শিরোনাম

শঙ্কায় জনগণ, সঙ্কটে রাজনীতিবিদরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥আবদুর রহিম  |  ০৮:১০, আগস্ট ১০, ২০১৯

ফাঁকা ঢাকায় রক্তের সঙ্কট! উৎসবের ছুটি বাতিল। হাসপাতালে ডেঙ্গুরোগীদের চিৎকার। গুজবে চলছে মানুষ হত্যা, কারাগারে হাজার হাজার বিরোধী রাজনেতা। যন্ত্রণায়-ভয়ে-হতাশায় এবারের ঈদ। বিপর্যস্ত বন্যায় এখনো দেশের বৃহৎ এলাকা। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যায় আতঙ্কের রেশ এখনো কাটেনি। ডেঙ্গুতে চলছে স্বজনহারার মৃত্যুমিছিল।

কেউ সন্তান হারাচ্ছে, কেউ বা স্ত্রী-স্বামী! ঈদুল আযহা সন্নিকটে। তবুও মানুষের মধ্যে নেই উৎসবের আমেজ। ঈদুল আজহার টানা ৯ দিন ছুটি পেয়েও এবার স্বজনদের সঙ্গে ঈদআনন্দ উপভোগ করতে পারছেন না সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। স্থানীয় সরকার বিভাগসহ দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

ছুটি বাতিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর। ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও বন্যার কারণে এ ছুটি বাতিল করা হয়েছে। এদিকে রাজধানী থেকে মানুষ গ্রামে চলে যাওয়া দেখা দিয়েছে ভয়াল আকারে রক্তের সঙ্কট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডেঙ্গুরোগীর স্বজনরা রক্ত খুঁজেও পাচ্ছেন না। ঈদের দিন থেকে এ সঙ্কট আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এদিকে সামপ্রতিক বন্যায় দেশের অন্তত ২৮টি জেলা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে কমপক্ষে ৬১ লাখ মানুষ; মৃত্যু হয়েছে ১১৯ জনের। সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি ঘরবাড়ি আর এক লাখ ৫৪ হাজার একর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় ভেসে গেছে অসংখ্য মাছের খামার। হাঁস-মুরগি আর গবাদি পশুর খামারিরাও মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। লাখ লাখ মানুষ এখনো একটু সাহায্যের জন্য তাকিয়ে আছে।

এদিকে সমপ্রতি গত দুই সপ্তাহে সারা দেশে মোট ২১টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। আহত হয়েছেন ২২ জন। সেই আতঙ্কের রেশ এখনো কাটেনি। এর মধ্যেই মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, প্রতিদিন দুই হাজারেরও অধিক রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৬৬৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে এখনো আট হাজার ৭৬৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। আর এ পর্যন্ত মারা গেছে ২৯ জন। তবে বেসরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা শতাধিক দাবি করা হচ্ছে।

এছাড়াও হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতার ঘরেও নেই ঈদআনন্দ। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ কারাগারে হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মী। অনেকে আবার মামলা-হামলার ভয়ে বাড়ি যেতে পারছেন না। ফেরারি অবস্থায় দিন কাটছে।

উৎসবের দিনেও পুলিশের ভয়ে প্রিয়জনদের দেখতে যেতে পারবেন না অনেকে। বিএনপি নেতাদের দাবি, ক্ষমতাসীন সরকারের দুঃসাশনে রাজনৈতিক দুঃসময় পার হচ্ছে। দেশের কোনো সংকট আওয়ামী লীগ মোকাবিলা করতে পারছে না। সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না আমার সংবাদকে বলেন, ডেঙ্গু আতঙ্কে পুরো দেশ। সরকার ঈদের আগেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এ ডেঙ্গু ঢাকা থেকে এখন প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে যাবে।

পুরো দেশের মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মানুষের মধ্যে ভয়, বিপাকে পড়া, এই সংকটের পুরো দায় এই ব্যর্থ সরকারের। একদিন পরই ঈদ এ ডেঙ্গুর ভয়ে এবারের ঈদ ম্লান হয়ে যাবে বলেও মনে করেন মাহমুদুর রহমান মান্না।

তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ঢাকা সিটির দুই মেয়র এখন পর্যন্ত মশা মারার ওষুধ আমদানি করতে পারেননি, কিন্তু তারা মশা মারার নাটক করছেন। মানুষের নিরাপত্তা, স্বস্তির স্বার্থে ঈদের আগেই তাদের বহিষ্কার করা উচিত।

তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গুর সিজন শেষ হতে এখনো তিন মাস বাকি। আগামী সেপ্টেম্বরে এটা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার কথা। আমাদের দেশে যখন ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার, তখন পশ্চিমবঙ্গে প্রকোপ কমে গিয়ে সামান্য পর্যায়ে আছে। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ সরকার থাকলে, সেটার ফল কী হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ তা দেখিয়েছে।

আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা না থাকলে, তার ফল কী হয়, সেটার প্রমাণ বাংলাদেশ। ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্যাম্প স্থাপন ও প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটানোর দাবি জানান মান্না। এ ছাড়া ঈদকে কেন্দ্র করে বন্যার্তদের পাশে সরকার ও আওয়ামী লীগ সঠিকভাবে পাশে না থাকায় লাখ লাখ পরিবারের মাঝেও ঈদ আসবে না বলে জানান তিনি।

খালেদা জিয়ার দেড় বছরের বন্দি ইস্যুতে বলেন, দেশের হাজার হাজার মানুষ খালেদা জিয়াকে ভালোবাসেন। নিজ দলের ও হাজার হাজার মানুষের কাছে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা রয়েছে। যারা খালেদা জিয়াকে পছন্দ করেন, তাদের মাঝেও ঈদ আনন্দ থাকবে না বলে দাবি করেন এই রাজনীতিবিদ।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া আমার সংবাদকে বলেছেন, এবার সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের জন্য বিষাদ ঈদ! বিশেষ করে বিএনপির জন্য। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দেড় বছর হলো এখনো মুক্তি মেলেনি। এ দলের যারা অনুসারী তারা অনেকেই কষ্টে ঈদ উদযাপন করবেন।

এ ছাড়া বিএনপিসহ সরকারবিরোধী সকল দলের নেতাকর্মী গ্রেপ্তার, হামলা-মামলার জন্য আতঙ্কে বাড়ি যেতে পারছেন না। এমন হাজার হাজার পরিবারেরও ঈদআনন্দ আসবে না। তিনি আরো বলেন, এ ছাড়া এ বছর বন্যাকবলিত লাখো পরিবারেও ঈদআনন্দ নেই। মহামারি ডেঙ্গুতে হাজার হাজার লোক হাসপাতালে ভর্তি। দেশের সব মানুষেই আছেন ডেঙ্গু আতঙ্কে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার কার্যত ভূমিকা পালন করে দেশের মানুষের পাশে থাকতে পারেনি। এ জন্য আমাদের খুবই কষ্ট লাগে। সবাইকে নিয়ে মানুষ ঈদ শান্তিতে কাটাবে, আনন্দে কাটাবে। কিন্তু সেই পরিবেশ ও পরিস্থিতি এ বছর নেই। মানুষের ঈদ এ বছর দুঃখে ভরা। সরকারের দায়িত্বহীনতার কারণে খুবই খুবই খারাপ লাগছে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব আমার সংবাদকে বলেছেন, ভয়াভহ বন্যার পর মহামারি ডেঙ্গুতে এবার ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে, কিন্তু সরকার জনগণের জন্য দক্ষতা ও দায়িত্বের সঙ্গে যে ভূমিকা পালন করার কথা, তা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য জনগণের মাঝে মৃত্যুভীতি ছড়িয়ে পড়ছে। যা রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। ধর্মীয় উৎসব পালন ও জাতীয় সঙ্কট মোকাবিলায় এ মুহূর্তে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে দেশ। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশে অনেক মানুষের মৃত্যুক্ষতি হবে।

আ স ম আবদুর রব আরো বলেন, দেশে এখন রাজনৈতিক নেতাদের স্বাধীনতা নেই। ভয়ে আতঙ্কে মানুষের সময় পার হচ্ছে।ঈদের আগে হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। আমাদের ঘুম নেই। রাজনৈতিক নেতাদের ঈদ আনন্দ নেই। এক সময় আমরা দেখেছে ঈদসহ জাতীয় উৎসবগুলোতে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেয়া। কিন্তু এখন নেই, সেই সংস্কৃতি বিলুপ্তি হয়ে গেছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমার সংবাদকে বলেছেন, বিএনপির প্রত্যাশা ছিলো ঈদুল আজহার আগেই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কারামুক্ত হবেন। দলের এবং মানুষের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখনো গুরুতর অসুস্থ। বারবার ইনসুলিন পরিবর্তন এবং ইনসুলিনের মাত্রা বৃদ্ধি করার পরও কোনো অবস্থাতেই তার সুগার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দেশবাসী দেশনেত্রীর জীবনের পরিণতি নিয়ে এখনো অজানা আতঙ্ক ও শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। বিএনপির এবারের ঈদ বিষাদের মধ্যেই থেকে যাবে বলে মনে করেন বিএনপির এই নীতিনির্ধারক।

সাম্প্রতিক ডেঙ্গু ঈস্যু নিয়ে রিজভী বলেন, আপনারা জানেন, সারা দেশে হাসপাতালগুলোতে কোনো ঠাঁই নেই। ডেঙ্গুরোগীতে ছেয়ে গেছে সব হাসপাতাল। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অসংখ্য শিশুসহ নানা বয়সি মানুষ। এখনো ঈদের আগে হাসপাতালে বেড না পেয়ে মেঝেতে কাতরাচ্ছে শিশুরা।

পরিস্থিতি সামাল দেয়ার কোনো সক্ষমতা নেই এই সরকারের। ঈদুল আজহার আগেই আজকে ডেঙ্গুর মতো এ দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকার অক্ষম। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় ডেঙ্গু মহামারিতে রূপ নিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এবারের ঈদের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ঢুকে পড়ছে বলেও জানান রুহুল কবির রিজভী।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত