মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০

১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

এস.এস শোহান, বাগেরহাট

মার্চ ৩১,২০২০, ১১:০৭

মার্চ ৩১,২০২০, ১১:০৭

চুরির অপবাদ দিয়ে বাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট, নারীদের মারধর

বাগেরহাটের চিতলমারীতে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে চুরির অপবাদ দিয়ে দুটি বসত বাড়ি ভাংচুর, লুটপাট ও বাড়িতে থাকা নারীদের মারধর করেছে প্রতিপক্ষরা। শুধু ভাঙচুর ও মারপিট করে খ্যান্ত হয়নি, ঘরের মধ্যে থেকে পোশাক বাড়ির আঙ্গিনায় এনে পুড়িয়ে ফেলেছে হামলাকারীরা।

লুটপাট ও ভাংচুরকারিরা ওই বাড়ি থেকে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকাসহ সিন্দুক, ৮টি গরু, ১০ টি ছাগল, শতাধিক কবুতরসহ নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক মালামাল লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা।

সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে প্রকাশ্যে এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে চিতলমারী উপজেলার কুনিয়া গ্রামের সদর আলী মীরের বাড়িতে। ঘটনার একদিন অতিবাহিত হলেও থানায় কোন মামলা হয়নি।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলেও ওই বাড়ির কোন পুরুষ লোক বাড়িতে আসেনি। তাদের কয়েকজন নিকট আত্মীয়, এক গৃহবধু ও একটি ছেলে ওই বাড়িতে অবস্থান করছেন। রান্না ঘরে রান্না করার মতও ব্যবস্থা নেই। আত্মীয়দের বাড়ি থেকে দেওয়া খাবারে চলছে তাদের দিন।

মারধরের শিকার সদর আলী মীরের পুত্রবধু ইতি বেগম বলেন, দুপুরে হঠাৎ করে ইকবাল, সফিক ও ফেরদৌস আলমের নেতৃত্বে এলাকার ২৫-৩০ জন যুবক আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। বাড়িতে থাকা সকলকে এলোপাথারি মারপিট শুরু করে। আমার দুই ভাসুর মিজানুর ইসলাম ও আমিনুর ইসলাম প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়।

তারা আমাদের ঘরের মধ্যে থাকা সবকিছু ভাংচুর করে। আমরা চিৎকার শুরু করলে আমার জা সানজিদা বেগমের গলায় ছুরি ধরে তার কোল থেকে ১৮ মাসের বাচ্চা নিয়ে যায়। বাচ্চার গলায়ও ছুঢ়ি ধরে বলে চিৎকার করলে মেরে ফেলব। প্রায় দুই ঘন্টা তান্ডব চালিয়ে তারা লোহার সিন্দুকে রাখা ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকাসহ সব কিছু নিয়ে চলে যায়। এতে আমাদের প্রায় ১৫ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।

মারধরের শিকার সদর আলী মীরের আরেক পুত্রবধু সানজিদা বেগম বলেন, রকিতের ছেলে হেলাল ও হারুণ যখন আমাদের লোহার সিন্দুক নিয়ে যাচ্ছিল। আমি বাধা দিলে আমার গলায় ফাস দেয় এবং আমার কোলের সন্তান ফারিয়াকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায়।ওরে দূরে ফেলে দেয়। পরে সিন্দুকসহ মালামাল নিয়ে চলে যায়।

সদর আলীর ছেলে হাফিজুর রহমান বলেন, আমি দীর্ঘদিন সৌদি আরব ছিলাম। সিন্দুকের মধ্যে আমার প্রবাস জীবনের কষ্টার্জিত অনেক টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ছিল, ব্যাংকের চেক, জমির দলিলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিল। সবকিছু মিলিয়ে তারা আমাদের দুটি ঘর ভাংচুর ও লুটপাট করে আমাদের ১৫ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।আমরা এর বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাই।

সদর আলী মীরের নাতি শিশু সাগর ইসলাম বলেন, হঠাৎ করে অনেক লোকজন ঢুকে আমাদের মারপিট শুরু করে। আমার বাবা ও চাচা প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়। আমাদের দুটি ঘর ভাংচুর করে। সন্ত্রাসীরা আমাদের ঘর, মটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, আলমিরা, খাট, রান্নাঘর, সবকিছু ভাংচুর করে। ঘরের মধ্য থেকে জামাকাপড় নিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। যাওয়ার সিন্দুক, সময় গরু, ছাগল, কবুতর, হাস, আলুসহ অনেক কিচু নিয়ে যায় তারা। তাদের তান্ডব দেখে আমরা ভয়ে চুপ করেছিলাম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, জমিজমা নিয়ে বিরোধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি গ্রুপ সদর আলী মীরকে সায়েস্তা করার চেষ্টা করছিল। এর অংশ হিসেবে সাগর বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তিকে চুরির অপবাদ দিয়ে মারপিট করে স্থানীয় তারা। সদর আলী ও তার ছেলেরা চুরির সাথে জড়িত এমন স্বীকারোক্তি নেয় তারা সাগরের কাছ থেকে। পরে তাদের সদর আলী মীরের বাড়িতে হামলা করার জন্য রবিবার স্থানীয় একটি বাড়িতে স্থানীয় মেশকাত আহমেদ, রেজ্জাক, ইউপি সদস্য এমদাদুল হক, ফেরদাউস আলম, শাহা মীর, সমীরসহ স্থানীয়রা সভা করে এই হামলা পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সোমবার দুপুরে ওই বাড়িতে হামলা হয়।

হামলার সাথে জড়িত ফেরদাউস আলম বলেন, সদর আলী মীর ও তার ছেলেরা এলাকায় অনেক চুরি করেছে। তাই এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে এই হামলা করেছে। তবে এভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়া ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাড়িতে থাকা নিকট আত্মীয় সাগরিকা ও মোঃ সোলায়মান ফকির বলেন, এমনভাবে হামলা করা হয়েছে যা বর্ণনাতীত। এই বাড়িতে এখন রান্না করে খাওয়ারও ব্যবস্থা নেই। থাকার খাটও ভাঙ্গা। প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বাড়ির লোকরা। আমরা এসে থাকছি।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার পঙ্কজচন্দ্র রায় বলেন, যে পরিবারটির ঘরবাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। তাদের নামে চুরি-ডাকাতির মামলা থাকায় এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। অভিযুক্তদের আটকের চেষ্টা চলছে।

আমারসংবাদ/এমআর