শিরোনাম
৯ বছর পর এমপিওভুক্তি

এবারো বঞ্চিত সাড়ে ৬ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ  |  ১৭:০২, জুন ২৬, ২০১৯

*আবেদন করেছে ৯ হাজার ৬১৪টি প্রতিষ্ঠান
*বৈধ আবেদন ২ হাজার ৭৬২টি
*সর্বশেষ ২০১০ সালে এমপিও হয় ১৬৪২টি প্রতিষ্ঠান
*সর্বোচ্চ ৩ হাজার প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দেয়া হবে

দীর্ঘ নয় বছর পর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সিদ্ধান্তের আলোকে গত বছরের জুলাই মাসে এমপিওভুক্তির জন্য জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ জারি করে সরকার।

তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পাশের হার- এই চার মানদণ্ড বিবেচনায় আবেদন চাওয়া হয়। তার আলোকে এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করে ৯ হাজার ৬১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এর মধ্যে সব শর্ত পূরণ করে আবেদন করেছে ২ হাজার ৭৬২টি প্রতিষ্ঠান। আর সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে সর্বোচ্চ ৩ হাজার প্রতিষ্ঠানকে এ দফায় এমপিওভুক্ত করা হবে। সেই হিসেবে এবারো কাঙ্ক্ষিত এমপিও থেকে বঞ্চিত থাকবে সাড়ে ৬ হাজার প্রতিষ্ঠান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দেশের প্রতি উপজেলায় অন্তত দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারে; পাশাপাশি যোগ্য সব প্রতিষ্ঠানও এমপিও পাবে।
দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির জন্য আন্দোলন করে আসা শিক্ষকরা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ ৯ বছর ধরে এমপিওভুক্ত করা হয় না।

এতদিন পর এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েও যদি সাড়ে ৯ হাজারের মধ্যে তিন হাজার অর্থাৎ তিন-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানকেই বাদ দেয়া হয়; তবে তা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং এ সিদ্ধান্ত আমাদের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেবে।

এছাড়া সব প্রতিষ্ঠানকে একসাথে এমপিও দেয়ার মতো অর্থ সরকারের বরাদ্দ না থাকলে, আংশিক বেতন দিয়ে সব প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুবিধার আওতায় আনার দাবি জানান শিক্ষকরা।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কাউকে বঞ্চিত করার লক্ষ্য সরকারের নেই। যোগ্য বিবেচিত সব প্রতিষ্ঠানকেই এমপিও দেয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে গত সোমবার জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, যোগ্য বিবেচিত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

কাউকে বঞ্চিত করা সরকারের লক্ষ্য নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির জন্য যে ৪টি ক্রাইটেরিয়া ধরে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল, তার ভিত্তিতে এমপিওর জন্য যোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যেসব শিক্ষক টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের নোট পড়াতে, গাইড বই পড়তে, কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করে। যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে আমরা তাদের তো পুরস্কৃত করতে চাই না। ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিলে যোগ্যতার কদর থাকে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেয়া মানদণ্ডগুলো হলো- প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক স্বীকৃতি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় পাসের হার। প্রতিটি মানদণ্ডের জন্য ২৫ নম্বর রাখা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রীর ওই বক্তব্য আমলে নিলেও বোঝা যায়, এমপিওবিহীন বড় একটি অংশের শিক্ষকদের বঞ্চনা থেকেই যাচ্ছে। ফের তাদের রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।

জানা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে এমপিওভুক্তির দাবিতে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যানারে কয়েক হাজার শিক্ষক আন্দোলন করে। সে সময় প্রায় এক মাস অনশন কর্মসূচিও পালন করে তারা। পরে সরকারের তরফ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওর জন্য আবেদন করতে বলা হয়।

যার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিম্ন-মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ৯ হাজার ৬১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে তাদের আবেদন জমা দেয়। এরপর সরকারের করা নীতিমালা অনুসারে যোগ্য প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভেরিফিকেশন করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের ভেরিফিকেশন অনুসারে সব শর্ত পূরণ করে আবেদন করে ২ হাজার ৭৬২টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বিদ্যালয় ও কলেজ এক হাজার ৬২৯টি, মাদ্রাসা ৫৫১টি এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৫৮২টি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব উত্থাপনের পর থেকেই এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। ঠিক কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, এর সংখ্যা তিন হাজারের বেশি হবে না।

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার আমার সংবাদকে বলেন, দীর্ঘ ৯ বছর পর এমপিওভুক্তির জন্য সরকার আবেদন সংগ্রহ করেছে। এ জন্য আমাদের দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে।

প্রায় সাড়ে নয় হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওর জন্য আবেদন করেছে। আমরা চাই সরকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করবে। অনেকের কাছে মনে হতে পারে সাড়ে নয় হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক বেশি।

কিন্তু এটাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে গত ৯ বছরে দেশে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া ৯ বছর পূর্বে যখন এমপিওভুক্ত করা হয় তাও সংখ্যায় ছিল খুবই সীমিত। সবকিছু বিবেচনায় নিলে সাড়ে নয় হাজার বেশি নয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা সব সময় বলে এসেছি, যদি অর্থের সংকুলান না হয় তবে আংশিক বেতন দিক। এরপরও একসাথে আবেদন করা সকল প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুবিধার আওতায় আনা হোক।

যদি সকল প্রতিষ্ঠানকে এবার না দেয়া হয় সেক্ষেত্রে এমপিও না পেয়েই অনেক শিক্ষক অবসরে চলে যাবেন। যা হবে অমানবিক। তাই সরকারকে অনুরোধ করবো এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এমপিওভুক্তি করা হোক।

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভূষণ রায় বলেন, আমাদের দাবি অত্যন্ত পরিষ্কার। আবেদনকৃত সব প্রতিষ্ঠানকেই এমপিওভুক্ত করতে হবে।

তবে সরকার বিষয়টি কিভাবে দেখছে তা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। কারণ গত মার্চে যখন আমরা প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলনে ছিলাম তখন শিক্ষামন্ত্রী নিজে এসে আমাদেরকে কথা দিয়েছিলেন তিনি আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবেন।

আমরা নিজেরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের সমস্যা তুলে ধরতে চাই। কারণ আমরা মনে করি প্রধানমন্ত্রীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সমস্যা জানতে দেয়া হচ্ছে না। এ কারণে আমরা নিজেরা তাকে বাস্তব অবস্থা জানাতে চাই। কিন্তু দেড় মাস হয়ে গেলেও আমাদেরকে দেখা করার ব্যবস্থা করা হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নীতিমালার আওতায় এমপিওভুক্ত হতে হবে এটাই নিয়ম। কিন্তু এর বাইরে শিক্ষকদের দাবির মুখে সরকার বাড়তি আরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করবে কিনা এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।

এদিকে এমপিওভুক্তির জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঠিক কত টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাজেটে বলা হয়েছে এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান রাখা হয়েছে।

বর্তমানে সারা দেশে ২৬ হাজারের কিছু বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। এর বাইরে স্বীকৃতি পাওয়া নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে সাড়ে ৫ হাজারের মতো।

এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মকর্তা রয়েছেন ৭৫ থেকে ৮০ হাজারের মতো। সর্বশেষ ২০১০ সালে এক হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে এমপিওভুক্তির জন্য আন্দোলন করে আসছেন নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত