাবে।

তিনি আরও বলেন, বাসা-বাড়ির শক্ত জিনিসপত্র ও পুরনো ভবন ভাঙার রাবিশ থেকে ইট তৈরি করতে বিদেশি কোনো গবেষণার দরকার নেই, নিজেরাই বর্জ্য থেকে নতুন ইট বানাতে পারে। তাছাড়া বর্জ্য নিঃশেষিত করতে নানান মুখী পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।

প্রসঙ্গত, জ্বালানিসাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইট তৈরির প্রকল্প। বর্তমানে বাজারে তৈরি আগুনে পোড়া একটি ইটের দাম পড়ে ১০ থেকে ১২ টাকা। অথচ পরিবেশবান্ধব বর্জ্য থেকে ইটের দাম পড়বে প্রায় ৮ থেকে ৯ টাকা। সিটি কর্পোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও ড্রেনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে বর্জ্য থেকে তৈরি করা ইট ব্যবহার করা যাবে।

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত