শিরোনাম
চামড়া বিপর্যয়

সবই গিলে খাচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ০০:২৩, আগস্ট ১৮, ২০১৯

‘আমরা ১০ ট্যানারির কাছে জিম্মি। তারা বাকি নিতে নিতে আমাদের এমন পর্যায়ে গেছে যে, নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছি। অনেকেই পথের ভিখারি হয়ে গেছে। সবই গিলে খাচ্ছে ট্যানারি মালিকরা। আমাদের কাছে টাকা না থাকায় চামড়া কিনতে পারিনি।

এবারের কুরবানির ঈদের মতো এত কম দামে চামড়া গত ৩০ বছরেও চোখে দেখিনি। এটা আয়-রুজির পথ হলেও কম দামে চামড়া কিনতে ঘৃণা লাগছে। তারপরও ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় গরুর চামড়া কেনা হয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন খরচও আছে।

প্রতিটি চামড়া বিক্রি করতে পারলে ৫০ টাকা লাভ থাকলেই যথেষ্ট। একইভাবে বকরির চামড়ায় ৫ টাকা লাভ থাকলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতাম’ বলে গতকাল এ প্রতিবেদককে জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আড়তদার ও চামড়া ব্যবসায়ী মো. সাহাবুদ্দিন।

তিনি আরো বলেন, প্রগতি ট্যানারি, ঢাকা হাইড, কালাম এন্ড ব্রাদার্স, আনোয়ার, চৌধুরী লেদারসহ ১০ ট্যানারির কাছে জিম্মি চামড়া ব্যবসায়ীরা।

শুধু ওই ব্যবসায়ী নয়, খোদ হাজারীবাগের কালুনগরের চামড়া ব্যবসায়ী আবুল হোসেনও আমার সংবাদকে বলেন, এমন সর্বনাশ জীবনে কখনো দেখিনি। ট্যানারি মালিকরা ঠিকমতো আড়তে টাকা দিলে এমন খারাপ অবস্থা হতো না। তারা নিজে বাঁচলেও আমাদের ব্যবসা নেই, মরার মতো অবস্থা।

শুধু তাই নয়, হাজারীবাগ ট্যানারি মোড়ের রহমত সুজের মালিক মো. আবেদ বলেন, গত বছর থেকে কম দামে চামড়া বিক্রি হলেও ট্যানারি থেকে ফেলে দেয়ার মতো চামড়া ১২০ টাকা বর্গফুট কিনতে হয়।

মাঝারি ধরনের ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বর্গফুট এবং ভালোমানের চামড়া যা বে এবং অ্যাপেক্সসহ বিভিন্ন কোম্পানির কাছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা বর্গফুট চামড়া বিক্রি করছে ট্যানারি মালিকরা। আমরা এক টাকাও বাকি পাই না। গতকাল বিভিন্ন জায়গায় সরেজমিন ঘুরে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলে এমনই চিত্র পাওয়া গেছে।

সার্বিক ব্যাপারে জানতে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ব্যস্ত থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

তবে এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ও সালমা ট্যানারি লিমিটেডের মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ দামের ব্যাপারে বলেন, আমরা কি দামে ফিনিশড চামড়া বিক্রি করি ইপিবি ওয়েবসাইডে তা দেয়া আছে।

কাজেই কে কি বললো সেটা দেখার বিষয় নয়। তারা যে দামের কথা বলছে ওই দামে তাদের কাছে কিনতে চান। দেখবেন তারা কি বলে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এতো লাভ হলে তো ভালোই হতো।

কয়েক বছর থেকে খালি লস আর লস, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি নিতে হয়েছে। কাজেই বেশি দামে চামড়া কেনা যাচ্ছে না। কম দামেই এবারে চামড়া কিনতে হচ্ছে, ২০ আগস্ট থেকে তা কেনা হবে। বকেয়া টাকা সময়তো চামড়া ব্যবসায়ীদের দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

রাজধানীর হাজারীবাগের ভেড়িবাঁধ রাস্তা থেকে ট্যানারি মোড়ে আসতে বিভিন্ন ট্যানারি শিল্পকারখানা দেখা যায়। রুপালী, বে ট্যানারি, ঢাকা ফুটওয়্যার, ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন কোম্পানির বিল্ডিংয়ে ঢুকলে ভেতরে সিকিউরিটি ও পিয়ন ছাড়া অন্য কাউকে পাওয়া যায়নি।

তারা এ প্রতিবেদককে বলেন, সব কাজই হচ্ছে সাভারে। শুধু বিল্ডিং পাহারা দেয়া হচ্ছে। ওইসব বিল্ডিংয়ে কোনো কাঁচা চামড়া না ঢোকায় কোনো গন্ধও পাওয়া যায়নি।

এসময় বালুনগরের চামড়া ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, কোম্পানির লোকেরা চামড়া নিচ্ছে না। জন্মের পর থেকে এত কম দামে চামড়া কখনো কিনিনি। গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং খাসির চামড়া ১০ থেকে ২৫ টাকা পিস কেনা হচ্ছে। বেশি দামে কিনতে পারলে ভালো লাগতো।

এতে দেশেরও লাভ হতো, গরিব-মিশকিনের উপকার হতো। এসব কি দামে বিক্রি হবে কিছুই জানি না। আগের চামড়ার দামইতো ট্যানারি মালিকরা দেয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাইরে যেতে পারলে এবং চামড়াজাতপণ্যের নতুন বাজার করতে পারলে চামড়ার দাম বাড়বে বলে জানান তিনি। এটা শুধু তার কথা নয়, সারা দেশের সব চামড়া ব্যবসায়ীরই কথা।

চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ট্যানারি মালিকরা এই বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় এবারের কুরবানিতে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা যায়নি। এতে কুরবানির বিপুল চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। যোগাযোগ করা হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চামড়া ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন বলেন, সরকার কি চামড়া কেনে? তারা দাম বেঁধে দিলেও ট্যানারি মালিকরা তো চুপ হয়ে গেছে। আগের টাকাই দিচ্ছে না।

এই জেলারই বাকি রয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। তারা সব গিলে খেয়েছে, তাদের কারণে চামড়াশিল্পটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা কোথায় টাকা পাব। তাইতো চামড়া কেনা যাচ্ছে না। এবার সরকারের নির্দেশে তারা সাড়া দেয়নি। তাইতো বেশি দামে কেনা যাচ্ছে না চামড়া।

১নং গরুর চামড়া (২০ থেকে ২৫ বর্গফুটের) ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এসব চামড়ায় লবণ, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ হওয়ায় দ্বিগুণ দাম পড়বে, অর্থাৎ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পিস। এটা খুবই ভালো কোয়ালিটির। তা মোট চামড়ার ৩৫ শতাংশ হবে। বাকি চামড়া ২০ টাকা ফুটে বিক্রি করতে হবে।

তাহলে আমরা কীভাবে বেশি দামে কিনবো বলে প্রশ্ন করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বড়ই চিন্তায় আছি এত কম দামে চামড়ায় আমরা কি করবো। সারা বছর পিসে ২০ থেকে ২৫ টাকা থাকে। ঈদে ৫০ টাকা আশা করি। খাসির চামড়া কেনা হচ্ছে ১০ থেকে ২৫ টাকায়। পিসে ৫ টাকা লাভ থাকলে খুবই ভালো। কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি।

২০১৪ সালের পর থেকে ট্যানারি মালিকরা বাকি নিতে নিতে আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। আমরা মানবেতর জীবন-যাপন করছি। প্রগতি ট্যানারি, ঢাকা হাইড, আনোয়ার ট্যানারি, সালামসহ ১০টি ট্যানারির কাছে আমরা জিম্মি। সাভারে ট্যানারি যাওয়ার সময় তারা দাবি করে বাকি রাখার জন্য। অনেক আগে তারা চলে গেলেও দিচ্ছে না টাকা।

গত বছর থেকে গরু ও খাসির চামড়া এত সস্তা হলেও জুতা সেন্ডেল, ভ্যানেটি ব্যাগ, অফিস ব্যাগ বেশি দাম কেন? এর কারণ জানতে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হয়।

এ ব্যাপারে রহমত সুজ-এর মালিক মো. আবেদ নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ভালো মানের জুতা তৈরিতে ২০০ টাকা দরে চার বর্গফুট চামড়া লাগে। ২০ থেকে ২৫ ফুটের এক পিস কিনতে লাগে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এই চামড়া প্রসেসিং করতে কাঁচা চামড়ার দ্বিগুণ খরচ হয়।

জুতা তৈরির জন্য চামড়ায় ৮০০ টাকা লাগে। সঙ্গে সোল ৩৫০ টাকা, লেবার, পেস্টিংসহ ৫০০ টাকা লাগে। সেন্ডেলে চামড়া লাগে আড়াই ফিট। খরচ হয় ৫০০ টাকা। সঙ্গে সোলে ৩৫০ টাকা এবং অন্যান্য খরচ ৫০০ টাকা।

তিনি আরও বলেন, বেল্টে খাসির চামড়া লাগে তিন ফিট। ১১০ থেকে ১২০ টাকা ফিটের চামড়া দেয়া হয়। অন্যান্য খরচ হয় ১০০ টাকা। মানিব্যাগে ছাগলের চামড়া লাগে আড়াই ফিট। তা ৮০ থেকে ৯০ টাকা ফিট কিনতে হয়। এতে মজুরি ১৫০ টাকা এবং অন্যান্য খরচ হয় ৫০ টাকা।

অফিস ব্যাগে চামড়া লাগে ১৫ ফিট। ২০০ টাকা ফিটের চামড়া দেয়া হয়। তাতে ৩০০০ হাজার টাকার চামড়া লাগে। ভ্যানেটি ব্যাগে চামড়া লাগে ৭ থেকে ৮ ফিট। এতে ১০০ টাকা ফিটের চামড়া দেয়া হয়। তাতে ব্যয় হয় ৮০০ টাকার মতো।

এর সঙ্গে মজুরি এবং অন্যান্য খরচ লাগে হাজার টাকা। তবে কোম্পানি ভেদে এসব চামড়াজাতপণ্যে কম ও বেশি দামের চামড়া ব্যবহার করা হয়। ভালো ব্রান্ডে এসব বেশি দামের চামড়া ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু আমরা ওইসব পণ্য কম দামেই বিক্রি করি। তারপরও ক্রেতারা আসেন না। ব্যাংক ঋণ পেলে আমরাও ভালো করতে পারবো বলে জানান তিনি।

ট্যানারি মোড়ের দুলাল বলেন, স্বাধীনের পর থেকেই চামড়া ব্যবসার সঙ্গে আমি জড়িত। কিন্তু এত কম দামে চামড়া কখনো দেখিনি। কিন্তু ফিনিশড চামড়া ঠিকই ট্যানারি মালিকরা বেশি দামেই বিক্রি করছে। ফেলে দেয়ার মতো হলেও তারা ১২০ টাকা ফিটের কম দামে বিক্রি করে না।

মাঝারি ধরনের ২০০ থেকে ২৫০ টাকা এবং ভালোটা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ফিট চামড়া বিক্রি করে ট্যানারি মালিকরা। তারপরও এক টাকা তারা বাকি রাখে না। তারাই চামড়া ব্যবসার লাভ খেয়ে নিচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, এবারে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে কথা বলে কুরবানির কাঁচা চামড়া ৩৫ থেকে ৫০ টাকা বর্গফুট কেনার জন্য সরকার বলে। কিন্তু তা কার্যকর না হওয়ায় এবার কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে।

বাধ্য হয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি রপ্তানির ঘোষণা দিলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসেসিয়েশন থেকে তা প্রত্যাহারের দাবি জানায় এবং আগামী ২০ আগস্ট থেকে সরকার বেঁধে দেয়া দামে ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করবেন বলে জানান সংগঠনের সভাপতি শাহীন আহমেদ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত