বৃহস্পতিবার ২৮ মে ২০২০

১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

আসাদুজ্জামান আজম

প্রিন্ট সংস্করণ

মার্চ ১১,২০২০, ০১:৩৪

মার্চ ১১,২০২০, ০৬:০৫

সাক্ষাৎকারে যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ

যুবলীগ হবে গণমানুষের

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বিশাল যুব গোষ্ঠীকে দেশ গঠনের কাজে সম্পৃক্ত করতে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম যুব সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের যাত্রা শুরু হয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তার ভাগ্নে তৎকালীন সময়ের তুমুল জনপ্রিয় যুবনেতা, মুজিববাহিনীর অধিনায়ক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যুবলীগের ভূমিকা উজ্জ্বল।

তবে কিছু ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদের কারণে সময়ে সময়ে সমালোচনার মধ্যে পড়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এ সংগঠনটি। সাম্প্রতিক সময়ে অসৎ পথে অবৈধ অর্থ অর্জন, ক্যাসিনোসহ অনৈতিক ব্যবসায় সংগঠনটির বেশ কিছু নেতার সম্পৃক্ত থাকার তথ্যে দেশজুড়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

চরম এ দুঃসময়ে সংগঠনটিকে আদর্শের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নির্দেশে যুবলীগের হাল ধরেন প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির জ্যৈষ্ঠপুত্র শেখ ফজলে শামস পরশ।

ব্যক্তিজীবনে রাজনৈতিক জীবনের বাইরে থাকলেও বাবার কৈশোর-যৌবনকালের ঘাম ঝরানো আদর-ভালোবাসায় গড়া সংগঠনের ক্রান্তিকালে ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনি। নিজে সেলফিশ বা স্বার্থপর নন বলেই ক্রাইসিস মুহূর্তে যুবলীগ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন।

গত ৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বনানীর নিজ বাসভবনে আমার সংবাদের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে দায়িত্ব নেয়া প্রসঙ্গে এককথায় এমন মন্তব্য করেন যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ইতিহাসের ভিত রচিত হওয়া পরিবারের সদস্য হয়েও দীর্ঘ সময় পরে কেন রাজনীতিতে এলেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, একটি পরিবারে সবার রাজনীতি করার দরকার নেই। সবাইকে রাজনীতিবিদ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমি ভিন্নভাবে একাডেমিক লাইভ ইনজয় করছিলাম, এখনো করি। আমি এখনো শিক্ষকতা করি। আমি একাডেমিকভাবে রাজনৈতিক ছিলাম।

পলিটিক্যাল টপিক আমাকে ইন্টারেস্ট করে, কিছু কিছু গবেষণার মাধ্যমে একাডেমিক রাজনীতি করে আসছি। তাই ওইদিকে পড়ালেখা করতাম। এখন যেটা হয়েছে, এটা একটি ক্রাইসিস মুহূর্ত।

তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয়েছে সংগঠনটার ইমেজ ফেরাতে আমার কিছু করণীয় আছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অনেক শখ করে আমার বাবা এই সংগঠনটাকে তৈরি করেছিলেন। এই অবস্থায় এই সংগঠনের যদি দায়িত্ব না নেই তাহলে নিজের কাছে নিজেকে দোষী মনে হবে বা সেলফিশ মনে হবে, স্বার্থপর মনে হবে। সে কারণে আমি ভেবেছি, এখানে আমার কিছু দেয়ার আছে। ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কাজ করবো।

কেমন যুবলীগ গড়তে চান, জানতে চাইলে শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন, এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ভবিষ্যৎ লিডারশিপ তৈরি করা। যারা প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমি সারাজীবন থাকবো না।

কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যেন এই সংগঠন নিয়ে গর্ব করতে পারে। এই সংগঠন কোনো ভোগের উৎস হবে না। এই সংগঠন যেন দেশের মানুষকে কিছু দিতে পারে। এ সংগঠন যেন সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আদর্শবাদী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করবো। এ বিষয়ে আমি এবং আমার সাধারণ সম্পাদক কঠোর আছি।

যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, সৎ থাকা, স্বচ্ছভাবে নিয়োগগুলো করা। আদর্শের জায়গায় কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজ না করা। বেসিক জিনিসগুলো ঠিক করলে সবকিছু ঠিক। তাহলে বদনাম হওয়ার সুযোগ নেই। বেসিক জিনিসগুলো গড়তে গলদ হয়, তাহলে ভিন্ন রকম পরিস্থিতি চলে আসে।

চেষ্টা করছি সততা ও নিষ্ঠার সাথে রাজনীতি করতে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ওই রাজনীতি আমরা ফিরিয়ে আনতে চাই। যা গণমানুষের রাজনীতি ছিলো। দরিদ্র মানুষের সাথে থাকা। অসহায় নিপীড়িত মানুষের সাথে থাকা। এগুলোই করতে চাচ্ছি।

শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন, আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন- সম্মেলনের মধ্যদিয়ে আমরা দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমে দুস্থ মানুষের কাছে শীতবস্ত্র নিয়ে গেছি। বস্তিতে পোড়া মানুষের কাছে গেছি।

আসলে গণমানুষের যে রাজনীতি— মানুষের সেবা করা, সেই বেসিক রাজনীতি করছি। নিজেদের লাভবান করতে রাজনীতি করতে চাই না। মানুষকে দেয়া ও মানুষের জন্য রাজনীতি করতে চাই।

আমাদের চাওয়া-পাওয়ার তেমন কিছু নেই। একটাই চাওয়া মানুষ যেন ভালো থাকে। কোনোভাবেই যেন নির্যাতিত না হয়। নিপীড়িত বা অবহেলিত না হয়। এটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

বিতর্কমুক্ত যুবলীগ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধু পরিবারের এ সদস্য বলেন, আমরা সময়ে সময়ে মিলিটারি শাসন এবং অগণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা শোষিত হয়েছি অনেক বছর। আমরা অনেক সময় ক্ষমতায় ছিলাম না। আমরা কখনো ক্ষমতার রাজনীতি করি না। আমাদের ওপর দিয়ে অনেক নির্যাতন গেছে।

আমাদের ছেলেরা অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময় বঞ্চিত হয়েছে। সে কারণে তারা একটু পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। এটা বড় সমস্যা নয়, সমাধান করা সম্ভব, আমরা যুবলীগের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবো।

যদি কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে তাহলে যুবলীগে তাদের সুযোগ হবে না। ছোটখাটো অভিযোগ থাকলে সেকেন্ড সুযোগ দেয়া যেতে পারে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে স্থান দেয়া হবে। এ ব্যাপারে আমি এবং সাধারণ সম্পাদক একমত।

কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি হওয়ার পথে। যেহেতু আমরা ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করছি। অনেক উৎসাহ ও আগ্রহ থাকায় দেড় হাজারেরও বেশি সিভি জমা হয়েছে। আর আগে এতো সিভি কখনো পড়েনি। এটা রেকর্ড। সেজন্য এই কমিটি আমরা তাড়াহুড়ো করে করতে চাই না। ধীরে সুস্থে এই কমিটিটা করা হচ্ছে। যুবলীগের প্রতি সবারই আগ্রহ আছে।

তাড়াহুড়ো করছি না, একটু সময় লাগবে কিন্তু ভালো একটি কমিটি হবে। রাজনৈতিক কর্মীরা হ্যাপি হবে কী না জানি না কিন্তু জনগণ হ্যাপি হবে এবং দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হবে।

তৃণমূলে যুবলীগ পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিয়ে শেখ পরশ বলেন, আপনারা দেখেছেন আমরা প্রতিনিধি সভা শুরু করেছি। ইতোমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সভা শেষ করেছি এবং তাদের আমরা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছি। খুব শিগগিরই আমাদের অনেক সম্মেলন হতে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে আমরা এগোচ্ছি।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো করার জন্য একটা টাইমলাইন দিয়ে দেবো। সে কার্যকলাপ আমরা শুরু করেছি। ইতোমধ্যে একটি উপজেলায় সম্মেলন করেছি।

শিক্ষকতা এবং রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে যুবলীগ চেয়ারম্যান বলেন, আমার কাছে সব মানুষ। স্টুডেন্টরা আমার কাছে সন্তানের মতো। সংগঠনের কর্মীরাও ছোট ভাইয়ের মতো, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের মতো। একটাতে মানুষ বেশি, ব্যস্ততা বেশি। কিন্তু আমি মিলাতে পারি।

একটা ক্ষেত্রে, একটি হচ্ছে ছোট বাচ্চাদের আলো দেখানো, আরেকটা হচ্ছে সংগঠনের বিশাল একটি যুবক শ্রেণির ছেলেদের আলো দেখানো। দুটি বিষয়ই হচ্ছে আলো দেখানো।

যুবলীগের কর্মী পরিচয় দিলে কোথাও যেন গালি শুনতে না হয়। সম্মানের সাথে সবাই যেন চলতে পারেন, সেটা নিশ্চিতে কাজ করছি। আর এটাই হচ্ছে আমার মূল লক্ষ্য।

মুজিববর্ষে যুবলীগের উদ্যোগে বছর ব্যাপী কর্মসূচির পরিকল্পনা তুলে ধরে শেখ ফজলে শামস পরশ বলেন, মুজিব আমাদের কাছে একটি অনুভূতি, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও প্রেমের নাম।

সেই ভালোবাসা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখেই আমাদের এগোতে হবে। জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে যুবলীগ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেছে।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চে সারা দেশে জাতির জনকের ভাষণ প্রচার, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজনসহ আওয়ামী লীগ ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছে যুবলীগ।

৮ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বঙ্গবন্ধু, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা এবং যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির জীবনীর ওপর আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ১৭ মার্চ জন্মশতবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, ১৮ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ দোয়া মাহফিল, এতিম ও দুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ, ২৫ মার্চ থেকে সারা দেশে বছরব্যাপী যুবলীগের উদ্যোগে রক্তদান কর্মসূচি গ্রহণ এবং প্রত্যেকটি জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ওপর চিত্রাঙ্কন, রচনা প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার বিতরণ।

এছাড়া ১ এপ্রিল থেকে বছরজুড়ে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারা দেশে যুবলীগের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা।

শেখ ফজলে শামস পরশের সংক্ষিপ্ত জীবনী
শেখ ফজলে শামস পরশ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির জ্যৈষ্ঠ পুত্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কালরাতে তার বাবা-মা শহীদ হয়েছিলেন।

এরপর দীর্ঘ প্রতিকূলতা পেরিয়ে জীবন এগিয়ে আনতে সংগ্রাম করেছেন তিনি। ধানমন্ডি সরকারি বালক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে দ্বিতীয়বার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে গত ১০ বছর ধরে শিক্ষকতা করে আসছেন।

তার ছোট ভাই ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র।শেখ পরশ দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন।

যুবলীগের মূল কাজ হচ্ছে— বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র্যদূরীকরণ, দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষা সমপ্রসারণ, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা। পাশাপাশি যুবসমাজের ন্যায্য অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করা।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ