শিরোনাম

খায়রুল হোসেন অনুমোদিত অর্ধেক কোম্পানি নিম্নমানের

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী  |  ১০:৪৮, আগস্ট ২৩, ২০১৯

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে ড. এম খায়রুল হোসেন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে গত আট বছরে যেসব কোম্পানি দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি নিম্ন মানের বলে অভিযোগ উঠেছে।

দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করে এলেও দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে স্বপদে বহাল আছেন তিনি। তবে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।

২০১০ সালে শেয়ারবাজারে মহাধসের পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের আলোকে বিএসইসিকে ঢেলে নতুন করে সাজানো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের ১৫ মে বিএসইসিতে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ড. এম খায়রুল হোসেন। এরপর দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন তিনি।

তার নেতৃত্বে নতুন কমিশন টানা ৮ বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করলেও আইপিও ও প্লেসমেন্ট নিয়ে বিতর্ক এড়াতে পারেনি বিএসইসি। খায়রুল হোসেনের সময়কালে দেশের পুঁজিবাজারে বেশকিছু সংস্কার সাধিত হলেও বাজারের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এখনো আস্থা ফেরেনি।

বিভিন্ন সময়ে শেয়ারবাজারে নিম্নমানের কোম্পানি তালিকাভুক্তির অভিযোগও তোলা হয় বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে তাকে ব্যর্থ বলে উল্লেখ করে কয়েক বছর ধরেই তার পদত্যাগের দাবি করে আসছেন বিনিয়োগকারীরা।

তবে তাদের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। অবশেষে দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গত বুধবার দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। দুদকের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে দুদকের মানি লন্ডারিং শাখা।

পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারী মো. মহসিন বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার কারণেই বর্তমানে বাজারের এই বেহাল দশা। রক্ষকরাই ভক্ষকের ভূমিকায় থাকায় বাজারের কোনো উন্নতি হয়নি। অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করলেই বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। আর ভবিষ্যতে যেন কেউ বাজার নিয়ে খেলতে না পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

দুদকের কাছে অভিযোগ রয়েছে, খায়রুল হোসেনের আট বছরের মেয়াদে প্রায় ৮৮টি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত আইপিও নিম্নমানের। বেশ কয়েকটি নিম্নমানের কোম্পানি মিথ্যা তথ্য দিয়ে বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে উচ্চ মুনাফা দেখিয়ে আইপিও অনুমোদন করিয়ে নেয়।

দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত হওয়ার পর এসব কোম্পানির বেশিরভাগেরই শেয়ারের দাম কমতে শুরু করে। এরই মধ্যে অনেক কোম্পানি শেয়ারবাজারের সবচেয়ে মন্দ অর্থাৎ ‘জেড ক্যাটাগরি’তে নেমে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এ কোম্পানিগুলো আগে যে আয়ের হিসাব দিয়েছিল, সেগুলো জাল ছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান উর রশীদ চৌধুরী বলেন, আমরা গত পাঁচ-ছয় বছর ধরেই বলে আসছি, বিএসইসি চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন বাজারের স্বার্থ উপেক্ষা করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত।

তার কারণেই একের পর এক দুর্বল কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তারা বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। অথচ ওইসব কোম্পানির উদ্যোক্তা/পরিচালকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বিএসইসি। দুদকের অনুসন্ধানে এবার সঠিক চিত্র উঠে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

খায়রুল হোসেনের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, নিম্নমানের কোম্পানির তালিকাভুক্তি, অযৌক্তিক প্রিমিয়াম ও লাগামহীন প্লেসমেন্ট বাণিজ্যের অনুমতির মাধ্যমে কিছু কোম্পানিকে টাকা বানানোর হাতিয়ার হিসেবে পুঁজিবাজারকে ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছেন।

বিভিন্ন কোম্পানি আইপিও প্রসপেক্টাসে তথ্য অতিরঞ্জিত ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আয় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখালেও কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের আসল চিত্র বেরিয়ে এসেছে। আইপিওর অনুমোদন পাওয়ার দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয়ে (ইপিএস) মারাত্মক অবনতি দেখা দিয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অনুমোদন নিয়ে যেসব কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি কোম্পানিই ছিল নিম্নমানের। ইপিএস ও সংশ্লিষ্ট শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব কোম্পানির ইপিএস তালিকাভুক্তির সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেছে। উৎপাদন বন্ধ ও লোকসানের কারণে ইতোমধ্যে ১০টি কোম্পানি ‘জেড ক্যাটাগরি’তে নেমে এসেছে। আইপিওর মাধ্যমে বর্তমান কমিশন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে উত্তোলনের অনুমতি দেয় কোম্পানিগুলোকে।

এর বাইরে রাইট ও রিপিট পাবলিক অফারের (আরপিও) মাধ্যমে আরও হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেয়া হয়। প্রিমিয়াম পেতে যেসব কোম্পানি আয় বাড়িয়ে দেখিয়েছিল, সেগুলোর বড় অংশের আয়ই কমে গেছে। বিগত ৮ বছরে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তির চিত্র-

অর্থবছরইস্যুয়ার কোম্পানির সংখ্যা
ডিএসই সিএসই
২০১১-১২ ১৫ ১৫
২০১২-১৩ ১৫ ১৫
২০১৩-১৪ ১৩ ১৩
২০১৪-১৫ ২০ ২০
২০১৫-১৬ ১১ ১১
২০১৬-১৭ ৯ ৯
২০১৭-১৮ ৯ ৯
২০১৮-১৯ ১১ ১১
সূত্র : বিএসইসি

জানা গেছে, মূলধন উত্তোলন বিষয়ে এসইসির আলাদা বিভাগ ও কমিশনার থাকলেও আইপিও অনুমোদনে চেয়ারম্যানের ইচ্ছাই সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে। গত ৮ বছর আইপিওতে স্টক এক্সচেঞ্জের মতামতও উপেক্ষা করা হয়েছে।

আইপিও প্রসপেক্টাসে দেয়া তথ্যের সত্যতা ও যথার্থতার দায় রাখা হয়েছে ইস্যু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। কিন্তু আইপিওতে দেয়া ভুল বা মিথ্যা তথ্যের কারণে কোনো ইস্যু ম্যানেজারকে শাস্তি পেতে হয়নি। পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, আমরা বহুদিন ধরে বলে আসছি আইপিও অতিমূল্যায়িত হচ্ছে।

তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালক ও ইস্যু ম্যানেজাররা মিলে আইপিওতে দেয়া আয় ও অন্যান্য মৌলভিত্তির তথ্য অতিরঞ্জিত করে।

এর মাধ্যমে তারা বিনিয়োগকারীকে বেশি মূল্যে শেয়ার কিনতে প্রলুব্ধ করে এবং পরবর্তীতে যখন কোম্পানির আসল তথ্য বের হয় তখন শেয়ারের দর কমে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এক্ষেত্রে আইপিওতে যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে না পারার দায় বিএসইসির। বর্তমান কমিশনের আমলে অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ১০টি রয়েছে জেড ক্যাটাগরিতে।

এগুলো হচ্ছে— সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, ঢাকা ডায়িং, এমারেল্ড অয়েল, ইভিন্স টেক্সটাইল, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিবিবি পাওয়ার, আইএসএন লিমিটেড, খুলনা পেপার, পদ্মা লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও তুংহাই ডায়িং। এছাড়া তার আমলে অনুমোদন পাওয়া আরও যেসব কোম্পানির ইপিএস কমেছে বা বরাদ্দ মূল্যের নিচে লেনদেন হচ্ছে, সেগুলো হলো- জাহিনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, জাহিন স্পিনিং মিলস, রংপুর ডেইরি অ্যান্ড ফুড প্রডাক্টস, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন, এনভয় টেক্সটাইলস, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস, আমরা টেকনোলজিস, সায়হাম কটন মিলস, অ্যাপোলো ইস্পাত, ফ্যামিলিটেক্স, সেন্ট্রাল ফার্মাসিউটিক্যালস, বেঙ্গল উইন্ডসর থার্মোপ্লাস্টিক, ওরিয়ন ফার্মা, গ্লোবাল হেভি কেমিক্যাল কোম্পানি, হামিদ ফ্যাব্রিক্স লিমিটেড, ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডায়িং ইন্ডাস্ট্রিজ, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ লিমিটেড, ফার কেমিক্যাল, দি পেনিনসুলা চিটাগং লিমিটেড, মোজাফফর হোসেন স্পিনিং মিলস, রিজেন্ট টেক্সটাইলস, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, ন্যাশনাল ফিড মিল, ইয়াকিন পলিমার উল্লেখযোগ্য।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কোম্পানিগুলো আইপিওতে আসার সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে লাভের মাত্রা বাড়িয়ে দেখায়। অনেক সময় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ইস্যু ম্যানেজাররাও আয় বাড়িয়ে দেখানোর যোগসাজশে থাকে।

এমন পরিস্থিতিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন খতিয়ে দেখা উচিত ছিল বিএসইসির। আর কোনো আইপিওতে স্টক এক্সচেঞ্জের মতামত উপেক্ষা করে মূলধন উত্তোলনের অনুমোদন দেয়া হলে তার পুরো দায় নিতে হবে বিএসইসিকে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ


সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত