শিরোনাম

চামড়ার দরপতনে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত কওমি মাদ্রাসা?

সুফিয়ান ফারাবী   |  ০২:৪০, আগস্ট ১৭, ২০১৯

সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নেই পরিচালিত হয় দেশের কওমি মাদ্রাসা। সরকারের অনুদানে নির্ভর না করে ধর্মপ্রাণ মানুষের স্বেচ্ছায় দান ও শিক্ষার্থীদের ফি’তে চলছে প্রায় ১৪ হাজার কওমি মাদ্রাসা। যাতে পড়াশোনা করছে প্রায় ১৪ লক্ষ শিক্ষার্থী।

নির্দিষ্ট আয়ের উৎস না থাকলেও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশের কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ও পরিধি। মূলত সাধারণ মানুষের আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টাতেই চলমান এ শিক্ষা কার্যক্রম।

জনসাধারণের অনুদান ছাড়া কওমি মাদ্রাসাগুলোর খরচের ভিন্ন ‍আরেক ‍উপায় হলো কুরবানির চামড়া। অধিকাংশ মাদরাসার বছরের অর্ধেক খরচ ‍এর থেকে সংগৃহিত হয়ে থাকে বলে জানা যায়।

তবে ২০১৫ সাল থেকে কুরবানির পশুর চামড়ার ব্যাপক দরপতনে ‍এর ছন্দপতন ঘটেছে। গেল বছর ‍এর মাত্রাটা এতটা নিম্নে না থাকলেও চলতি বছর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

গেল বছর ৯০০ থেকে ১১০০ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে প্রতিটি চামড়া। তবে এ বছর চামড়ার দর পতন ছিল গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

লক্ষ টাকা দামের গরুর চামড়ার মূল্য পাওয়া গেছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। কোথাও এর চেয়ে খানিকটা বেশি বা কম। আবার কোথাও চামড়া কেনার ‍জন্য ‍আসেনি ক্রেতারা।

গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গেছে- চামড়ার মূল্য না পেয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন অনেক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। আবার কোথাও কোথাও দেখা গেছে নদীতে ফেলে দেয়া হচ্ছে বা পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। চট্টগ্রামের রাস্তায় লক্ষাধিক চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

ঈদের দিন রাজধানীর সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে- চামড়া ক্রয় ও আনুসঙ্গিক খরচ হিসাব করলে প্রতিটি চামড়ার পেছনে ৪শ থেকে ৫শ টাকা খরচ করতে হয়েছে মাদ্রাসাগুলোকে। কিন্তু বিক্রি করতে হয়েছে এর সমমূল্য বা কমে।

চামড়ার ‍এ দরপতনকে গোপনে ‘কওমি মাদ্রাসা ধ্বংসে’র অভিযোগ করেছেন অনেকে। যদিও শীর্ষস্থানীয় ‍আলেমরা বলছেন ভিন্ন কথা।

মিরপুরের জামেউল উলুম মাদরাসার ৫০০ ছাত্র এবার ঈদের দিন পরিশ্রম করে ১৯৫০ চামড়া সংগ্রহ করেন। তবে তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ করেছেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, যে পরিমাণ ছাত্র পরিশ্রম করেছে, হিসেব কষলে তাদের পারিশ্রমিকও ওঠেনি।

সাভারের জামিয়া মাহমুদিয়ার প্রিন্সিপাল মুফতি আলমগীর হোসাইন বলেন, প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী ঈদানন্দ কুরবানি করে চামড়া সংগ্রহে লিপ্ত ছিলো। কিন্তু আশা অনুপাতে চামড়া পেলেও প্রাপ্য মূল্যে হতাশ আমরা। সর্বমোট ১০০ চামড়া সংগ্রহ করি আমরা। এর মধ্য বেশিরভাগ চামড়া ক্রয় করতে হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে। আনুসঙ্গিক খরচসহ প্রতিটি চামড়া ক্রয়ে খরচ হয়েছে মিনিমাম ৫০০ টাকা। অথচ বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকায়।

তিনি বলেন, সিন্ডিকেটে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এ ক্ষতি মূলত এতিম গরিব শিক্ষার্থীদের। কারণ এসব মাদরাসায় দরিদ্ররা বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ পায়।

চামড়ার ব্যাপক দরপতনে অর্থনৈতিকভাবে কতটা ক্ষতির মধ্যে পড়বে কওমি মাদ্রাসাগুলো- সে হিসেব কষছেন অনেকে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, কুরবানির চামড়ার উপর কতটা নির্ভরশীল কওমি মাদ্রাসা।

এ বিষয়ে কথা হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক ও তেজগাঁও রেলওয়ে মাদরাসার শাইখুল হাদিস ড. মাওলানা মুশতাক আহমদের সঙ্গে। তিনি চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ায় মাদ্রাসা বড় ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে মনে করেন না।

‍আমার সংবাদকে তিনি বলেন, মাদ্রাসা পরিচালনার সামান্য পরিমাণ অর্থের যোগান হত চামড়ার ‍আয় থেকে। অর্ধেক আয়ের ধারণাটি অমূলক।

নিজের মাদরাসার ‍উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আমার মাদ্রাসার বাৎসরিক খরচ প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। কুরবানি চামড়া থেকে আসে দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা। সুতরাং এই সামান্য অংশের অর্থের ওপর নির্ভরশীল কিভাবে হবে মাদ্রাসাগুলো।

তিনি বলেন, কুরবানির দিন জবাই ও চামড়া সংগ্রহের কাজ চালু রাখা হয়েছে সমাজের সাথে মাদ্রাসার সেতুবন্ধনের জন্য। সমাজের মানুষের সাথে মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক তৈরির হাতিয়ার হিসেবে। এর মাধ্যমে সমাজ সেবাও হয়ে থাকে।

তবে সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার দরপতনের তীব্র নিন্দা জানান তিনি। ড. মুশতাক বলেন, এতে গরিব শিক্ষার্থীদের হক রয়েছে। ‍এটি নিয়ে কোনো প্রতারণা ‍উচিত নয়।

একই বিষয়ে কথা বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক) এর সহসভাপতি ও কিশোরগঞ্জের জামিয়া এমদাদিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা আনোয়ার শাহ’র সঙ্গে।

আমার সংবাদকে তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হয় আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ভরসা এবং মুসলমানদের অনুদানে। যারা ধারণা করেছেন- কওমি মাদ্রাসার এ আয়ের উৎস বন্ধ করে দিলে মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে তারা ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে আছেন। তারা অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজেরাই ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কর্মকাণ্ডে দেশের এক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এটা বড় অন্যায়। তারা রাষ্টের ক্ষতি করেছে।

তিনি বলেন, চামড়ার ব্যাপক দরপতনে মাদ্রাসা পরিচালনায় সামান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সে ক্ষতিটা খুব বেশি বলে মনে করছি না। কারণ এদেশের বুকে এখনো ধর্মপ্রাণ মুসলমান বেঁচে আছেন। ইনশাআল্লাহ, তারা এ শিক্ষা ব্যবস্থা রক্ষায় এগিয়ে আসবেন সব সময়।

চামড়ার সিন্ডিকেটের বিষয়ে নিন্দা প্রকাশ করেছেন ‘কওমি ফোরাম’ নামের সংগঠনের জ্যৈষ্ঠ সমন্বয়ক মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী

আমার সংবাদকে তিনি বলেন, যারা কওমি মাদরাসার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে তারা মূলত দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। চামড়া শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। সোনালি আঁশ পাট আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের দেশের বড় শিল্প ছিল সেটা। এখন কি চামড়াও একই পথে হাঁটবে?

আমরা কওমি ফোরাম’র পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা জানাই। চামড়ার সিন্ডিকেট যদি কওমি মাদরাসাকে ধ্বংসের জন্য হয় তাহলে মনে রাখতে হবে দুষ্কৃতিকারীদের চক্রান্তে কওমি মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হবে না। মাদ্রাসাগুলো টিকে আছে শেষ রাতের আহাজারি-কান্নায়।

আরআর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত