শিরোনাম

অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অননুমোদিত ক্যাম্পাস

প্রিন্ট সংস্করণ॥রাসেল মাহমুদ  |  ০৩:২৮, আগস্ট ২০, ২০১৯

দেশের উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ১৯৯২ সালে ভারত, পাকিস্তান ও জাপানের আদলে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেয়। তারপর থেকেই বেসরকারি উদ্যোগে উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়।

কিন্তু যেসব শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হওয়ার কথা তার অনেক কিছুই মানছে না একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি অনুমোদনহীন ক্যাম্পাসও পরিচালনা করছে বেশকিছু নামি বিশ্ববিদ্যালয়।

এছাড়াও অননুমোদিত প্রোগ্রাম পরিচালনা, মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বসহ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এমনকি ট্রেজারারও নেই বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এ অবস্থায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ইউজিসি।

চলতি মাসের ৮ তারিখে জারি করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে ৩০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ভর্তি মৌসুম সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতেই এ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউজিসির কর্মকর্তারা। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে এরমধ্যে ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে অননুমোদিত ক্যাম্পাস পরিচালনার অভিযোগ করা হয়েছে।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো— ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, এনপিআই ইউনিভার্সিটি, শান্তা-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি এবং ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ইউজিসির গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়— ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার বাড়ি-৭২, রোড-১৭, ব্লক-সি, বনানী, ঢাকার ক্যাম্পাসটি অননুমোদিত। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্লট-১৪, সেক্টর-৭, লেক ড্রাইভ রোড, উত্তরা ঢাকার ক্যাম্পাসটি অননুমোদিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

অননুমোদিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বাড়ি-২৬, রোড-৫, ধানমন্ডি, ঢাকার ক্যাম্পাসটি। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ অননুমোদিতভাবে পরিচালনা করছে বাড়ি-৩, রোড-৭, সেক্টর-৭ উত্তরা ঢাকার ক্যম্পাসটি। এনপিআই ইউনিভার্সিটি অননুমোদিতভাবেপরিচালনা করছে ১৮২/১, পূর্ব তেজতুরী বাজার, ফার্মগেট, ঢাকার ক্যাম্পাসটি।

ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ দুটি ভবনে অননুমোদিত ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। এগুলো হলো— ৬৯/১/১ পান্থপথ, ঢাকা-১২০৫ এবং ৬৯ কে. কে. ভবন পান্থপথ, ঢাকা-১২০৫। এছাড়াও অননুমোদিতভাবে সর্বোচ্চ ৮টি ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটি।

প্রতিষ্ঠানটির (ক) বাড়ি-৭৮, রোড-১১/এ, ধানমন্ডি, ঢাকা (খ) বাড়ি-৭ ও ৮, সাত মসজিদ রোড, ধানমন্ডি (গ) বাড়ি ৬৫, রোড-৮/এ ধানমন্ডি (ঘ) বাড়ি-৪৭/এ, রোড-১২/এ, ধানমন্ডি (ঙ) বাড়ি-১১৫/এ, রোড-৯/এ, ধানমন্ডি (চ) বাড়ি-১১৯/এ, রোড-৯/এ ধানমন্ডি, (ছ) বাড়ি-৭৪ সাত মসজিদ রোড, শংকর প্লাজা, ধানমন্ডি এবং (জ) ৬/২২, ব্লক-ই লালমাটিয়া ঢাকার ক্যাম্পাসটি অননুমোদিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অননুমোদিতভাবে পরিচালিত ক্যাম্পাস ৪টি। এগুলো হলো- (ক) বাড়ি-৪/২, সোবহানবাগ, মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা, (খ) বাড়ি-১০২/১, শুক্রাবাদ, মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৭, (গ) বাড়ি-১০০/বি, শুক্রাবাদ, মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৭ এবং (ঘ) বাড়ি-১০৫, শুক্রাবাদ, মিরপুর রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৭।

অননুমোদিতভাবে ৫টি ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে উত্তরা ইউনিভার্সািটি। এগুলো হলো- (ক) বাড়ি-৫, রোড-১২, সেক্টর-৬ (এনজেড সেন্টার), উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ (খ) বাড়ি-৯, রোড-৭/ডি, সেক্টর-৯ (মমতাজ মহল), উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ (গ) বাড়ি-১২, রোড-রবীন্দ্র সরনি, সেক্টর-৭, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ (ঘ) হাউজ বিল্ডিং, বাড়ি-০১, রোড-১২, সেক্টর-৬, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ এবং (ঙ) মেসেজ বিল্ডিং, বাড়ি-০৭, রোড-১৬, সেক্টর-০৪, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০।

অননুমোদিতভাবে ৫টি ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে শান্তা-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি। এগুলো হলো- (ক) বাড়ি-১৩, রোড-১৪, সেক্টর-১৩, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ (খ) বাড়ি-১১, রোড-১৭-এ, সেক্টর-১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০, (গ) বাড়ি-১২/১৪, রোড-১৭/বি, সেক্টর-১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০, (ঘ) বাড়ি-৮২, রোড-১৫, সেক্টর-১১, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ (প্রশাসনিক ভবন) এবং (ঙ) বাড়ি ৩০, সোনারগাঁও জনপদ, সেক্টর-০৬, উত্তরা, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ (ক্রিয়েটিভ হাব)।

তবে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব ক্যাম্পাসকে অনুমোদনহীন বলা ঠিক হবে না। যথাযথ নিয়ম মেনে ইউজিসিতে অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ইউজিসিও বিভিন্ন সময় পরিদর্শন করেছে। শিগগিরই হয়তো ইউজিসিরি অনুমোদন মিলবে।

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এডমিশন এন্ড ইন্সটিটিউশনাল রিলেশন বিভাগের পরিচালক এএসএমজি ফারুক আমার সংবাদকে বলেন, আমরা আমাদের ক্যাম্পাসকে অবৈধ মনে করছি না। এই ক্যাম্পাসে অনেক মন্ত্রী, এমপি এমনকি ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসেছেন।

আমাদের বিভিন্ন চিঠিও এ ক্যাম্পাসের ঠিকানাতেই আসে। ক্যাম্পাস অবৈধ হলে এটা হওয়ার কথা ছিলো না। তিনি আরও বলেন, ইউজিসি যে সতর্কতা জারি করেছে তা ঠিক আছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চিঠি দিয়েছি। আশা করছি শিগগিরই জবাব পাবো।

ইউজিসির সতর্কতার পরও শিক্ষার্থী ভর্তি করবেন কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু আমাদের ক্যাম্পাস বৈধ তাই অবশ্যই শিক্ষার্থী ভর্তি করবো।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের ভবনগুলো নিয়ে ইউজিসি আপত্তি জানিয়েছে তা আসলে আলাদা আলাদা ক্যাম্পাস নয়। মূলত এই ভবনগুলোতে প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ এ সংক্রান্ত কাজই হয়ে থাকে।

তাছাড়া একটি ভবনকে একটি ক্যাম্পাস হিসেবে দেখার সুযোগও নাই। ইউজিসি সেটাই করছে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হাবিব কাজল বলেন, আমাদের কোনো অবৈধ ক্যাম্পাস বা অবৈধ প্রোগ্রাম নেই।

ইউজিসি যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে সে বিষয়ে আমরা অবগত আছি। বিষয়টি জানিয়ে ইউজিসিকে চিঠিও দিয়েছি। আশা করছি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউজিসির মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে।

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, আমাদের যে ক্যাম্পাসটি নিয়ে ইউজিসি সতর্কতা জারি করেছে, সেখানে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম নেই। ক্যাম্পাটিতে আপাতত ল্যাবের কাজ হয়।

তবে শিগগিরই ইউজিসির অনুমোদন সাপেক্ষে সেখানে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান তিনি। তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউজিসি সতর্কতা জারি করলেও শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ হবে না বলে মনে করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা মনে করছেন, ইউজিসি প্রতিবছরই ভর্তি মৌসুমে এমন গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিকই শিক্ষার্থী ভর্তি করে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আদনান ফয়সাল বলেন, এখন সবাই সচেতন। ভর্তির পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খোঁজ-খবর নেয়।

ইউজিসি কিছু ভবনকে ক্যাম্পাস হিসেবে উপস্থাপন করলেও শিক্ষার্থীরা তা মনে করেন না। ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বের সাফল্য বিবেচনা করে। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থী হুসাইন ইমরান বলেন, এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর হতে হবে।

যদি ক্যাম্পাসের অনুমোদন নাই থাকে তাহলে সেখানে কীভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। সরকার কঠোর হলে প্রতি বছর ইউজিসিকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করতে হতো না।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ১০৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রয়েছে। এরমধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে ৯৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের। এরমধ্যে ৩০টির ব্যাপারে বিজ্ঞপ্তি করেছে ইউজিসি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত