শিরোনাম

ঈদের আগে পরিবহনে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা  |  ০৮:৩৪, আগস্ট ১০, ২০১৯

আসন্ন ঈদ ঘিরে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজদের ব্যাপকভাবে তৎপরতা বেড়েছে। সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি প্রতিরোধে র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তা রোধ করা যাচ্ছে না।

সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতারা পরিবহন চাঁদাবাজদের মদদ দেয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। আবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আনসার সদস্যদের সহযোগিতায় পুলিশ পাল্লা দিয়ে গাড়ি থামিয়ে অভিনব পন্থায় চাঁদা আদায় করছে। এতে ঈদে ঘরমুখি যাত্রী ছাড়া রোগী ও তাদের স্বজনরাই হয়রানির শিকার হচ্ছেন বেশি।

তবে পরিবহনের একাধিক নেতা বলেছেন, রাজধানীর শতাধিক পয়েন্টে এ চাঁদাবাজি এখন অপ্রতিরোধ্য রূপ নিয়েছে। একশ্রেণির পরিবহন শ্রমিক, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদপুষ্টদের সমন্বয়ে এ চক্র গড়ে উঠেছে। তাদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে যানবাহন চালক, মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই।

রাজধানীর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ১ হাজার বাস চলাচল করে। এই বাসস্ট্যান্ডটি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত না হলেও আবাসিক এলাকায় স্ট্যান্ড করা হয়েছে। যা স্থানীয় সংসদ সদস্যের মদদে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর এই বাসস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। আর প্রতিটি বাস থেকে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২শ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, রাজধানী ঢাকা শহর রক্ষা বেড়িবাঁধে প্রতিদিন শত শত মালবাহী যানবাহন থামিয়ে পুলিশ ও তাদের মনোনীত চাঁদাবাজরা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। এমনকি আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসীও একইভাবে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাত ১০টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চলে চাঁদাবাজি।

প্রতিটি পণ্যবাহী যানবাহনে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে অর্ধলাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেয়া হয়। সেখানে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে তারা। এভাবে মাসে প্রায় কয়েক কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বেড়িবাঁধ এলাকায়। আবার নগরীর সাইন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় আনসার সদস্যদের মাধ্যমে পুলিশ রিকসা, ভ্যান থামিয়ে তার চালকদের পিটিয়ে আহত করা হচ্ছে। এরপর ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের পর গাড়িগুলো ছাড়া হচ্ছে।

জানা গেছে, রাজধানীর গাবতলী থেকে মিটফোর্ড বাবু বাজার পর্যন্ত ১১ দশমিক ৬০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ঢাকা শহর রক্ষা বেড়িবাঁধ। এই এলাকার প্রায় ১৬টি স্পটে আট থানা পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা মিলে মালামাল বহনকারী পরিবহন থামিয়ে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।

দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি ট্রাক, লরি, পিকআপ, জিপসহ নানা পরিবহন বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে ঢাকা শহরে পৌঁছে। বাঁধের এসব স্পটে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশির নামে রাস্তার মাঝখানে বাঁশ ফেলে প্রকাশ্যে চাঁদা তুলছে।

রাজধানীর আট থানা পুলিশের চাঁদাবাজির স্পটগুলো হচ্ছে— দারুস সালাম থানার গাবতলী, আদাবর থানার ঢাকা উদ্যান, কামরাঙ্গীরচর থানার হাক্কুল এবাদ বেইলী ব্রীজ ও রসুলপুর পাকা ব্রিজের উভয় পাশ, লালবাগ থানার শহিদ নগর বৌ-বাজার, শ্মশান ঘাট, চকবাজার থানার চাঁদনী ঘাট শরিফ হোটেল সংলগ্ন চৌরাস্তা, চক বাজার জাহাজ বিল্ডিংয়ের মোড়, ইসলামবাগের আলীর ঘাট, লবণের কারখানা, সোয়ারী ঘাট, কামাল বাগ, নলগোলা, চক বাজার ও কোতোয়ালি থানার মাঝামাঝি বাবু বাজার ও মিঠফোর্ড সংলগ্ন দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে নদীতীরের বেড়িবাঁধ, কোতোয়ালি থানার বাদামতলী ফলের আড়তের সামনে বাকল্যান্ড বাঁধ এলাকা। আবার মোহাম্মদপুর থানার মোহাম্মদপুর, রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, হাজারীবাগ থানার শিকদার মেডিকেল, নবাবগঞ্জ সেকশন এলাকায় পুলিশের চাঁদাবাজি চালানো হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিটফোর্ড বাবু বাজার, শিকদার মেডিকেল এবং কামরাঙ্গীরচরের রসুলপুর পাকা ব্রিজ ও ছাতা মসজিদ এলাকার লোহার ব্রিজের উভয় পাশে বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহন থামিয়ে চাঁদা আদায় করছে কামরাঙ্গীরচর ফাঁড়ির পুলিশ।

আর লালবাগ নবাবগঞ্জ এলাকায় স্থানীয় সরকারদলীয় নেতা বিপ্লব, জাকির, সেন্টু ও পাউবো স্লুইস গেটের কেয়ারটেকারসহ কয়েকজন নবাবগঞ্জ বড় মসজিদ সংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে।

চাঁদার সিংহভাগ টাকা পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে শুরু করে শাসক ও বিরোধদলীয় প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে পৌঁছে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বেড়িবাঁধ এলাকা সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত পরিবহন ব্যবসায়ীদের কাছে রীতিমত এক আতংকের নামে পরিণত হয়েছে। ওপেন সিক্রেট এই চাঁদাবাজিতে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

সূত্র জানায়, চাঁদাবাজি নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও দ্বন্দ্ব-মারামারির ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে ঘটে। নগরীর বিভিন্ন রুটে পরিবহন ধর্মঘট পর্যন্ত পালিত হয়েছে। তবুও চাঁদাবাজদের রোষানল থেকে রেহাই মিলছে না। সায়েদাবাদ টার্মিনাল, গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ডসহ রাজধানীর সর্বত্রই পরিবহন সেক্টরকে ঘিরে চাঁদাবাজি চলছে।

সায়েদাবাদে বিভিন্ন রুটে কমিটির নামে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া চাঁদাবাজি করা হয়। টার্মিনাল-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সায়েদাবাদ থেকে দেশের পূর্ব-উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাসমূহের ৪৭টি রুটে চলাচলরত দুই হাজারের বেশি যানবাহন থেকে প্রতিদিন চাঁদাবাজি চলে। এসব রুটের মধ্যে সিলেট, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর, চাঁদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশালসহ ৩২টি রুটে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ কোচ চলে।

আবার রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল, মহাখালী, উত্তরা, গাজীপুর, টঙ্গী, কালিগঞ্জ, শ্রীপুর, কাপাসিয়াসহ শহর ও শহরতলীর অন্যান্য রুটে ১ হাজারেরও বেশি বাস-মিনিবাস চলাচল করে। যানবাহনের চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপাররা জানান, দেশের এমন কোনো পরিবহন নেই যে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে না।

দেশের বিভিন্ন জেলায় চলাচলকারী সব গাড়িকে প্রতি ট্রিপেই নির্ধারিত অঙ্কের চাঁদা পরিশোধের পর বাস টার্মিনাল ত্যাগ করতে পারে। সেক্ষেত্রে দূরপাল্লার কোচ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি চলছে এবং লোকাল সার্ভিসের প্রতিটি গাড়ি থেকে ট্রিপে আদায় করা হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা।

এসব রুটে চলাচলকারী যানবাহনের মালিক শ্রমিকরা জানান, কমিটি দখল ও মাত্রাতিরিক্ত চাঁদাবাজির অত্যাচারে মালিকরা পথে বসায় পড়েছেন। শুধু তাই নয়, পরিবহন শ্রমিকরাও বেকারের মতো অবস্থায় পড়েছে।

সায়েদাবাদ স্ট্যান্ডে পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, কুমিল্লা, লাকসাম, কিশোরগঞ্জ, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন রুটে এখন গাড়িপ্রতি ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদাবাজির শিকার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা প্রতিদিন চাঁদা প্রদান করেন।

আর সেই চাঁদার পরিমাণ হচ্ছে, পরিবহন-সংশ্লিষ্ট একটি কেন্দ্রীয় ফেডারেশনের নামে ৫০ টাকা, মালিক সমিতি ৮০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়ন ৪০ টাকা, টার্মিনাল কমিটি ২০ টাকা, কলার বয় ব্যবহার বাবদ ২০ টাকা, কেরানির ভাতা ২০ টাকা, মালিক-শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের নামে ৫০ টাকা এবং একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় দুই প্রভাবশালী নেতার নামে ৫০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হচ্ছে।

কয়েকজন বাসচালক জানান, নেতা ও সংগঠনের নামে চাঁদা না দিয়ে কোনো গাড়িই টার্মিনাল থেকে বের করা যায় না। শুধু তাই নয়, চাঁদা নিয়ে কোনো শব্দ করলে নির্যাতনসহ হয়রানির শিকার হতে হয়।

শুধু বাসস্ট্যান্ডে নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকার বেবিট্যাক্সি, টেম্পো, বাস, মিনিবাস, ট্রাক থেকে জোরজবরদস্তি করে টাকা আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। সন্ত্রাসীরা সরাসরি চাঁদা তুললেও পরিবহন শ্রমিকরা চাঁদা নেয় শ্রমিককল্যাণের নামে। ট্রাফিক সার্জেন্টরা টাকা তোলে মাসোহারা হিসেবে।

এছাড়া আছে বেকার ভাতা, রাস্তা ক্লিয়ার ফি, ঘাট ও টার্মিনাল সিরিয়াল, পার্কিং ফি নামের অবৈধ চার্জ। এভাবে নিত্যনতুন পদ্ধতিতে চলছে এ চাঁদাবাজির ঘটনা। সামাল দেয়ার যেন কেউ নেই।

সদরঘাট এলাকার পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জবি ছাত্রলীগের নামে ১ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। আবার ১৫ আগস্ট সামনে রেখেও চাঁদাবাজি চলছে। এসব চাঁদার পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামপুরের এক কাপড় ব্যবসায়ী বলেন, গত কয়েক মাস ধরে নতুন নতুন নেতার নাম করে চাঁদা নিচ্ছে ছাত্রলীগ কর্মীরা। তাদের চাঁদা না দিলে মারধর ও ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়।

এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহনের সাবেক এক নেতা জানান, এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারাই এখন ৪০ টাকার চাঁদা নিচ্ছে- ১৬০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর পরিবহন নেতা সামদানীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এখন কোথাও কোনো চাঁদা আদায় করা হচ্ছে না। সব ঠিকঠাক মতো চলছে বলে তিনি জানান।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পরিবহনে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও ঢাকার বাইরে সড়কগুলো থেকে গরুর ট্রাকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া এন্ড পিআর) মো. সোহেল রানার সেল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তার ফোনটি রিসিভ করেননি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত