বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

নুর মোহাম্মদ মিঠু

প্রিন্ট সংস্করণ

এপ্রিল ০৬,২০২০, ০৪:৩৬

এপ্রিল ০৬,২০২০, ০৪:৩৬

সরকার ও মালিক থেকে মিলছে না সহায়তা

বেকার ৭১ লাখ পরিবহন শ্রমিক

করোনা ভাইরাস। বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে ভাইরাস ইতোমধ্যে মহামারি রূপ ধারণ করেছে। কোনো কোনো দেশে একদিনেই মারা গেছে ১৩৫৫ জন। বহির্বিশ্বে এই যখন অবস্থা, তখন বাংলাদেশেও পাল্লা দিয়ে তেড়ে ওঠার সিঁড়িতে এ ভাইরাস।

এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে এ ভাইরাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে আটজনের। সংক্রমণের মাত্রা এখনো নিম্নপর্যায়ে থাকলেও যথেষ্ট কড়াকড়ির মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে সরকার।

ফলে দেশজুড়ে প্রায় সব সেক্টরেই ঘোষণা করা হয়েছে জরুরি ছুটি। প্রথম দফার ছুটিতেও করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের নমুনা দেখা না যাওয়ায় ছুটি বাড়ানো হয় দ্বিতীয় দফায়।

এ ছুটির মধ্যেই নিষেধাজ্ঞায় পড়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সেক্টর— গণপরিবহন। যা বন্ধের মাধ্যমে জনগণের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায় সরকার।

প্রথম দফায় ২৬ মার্চ থেকে গতকাল ৪ এপ্রিল পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ফের গতকাল থেকেই আগামী শনিবার অর্থাৎ ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানো হয়।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপ-প্রধান তথ্য অফিসার মো. আবু নাছের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এর পরপরই সরকারি বাসভবন থেকে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে।

তবে, জরুরি সার্ভিসের জন্য পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ওষুধ, জ্বালানি, পচনশীল দ্রব্য, ত্রাণবাহী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। কিন্তু পণ্যবাহী পরিবহন ও ট্রাকে কোনোভাবেই যাত্রী পরিবহন করা যাবে না।

তিনি বলেন, সাধারণ ছুটির মধ্যে যানবাহনের ফিটনেস কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে জরিমানা ছাড়া নির্ধারিত ফি ও কর দিয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত লাইসেন্স আবেদন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

তবে সরকারের দেয়া এ সুযোগের বিষয়ে গণপরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, এ মুহূর্তে এসব সুযোগ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমরা যারা দৈনিক মজুরিভিত্তিতে গণপরিবহনে সুপারভাইজিং ও হেলপারি করি, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের পরিবারের কি অবস্থা সে বিষয়ে কেউই খোঁজ নিচ্ছে না।

অনেক হেলপার-সুপারভাইজারের পরিবার না খেয়ে আছে। অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছে। মালিক পক্ষ কিংবা সরকার কেউ খোঁজ নিচ্ছে না। সরকারের দেয়া ত্রাণও আমরা পাচ্ছি না। দীর্ঘদিন ধরে বেকার থাকায় করোনা নয় বরং ক্ষুধার জ্বালায়ই মরতে হবে গণপরিবহন শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি হানিফ খোকন আমার সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশে ৭১ লাখ পরিবহন শ্রমিক রয়েছে। বাস. মিনিবাস, হিউম্যান হলার, ট্যাম্পু, অটো টেম্পু, সিএনজি অটোরকিশাসহ সবমিলিয়ে।

এসব পরিবহন শ্রমিকদের কারোরই নিয়োগপত্র নেই, কোনো মাসিক বেতন নেই, নেই বোনাসও। এই ৭১ লাখ শ্রমিকই দৈনিকভিত্তিতে কাজ করে। আপনারা দেখে থাকবেন পরিবহন শ্রমিকরা বিভিন্ন সময়ে ভাড়া বেশি নেয়। এই বাড়তি ভাড়াটাও কিন্তু তাদের পকেটে যাচ্ছে না, এ টাকার পুরোটাই যাচ্ছে মালিকদের পকেটে।

তিনি বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কিন্তু পরিবহন শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্নভাবে সংকটময় এ মুহূর্তে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। তাও পরিবহন শ্রমিকরা পাচ্ছে না।

পাচ্ছে না কেন— এমন প্রশ্নে হানিফ খোকন বলছেন, যারা ত্রাণ দিচ্ছে তাদের অকেনেই মনে করছেন পরিবহন শ্রমিকরা অনেক টাকা ইনকাম করে। এদের দিবো কেন? এমন একটা ধারণা মানুষের মধ্যে কাজ করছে। অথচ পরিবহনসংশ্লিষ্ট অনেকেই লজ্জা কিংবা সংকোচের কারণে কোথাও যেতে পারছে না।

কিন্তু আমাদের কাছে সারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন করে পরিবহন শ্রমিকরাই বলছে, ‘আমাদের জন্য কিছু করেন’। আসলে আমাদের সংগঠনেরই বা ক্ষমতা কতটুকু।

তবুও গত শুক্রবার আমরা (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ) রাজধানীর শ্যামপুর এলাকায় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছি। আজ (গতকাল শনিবার) বিকালেও রাজধানীর মুগদা এলাকায় পুনরায় ত্রাণ বিতরণ করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান যে প্রেক্ষাপট, এতে সবাই কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত।

তবুও এ প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে স্বল্প আয়ের পরিবহন শ্রমিক যারা আছেন, তাদের যেন অন্ততপক্ষে প্রত্যেক মালিক প্রত্যেক শ্রমিককে অন্তত এক মাসের সমপরিমাণ আয় হয় এমন পরিমাণ অর্থ যেন দেয়।

মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যবস্থা যাতে নিশ্চিত করা হয় সে ব্যাপারে আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাবো এবং অনতিবিলম্বে সরকারের হস্তক্ষেপও কামনা করছি।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেকার অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করা পরিবহন শ্রমিকরা ত্রাণ পায় সে ব্যবস্থাও যাতে নিশ্চিত করে সরকার।

এখন পর্যন্ত সরকার গণপরিবহন শ্রমিকদের জন্য কিছু করেছে কি না এবং ত্রাণ সহযোগিতা পাঠিয়েছে কি না— জানতে চাইলে হানিফ খোকন বলেন, না, এখন পর্যন্ত সরকার থেকে কোনো রকমের সহযোগিতা গণপরিবহন শ্রমিকদের জন্য দেয়া হয়নি, শ্রমিকরা এখন পর্যন্ত কিছুই পায়নি।

গণপরিবহন শ্রমিকদের একটি সূত্র জানায়, যেসব গাড়িচালক চুক্তিভিত্তিতে কাজ করে তাদেরও মালিকের জমা আর রাস্তা খরচ মিটানোর পর যে আয় হয় তা দিন চালাতেই ব্যয় হয়ে যায়। তেমন কোনো সঞ্চয় থাকে না।

বর্তমানে রাস্তায় গাড়ি বের করতে না পারায় উপার্জনের পথ বন্ধ থাকায় সেসব পরিবহন শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। উপায়হীন হয়ে অনেক সিএনজি অটোরিকশাচালক রাস্তায় নামার চেষ্টা করছে। যা চলাচল নিয়ন্ত্রেণের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ দুর্যোগ মোকাবিলার প্রচেষ্টাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পুলিশ সদস্যরাও সড়কে সিএনজি চলতে দেখলে চাবি নিয়ে যাচ্ছে— এমন অভিযোগ চালকদের।

এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার সফিকুল ইসলাম বলছেন, সিএনজি-অটোরিকশাও গণপরিবহনের মধ্যেই পড়ে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কেউ সড়কে গাড়ি নামালেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থ গ্রহণ করবে পুলিশ।

এদিকে শ্রমিক সূত্রটি আরও বলছে, পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহার-অনাহারে থাকার যন্ত্রণা ট্যাক্সিকার, অটোরিকশা চালকসহ পরিবহন শ্রমিকদের কাছে করোনা সংক্রমণের ভয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠছে।

অনাহারে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে। তাই করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধের চলমান প্রচেষ্টাকে সফল করার পাশাপাশি দুর্যোগ পরবর্তী অর্থনীতিকে সচল করতেও এসব শ্রমজীবীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

গণপরিবহন শ্রমিকদের রক্ষা করতে ক্রিয়াশীল ট্রেড ইউনিয়নসমূহ থেকে তালিকা সংগ্রহ করে তালিকাভুক্ত শ্রমিক পরিবারসমূহকে বিনামূল্যে খাদ্য ও করোনা সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা জেলা ট্যাক্সি কার, অটোটেম্পু, অটোরিকশাচালক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহাজালাল ও সধারণ সম্পাদক আহাসান হাবিব বুলবুল।

বাংলাদশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ আমার সংবাদের কাছে দাবি করে বলেন, গণপরিবহন শ্রমিকদের তো মালিক সমিতি সহযোগিতা করছেই।

আমি নিজেই তো সকল জায়গায় সহায়াতা পাঠিয়েছি চালক প্রতি দুই হাজার টাকা করে। কক্সবাজার, চিটাগাং, ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর— সব জায়গাতেই। এরকম অনেক মালিকই আছেন যারা সহযোগিতা পাঠাচ্ছেন। কেউ কেউ হয়তো দেয়নি।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার এনা পরিবহনের জন্য ইতোমধ্যে আমি প্রায় ২০ লাখ টাকার সহযোগিতা পাঠিয়েছি। বিশেষ করে রাজধানীর মহাখালী টার্মিনালে আমি প্রতিদিনই দিচ্ছি। ২০-২৫ জন করে চালক দৈনিক আসছে, সাহায্য নিয়ে যাচ্ছে। আমরা ডাকঢোল পিটিয়ে দিচ্ছি না মানুষ জড়ো করে।

অন্য মালিকদের প্রতি আপনার কি নির্দেশ থাকবে সমিতির নেতা হিসেবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেউ কেউ দিচ্ছে, আবার অনেক মালিক আছেন যারা নিজেরাই দিন এনে দিন খায়। একটি মাত্র গাড়ির উপর নির্ভরশীল এরকম হাজার হাজার মালিক আছে দেশে। ওই গাড়ি না চললে তার পরিবারই উল্টো অচল হয়ে পড়ে।

আমারসংবাদ/এসটিএমএ