বুধবার ২৭ মে ২০২০

১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ই-পেপার

তারেক পাঠান, পলাশ (নরসিংদী)

জানুয়ারি ১৪,২০২০, ০৯:২১

ফেব্রুয়ারি ০৯,২০২০, ১০:০৯

পলাশে মোগল আমলের তিন গম্বুজ মসজিদ

নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় রয়েছে মোগল আমলের মুসলিম সভ্যতার অনুপম নিদর্শন পারুলিয়ার তিন গম্বুজ মসজিদ। প্রায় ৪০০ বছর আগের এই ঐতিহাসিক মসজিদটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর এই মসজিদটির পাশেই রয়েছে ইশা খাঁর পঞ্চম অধস্তন পুরুষ দেওয়ান শরীফ খাঁ ও তার স্ত্রী মুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যা জয়নব বিবির যুগল মাজার। সরেজমিন স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৭১৯ হিজরিতে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি নির্মাণ করেন জয়নব বিবি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫৮০ থেকে ১৭২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তৎকালীন ঢাকা জেলা বর্তমানে নরসিংদী জেলার মহেশ্বরদী নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন। সুবেদার নিযুক্ত হওয়ার পর তার কনিষ্ঠ কন্যা জয়নবকে ঈশা খাঁর পঞ্চম অধস্তন পুরুষ মনোয়ার খাঁর পঞ্চম ছেলে শরীফ খাঁর সাথে বিবাহ দিয়ে জামাতাকে মহেশ্বরদী পরগনার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। তখন থেকেই তিনি দেওয়ান শরীফ খাঁ নামে পরিচিতি লাভ করেন। আর এ এলাকার নামকরণ করা হয় শরীফপুর। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, হুসেন শাহীর শাসন আমলে ধনপদসিংহ নামে এক রাজা ছিল তার পুত্র রাজা নরসিংহ শীতলক্ষ্যার তিন মাইল আগে ব্রহ্মপুত্রের তীরে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলেন। সেখানে তার নামে নামকরণ করেন নগর নরসিংহপুর। আজও নগর নরসিংহপুর বিদ্যমান। তবে কালের আবর্তে শরীফপুর নামের বিলুপ্ত ঘটেছে। তৎসময়ে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে বড় বড় পাল উড়িয়ে পালের নৌকা আসা যাওয়া করত। পালের নৌকা দেখতে এলাকবাসী নদীর তীরে যেত। তখন থেকেই এর নামকরণ পরিবর্তন করে করা হয় পারুলিয়া। ১৭১৯ হিজরিতে দেওয়ান শরীফ খাঁর স্ত্রী জয়নব বিবি এলাকার মানুষের চাহিদা মোতাবেক মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের আওতায় রয়েছে ১২ বিঘা সম্পত্তি। এখানে রয়েছে চারটি শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। মসজিদটি ৫ ফুট প্রস্থ দেয়াল, তার মধ্যে মজবুত পাথর দিয়ে খিলানের ওপর ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য মসজিদটি নির্মিত। মসজিদে প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি প্রধান গেট, পূর্ব দিকে তিনটি দরজা, উত্তর-দক্ষিণে একটি করে দরজা। মসজিদের পাকা বেষ্টনী প্রাচীরের অভ্যন্তরে রয়েছে প্রশস্ত প্রাঙ্গণ। প্রাঙ্গণের উত্তর-পূর্ব কোনে রয়েছে সুউচ্চ দুটি মিনার। স্থানীয় প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ইরান, বাগদাদ, ইয়েমেন দেশ থেকে কারিগর এনে মসজিদের নির্মাণ ও কারুকাজ করা হয়। মসজিদের সম্মুখভাগের ওপর একটি স্মৃতিফলকে লেখা আছে ‘লা-ইলাহা ইলাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ কার্দে জয়নব বিনতে নাছের জজায়ে দেওয়ান শরীফ হিজরি ১০২০ সাল। এ প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদটি ৪০০ বছর আগে নির্মিত হলেও আজও আপন শিল্পকর্মে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পলাশ উপজেলার নিবিড় পল্লীতে শান্ত পরিবেশে মসজিদটি অবস্থিত। ১৯০৪ সালে প্রচ- ভূমিকম্পে মসজিদের ছাদে একটি ফাটল দেখা দেয়, তখন ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায় দেওয়ানের কাছারি ঘর, নায়েবের ভবনটি। মসজিদের পূর্ব কোণে কয়েকটি প্রাচীন কবরের ধ্বংসাবশেষ। মসজিদের বারান্দায় প্রবেশ দরজায় উপরিভাগে ফার্সি ভাষায় লেখা আছে মসজিদ তৈরির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। পাঠোদ্ধারে জানা যায়, ১১২৮ হিজরিতে নাছেরের কন্যা দেওয়ান শরীফের স্ত্রী জয়নব বিবি মসজিদটি তৈরি করেন। মসজিদের পশ্চিম পাশে পুকুরের পূর্ব তীরে এক গম্বুজ বিশিষ্ট সৌধ। পাশাপাশি দুটি কবর। সরেজমিন ঘুরে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা হারেজ আলী আমার সংবাদকে জানান, ১১২৮ হিজরিতে দেওয়ান শরীফ খাঁ ইন্তেকাল করেন। তার স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পরের বছর জয়নব বিবি মারা গেলে স্বামীর পাশেই তাকে দাফন করা হয়। এখনো প্রতিদিন শত শত মুসল্লি মসজিদে নামাজ আদায় করছে এবং মাজার জিয়ারত করে যাচ্ছেন। হারেজ আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, দেওয়ান শরীফ খাঁর বংশের কোনো মানুষ মসজিদ ও মাজারের তত্ত্বাবধানে নেই। তার বংশের দেওয়ান মুহম্মদ সাত্তারদাদ খাঁর ছেলে ফতোদাদ খাঁ বর্তমানে জীবিত আছেন। কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার হজরত নগরে বসবাস করেন। তিনি ঈশা খাঁর বংশধর। তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি ভূমিকম্পে ফাটলটি দেখা দিলে ১৯৮৯ সালে স্থানীয়রা মিলিতভাবে সংস্কার করেন। এরপর সর্বশেষ গত ২০১২ সালে মসজিদটি পুনঃসংস্কারের কাজ হয়। আমারসংবাদ/এমআর