মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

জানুয়ারি ১৮,২০২০, ০৫:৩২

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

ধান রোপনে দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্পের উদ্বোধন

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যখন সব কিছুই পাল্টে যাচ্ছে। কৃষি তখন পিছিয়ে থাকবে কেন? এমনি প্রতিজ্ঞা নিয়ে ব্যারিস্টার গোলাম কবির ভূইয়া যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসে ইন্টারনেটের সাহায্যে কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলার বোরগাঁও গ্রামে গড়ে তুলেছেন আধুনিক কৃষি প্রকল্প। দেশের কৃষিতে যখন নাভিশ্বাস কাজ করছে ঠিক তখনি রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ধান রোপনের বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছেন এই ব্যারিস্টার। শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুর ১২ টায় প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান আধুনিক এই যুগে সরকার কৃষিকে খুবই গুরুত্বের সাথে দেখছে। ফসল উৎপাদনে কৃষকের খরচ কমাতে সারসহ সব জায়গায় ভর্তুকি দিচ্ছে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে। সাথে সাথে মেশিন ক্রয়েও ভর্তুকি দিচ্ছে। যে মেশিন বাজারে ১১ লাখ টাকা দাম। কৃষক তা ২-৩ লাখ টাকার মধ্যে পাচ্ছে। আগের যে সমস্ত মেশিন ছিল তা সমস্যা করার কারণে বর্তমানে জাপান থেকে দামি এবং মানসম্পন্ন মেশিন উৎপাদন করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ধান রোপনের এটি সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর পূর্বে আরও অনেকে এ কর্মসূচি নিয়েছে তবে তাদের পরিমাণ ছিল ১০ একর-২৫ একর। কিন্তু ব্যারিস্টার গোলাম কবির ভূইয়া, ইফতিয়াজ এন্ড নুসরাত গেরস্ত বাড়ির উদ্যোগে এক সঙ্গে ৫০ একর জায়গায় ধান রোপন করছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন অধ্যায়রে সূচনা হবে বলে তারা মনে করেন। এ বিষয়ে প্রকল্পের স্বত্বাধিকারী ব্যারিস্টার মো. গোলাম কবির ভূইয়া আমার সংবাদকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কৃষি ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে বসেই কৃষকদেরকে পলিথিনের উপর বীজ লাগানোর হাতে কলমে শিক্ষা প্রদান করা হয়। সাধারণত আমাদের দেশে ট্রেতে চারা তৈরি করা হয়। হাওরাঞ্চলসহ জেলার বিপুল জনগোষ্ঠীর অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। হাওরে বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো উৎপাদন হয়। বছরের পর বছর ধরে অকাল বন্যায় ফসল মার খেতে খেতে কৃষক সমাজ পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। চাষাবাদ করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে বাড়িঘর ছেড়েছে অগণিত কৃষক পরিবার। তারা পেশা বদল করে শহরে রিকশা-ভ্যান চালিয়ে পরিবারের জীবিকা রক্ষা করছে। কৃষকরা ধান চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় ফসলি জমির একটি বড় অংশ বছরের পর বছর পতিত থাকছে। ঠিক এ চিন্তা থেকেই আমি এ কার্যক্রম শুরু করেছি। বর্তমানে ইন্টারনেটকে কাজে লাগিয়ে সব কাজ করা যাচ্ছে। তাহলে কৃষি কেন নয়? ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে সুদুর লন্ডনে বসেও কৃষি প্রজেক্ট করা যায় আমি এটা প্রমাণ করতে পেরেছি। দেশের শিক্ষিত সমাজকে বলব কৃষি আমাদের দেশের অন্যতম সম্পদ। তাই এটা অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিতদের কাজ এটা না ভেবে আপনারাও এ কাজে মনোনিবেশ করুন। তাহলেই আমাদের দেশের কৃষি সারা পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিবে। আমি এ বছর ৫০ একর ধানের জমিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে ধান রোপন করছি এবং তা কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মাধ্যমে ধান কাটব। ব্যারিস্টার গোলাম কবির আরো বলেন, আমাদের গ্রাম অঞ্চলে এখন কৃষি শ্রমিকের সংকট রয়েছে। শস্য রোপন ও কর্তন মৌসুমে এই সংকট খুবই তীব্র আকার ধারন করে। তাতে ক্রমাগতই বেড়ে যাচ্ছে শ্রমিকের মজুরি। তদুপরি ফসল উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে সময় ক্ষেপন অপচয় ও অদক্ষতার কারণে কৃষির উৎপাদন লাভজনক হচ্ছে না। এমতাবস্থায় কৃষি কাজে যন্ত্রের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ সংকট মোকাবেলায় ধান উৎপাদনকে সম্পূর্ণরূপে প্রযুক্তি নির্ভর করার বিকল্প নেই। জমি তৈরি, আগাছা দমন এবং ধান মাড়াই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে করতে পারলেও ধানের চারা রোপন এবং ধান কাটার মত কাজগুলো কৃষক এখনো সনাতন পদ্ধতিতে করছে। তাই ধান উৎপাদন খরচের সিংহভাগ ব্যায় হয় চারা লাগানো এবং ধান কাটার কাজে। কৃষিপ্রিয় এই ব্যারিস্টারের কাছে সফলতার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত বছর তিনি ৩৫০০ মন ধান উৎপাদন করেছেন এবং তা সরকারের কাছে বিক্রি করছেন। পাশাপাশি তার ৬ টি পুুকুর রয়েছে যেখান থেকে ছয় মাস অন্তর অন্তর ২৫ টন মাছ উৎপাদন হয়। পুকুরের সাথেই একটি ডেইরি ফার্ম রয়েছে যেখানে ৬০ টি গরু লালন পালন করা হচ্ছে। এছাড়াও সাত একর জমিতে বিভিন্ন ধরনের কৃষি ফসল করা হয়। যেখান থেকে প্রায় প্রতি বছর ২০০-২২০ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন হয়। ভবিষ্যতে এ উৎপাদন আরো বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এছাড়াও যন্ত্র চালানো ও রক্ষণাবেক্ষনের উপর বেশকিছু প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও পরিচালিত হয়েছে। সুখের কথা হলো রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের ব্যপক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকেও মাঠ প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে সঠিক সময়ে অল্প দিনের চারা রোপন করা সম্ভব। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রের জন্য ট্রেতে উৎপাদিত চারা রোগ বালাই মুক্ত, সম ঘনত্বের সবল সতেজ চারা উৎপাদিত হয় ও পলিথিন সীট দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় ফলে তীব্র শৈত্য প্রবাহেও চারা সুস্থ থাকে। এ যন্ত্রের মাধ্যমে ধানের চারা সারিতে রোপন করা যায় ফলে গাছ পর্যাপ্ত আলো বাতাস পায়, সমভাবে খাদ্য গ্রহণ করে, কুশির সংখ্যা বৃদ্ধি হয় ফলে ধানের ফলন বৃদ্ধি পায় ও বীজতলা ও ধান ক্ষেতে আন্ত:পরিচর্যা (সেচ, নিড়ানী, স্প্রে) করতে সুবিধা হয়। তাড়াইল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা নূরে আলমের সঞ্চলনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কিশোরগঞ্জ খামারবাড়ীর পরিচালক সাইফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন উপজেলা কৃষি অফিসার আনোয়ার হোসেন, জাওয়ার ইউপির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিয়া, তাড়াইল থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মিজানুর রহমান, কৃষক প্রতিনিধি এমদাদুল হক রতন প্রমুখ। এসময় ব্যারিস্টার মো. গোলাম কবির ভূইয়ার পক্ষে মানপত্র পাঠ করেন ওমর ফারুক। এর আগে শোক প্রকাশ ও মোনাজাত করা হয় বগুড়া-১ আসনের এমপি ও কৃষি সম্প্রসারণের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য কৃষিবিদ এম এ মান্নানের মৃত্যুতে। আমারসংবাদ/জেআই